জেনার যখনই সময় পেতেন স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে দূরে কোথাও ছুটি কাটাতে যেতেন। ছেলেকে তিনি চিকিৎসক হিসাবেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৮১০ সালে ছেলের আকস্মিক মৃত্যুতে মানসিক দিক থেকে একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। এরপর থেকে কদাচিৎ ঘরের বাইরে বার হতেন।
১৮১৫ সালে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যু হল। এই সময় তার এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছেন, “আমার চারদিকে সব যেন শূন্য হয়ে গেল।”
স্ত্রী, পুত্রের মৃত্যুর বেদনা ভুলতে তিনি ফিরে গেলেন তাঁর প্রকৃতির মধ্যে, যে প্রকৃতিতে তিনি আজন্ম ভালবেসেছিলেন। এই সময় তিনি গাছপালা পাখিদের নিয়ে পড়াশুনা করতেন। মৃত্যুর আগে তিনি শেষ প্রবন্ধ লেখেন দেশান্তরী পাখিদের নিয়ে।
জীবনের সব কাজ শেষ হয়ে এসেছিল জেনারের। একা একা বসে মনে করতেন পুরনো দিনে স্মৃতিকথা। একটি মানুষের কথা বড় বেশি মনে পড়ে তার। বহু বছর আগে দেখা সেই অসুস্থ সন্তানের মা। কতবার তার খোঁজ করেছেন, কোন সন্ধান পাননি, কতদিন ঘুমের মধ্যে জেগে উঠেছেন সন্তানহারা সেই মায়ের কান্নায়।
জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে আর কোন দুঃখ নেই। মায়ের কান্না তিনি চিরদিনের মত মুছিয়ে দিতে পেরেছেন।
১৮২৩ সালের ২৬শে জানুয়ারি সকলকে কাঁদিয়ে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন কবি, প্রকৃতি প্রেমিক, বিজ্ঞানী, মানবদরদী এডওয়ার্ড জেনার।
৭৯. ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল (১৮২০-১৯১০)
১৮৫০ সাল। ক্রিমিয়ার প্রান্তরে ইংলন্ড ও রাশিয়ার যুদ্ধ চলেছে। দুই পক্ষেই শত শত সৈনিক নিহত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে কুটারিতে তৈরি হয়েছে আহত সৈনিকদের জন্য হাসপাতাল। মুমূর্ষ মানুষের আর্তনাদে চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তার মাঝে চলেছেন। কোন ক্লান্ত নেই, বিরক্তি নেই। দু চোখ জুড়ে রয়েছে ভালবাসা, স্নেহের পরশ। যখনই তিনি কারো পাশে গিয়ে দাঁড়ান, মুহূর্তে সে মুহূর্তে সে ভুলে যায় তার সব ব্যথা যন্ত্রণা। রাতের বেলায় যখন সকলে ঘুমিয়ে পড়ে, তিনি প্রদীপ নিয়ে রুগীদের মধ্যে বেড়ান। যারা জেগে থাকে তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেন। তারপর আবার এগিয়ে যান পরের মানুষটির দিকে। মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে থাকে সবাই। দেখতে দেখতে সমস্ত প্রান্তরে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে “দীপ হাতে রমণী।”।
যুদ্ধ শেষ হয়। সৈনিকরা ফিরে যায় নিজের গৃহে। কিন্তু সেই দীপ হাতে রমণীর কাজ শেষ হয় না। ক্রিমিয়ার যুদ্ধের প্রান্তরে যে কাজের সূচনা করেন সেই সেবাব্রতকে ছড়িয়ে দেন দেশে দেশে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। মূলত তারই প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে আধুনিক নার্সিং ব্যবস্থা। সেই মহীয়সী মহিলার নাম ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল।
ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলের জন্ম ১৮২০ সালের ২ই মে ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে। তার পিতামাতার জন্মস্থানের নাম অনুসারে কন্যার নাম রাখেন। নাইটিংগেলের পিতা ছিলেন ধনী এবং ইংলন্ডের অভিজাত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন। বিভিন্ন মন্ত্রী, বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তাদের বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করত।
শিক্ষার ব্যাপারে ফ্লোরেন্সের পিতা ছিলেন উদার। মেয়েকে সঙ্গীত, ছবি আঁকা শেখানোর সাথে দেশ বিদেশের নানান ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে ল্যাটিন, গ্রীক, ইতালিয়ান, ফরাসী, জার্মান আয়ত্ব করে ফেললেন ফ্লোরেন্স।
ফ্লোরেন্সের ছেলেবেলা কেটেছে ইংলন্ডের ডার্বিশায়ার অঞ্চলে তাদের পুরনো বাড়িতে। গ্রাম্য পরিবেশের এই বাড়ি ফ্লোরেন্সের খুব ভাল লাগত।
এখানকার মানুষজন পরিবেশ এমনকি ছোট ছোট জীবজন্তু অবধি ছিল তাঁর খুব প্রিয়। প্রত্যেকের উপরেই তিনি অনুভব করতেন এক গভীর মমত্ব বোধ। সেই শিশুবেলা
থেকেই বাড়ির কোন লোক সে পিতামাতা ভাইবোন আত্মীয় পরিজন হোক বা কাজের লোক হোক, অসুস্থ হওয়া মাতৃ িতিনি সেবা করতে এগিয়ে যেতেন।
এমনকি গ্রামের কোন মানুষ, হাঁস, মুরগি, গরু, ঘোড়া অসুস্থ হলেও তিনি সেবা করতে দ্বিধা করতেন না।
শৈশব অতিক্রম করে যৌবনে পা দিলে ফ্লোরেন্সের পিতা ঠিক করলেন মেয়েকে লন্ডন শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাবেন। ১৭ বছর বয়েসে ডার্বিশায়ার ত্যাগ করে লন্ডন শহরে এলেন ফ্লোরেন্সে। গতানুগতিক শিক্ষার প্রতি সামান্যতম আকর্ষণ অনুভব করতেন না ফ্লোরেন্স। তাঁর ইচ্ছা ছিল সেবাকে জীবনের ব্রত হিসাবে নেবেন। কন্যার এই ইচ্ছার কথা শুনে চমকে উঠলেন তার পিতামাতা। সেই যুগে সেবাকে (Nursing) কোন পেশা হিসাবেই গুরুত্ব দেওয়া হত না। সেই সময় হাসপাতালগুলোর অবস্থা ছিল যেমন ভয়াবহ তেমনি করুণ। সেবার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ অবহেলিত। যারা এই পেশায় যোগ দিত তারা সকলেই ছিল না তাঁদের। ফ্লোরেন্সের মত এক অভিজাত পরিবারের সন্তান এই ধরনের পেশা গ্রহণ করবে এ কথা কিছুতেই তাঁর পিতামাতা মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁরা মেয়েকে দেশভ্রমণে পাঠিয়ে দিলেন। যদি মেয়ের ইচ্ছার পরিবর্তন হয়।
ফ্লোরেন্স প্রথমে Bracebridge দম্পতির সাথে রোমে গেলেন। সকলেই যখন রোমের প্রাচীন শিল্পকলা দেখায় ব্যস্ত, সেই সুযোগে ফ্লোরেন্স দশ দিনের জন্য গেলেন রোমান ক্যাথিলক কনভেন্টে। দেখলেন সেখানকার সন্ন্যাসিনীদের সেবামূলক কাজ। লক্ষ্য করলেন তাদের সাংগঠনিক কাজকর্ম। এই সময় জার্মানীর এক শহরে Nursing শিক্ষা দেবার জন্য একটি স্কুল ছিল। এটিরও পরিচালনার ভার ছিল সন্ন্যাসিনীদের উপর। তিন মাস এখানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিলেন ফ্লোরেন্স। সেই সময়েই তার মনের মধ্যে জেগে ওঠে এক স্বপ্ন, ইংলন্ডে ফিরে গিয়ে তিনি এই ধরনের একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করবেন।
