এই সমস্ত প্রবন্ধ প্রকাশের সাথে সাথে শুধু ইংলন্ড নয়, পৃথিবীর আরো বহু দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হল। প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক থেকে আরম্ভ করে হাতুড়ে ডাