জেনারের খ্যাতি ক্রমশই চারদিকে ছড়িয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। টিকার সম্বন্ধে মানুষের যে প্রাথমিক ভীতি ছিল, একটু একটু করে কাটতে আরম্ভ করল। লোকে উপলব্ধি করতে পারছিল একমাত্র টিকা নিলেই মানুষ এই ভয়ঙ্কর ব্যাধির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে।
কিন্তু তবুও পার্লামেন্ট, ইংলন্ডের গুণীজন এই মহান আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠা বোধ করছিল। পার্লামেন্টের তরফ থেকে তাঁকে মাত্র দশ হাজার পাউন্ড পুরষ্কার দেওয়া হর এবং তার মধ্যে এক হাজার পাউন্ড সরকারী খরচ বলে কেটে নেওয়া হল। গবেষণার জন্য যে বিরাট অর্থ ব্যয় করতে হয়েছিল, এই অনুদান ছিল তার তুলনায় নগণ্য। জেনার নিজের সম্বন্ধে তাই কৌতুক করে বলেছিলেন, “আমি একজন ভ্যাকসিন ক্লার্ক। বিজ্ঞানী হিসাবে কেউ আমাকে মর্যাদা দিল না।”
অর্থের প্রতি কোন মোহ ছিল না জেনারের। তিনি চেয়েছিলেন পার্লামেন্টের অর্থে একদিকে যেমন গবেষণার কাজ চালিয়ে যাবেন, অন্যদিকে দীন-দরিদ্র মানুষদের মধ্যে বিনামূল্যে টিকা দেবেন। সামান্য যা সম্বল ছিল তাই নিয়েই কাজ শুরু করলেন। তিনি নিজেই ভ্যাকসিন তৈরি করে লোককে টিকা দিতে আরম্ভ করলেন। প্রতিদিন তার বাড়িতে দীর্ঘ লাইন পড়ে যেত। তিনি হাসিমুখে সকলকে টিকা দিতেন। এক একদিন তিনশোর বেশি মানুষকে টিকা দিতে হত।
শুধু দরিদ্র সাধারণ মানুষ নয়, ইংলন্ডের বহু অভিজাত পরিবারের সন্তানরা তার কাছে টিকা নেবার জন্য আসতে আরম্ভ করল।
ইংলন্ডের সীমানা ছাড়িয়ে জেনারের মহান আবিষ্কারের কথা ছড়িয়ে পড়ল দেশে দেশে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন টমাস জেফারসন। তিনি এই টিকা নিলেন। রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী এই টিকা নিলেন। জার্মানীতে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হল এই টিকা। জেনারকে সম্মান জানাবার জন্যে জার্মানীতে প্রথম টিকা দেবার দিনটিকে জাতীয় উৎসবের দিন হিসাবে ঘোষণা করা হল।
ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন টিকা নিলেন। জেনারের প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধা। ফ্রান্সে এই ভ্যাকসিন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তার উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি।
একবার কোন এক যুদ্ধে ইংলন্ডের বহু সৈনিককে বন্দী করেছিলেন নেপোলিয়ন। তাদের মধ্যে কয়েকজন ছিল জেনারের পরিচিত। সেই বন্দীদের মুক্তির জন্য জেনার চিঠি লিখলেন নেপোলিয়নকে। সামরিক দপ্তর থেকে সেই চিঠি দেওয়া হল সম্রাজ্ঞীর কাছে। তিনি চিঠিটি নিয়ে গেলেন নেপোলিয়নের কাছে। তিনি চিঠিটি নিয়ে গেলেন নেপোলিয়নের কাছে। নেপোলিয়ন শুধুমাত্র চিঠির কথা শুনেই বললেন, “ঐ মানুষটির নামে কোন অনুরোধ এলে তা আমাদের ফেরানো সম্ভব নয়।”
সম্রাটের আদেশে সমস্ত বন্দীদেরই মুক্তি দেওয়া হল। পার্লামেন্টের সদস্যরা ক্রমশই উপলব্ধি করতে পারছিলেন জেনারেল প্রতিভাকে অস্বীকার করে লাভ নেই। এবার তাঁকে হাজার পাউন্ড সাহায্য দেওয়া হল। এই অর্থে জেনার গড়ে তুললেন জাতীয় ভ্যাকসিন ইন্সটিটিউশন। (National Vaccine Institution). এই প্রতিষ্ঠানটিকে গড়ে তোলাবার জন্য শুরু হল তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম। কয়েক মাস পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। লন্ডনের পরিবেশ তাঁর ভাল লাগছিল না। বার্কলেন কমওন্ডের সবুজ প্রান্তর, উন্মুক্ত প্রকৃতি ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। লন্ডন ছেড়ে চলে এলেন বার্কলে। লন্ডন ত্যাগ করার পেছনে আরো একটি কারণ ছিল, ভ্যাকসিন ইন্সটিটিউশনের তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কিন্তু তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বেশ কিছু সদস্য নেওয়া হল যারা ছিলেন জেনারের সম্পূর্ণ বিরোধী। কোন প্রতিবাদ করলেন না জেনার, শুধু নীরবে পদত্যাগ করলেন।
আসলে জেনার ছিলেন একজন প্রকৃতিই বিজ্ঞানী, নম্র বিনয়ী, কোন অর্থ যশ খ্যাতি সম্মানের প্রতি তাঁর সামান্যতম আগ্রহ ছিল না। তিনি ইচ্ছা করলে তাঁর এই আবিষ্কার থেকে লক্ষ লক্ষ পাউন্ড উপার্জন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন তার এই আবিষ্কার মানব কল্যাণের কাজে লাগুক, অর্থ উপার্জনে নয়।
১৮০৬ সালে বিখ্যাত সমাজসংস্কারক উইলবারফোর্স লিখেছেন, “জেনারের টিকা এখন ব্যবহৃত হচ্ছে পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে। সুদূর চীন, ভারতবর্ষে।”
সমস্ত পৃথিবী তাকে সম্মানিত করলে তার স্বদেশ তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দেয়নি। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে M.D উপাধি দেওয়অর পর সকলেই অনুমান করেছিল তাঁকে রয়অল কলেজ অব ফিজিসিয়ানস (Royal college of Physicians)-এর সদস্য করা হবে। কিন্তু কলেজ থেকে জানানো হল তাঁকে এই কলেজের সদস্য হতে গেলে গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। (জেনার এই দুটি ভাষার কোনটিই জানতেন না। তিনি এই অপমানকর প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে বললেন, আমার কাছে এই সম্মানের কোন মূল্য নেই।
তবে জেনার চেয়েছিলেন ইংলন্ডের রয়াল সোসাইটি তাঁর গবেষণাপত্র অনুমোদন করবে। রায়ল সোসাইটি ছিল বিজ্ঞানীদের প্রধান সংগঠন। বিস্ময়ে অবাক হতে হয় যে আবিষ্কার পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করল সেই গবেষণাপত্রকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অমনোনীত করেছিল রয়াল সোসাইটি। এই ঘটনায় জেনার খুবই দুঃখিত হয়েছিলেন। তবুও তাঁর গবেষণার কাজ বন্ধ হয়নি।
বার্কলের নিভৃত প্রান্তরে স্ত্রী-পুত্রকে নিয়ে সুখী জীবন যাপন করতেন। কদাচিৎ লন্ডনে যেতেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল ক্যাথারিন। শান্ত উদার সহৃদয় স্বভাবের মহিলা। জেনারের প্রতিটি গবেষণা কাজের পেছনে ছিল তার অফুরন্ত উৎসাহ অনুপ্রেরণা। স্বামীর বিশ্বাস আদর্শকে তিনি গ্রামের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রচার করতেন। তাদের সৎ আদর্শবান হয়ে ওঠার শিক্ষা দিতেন।
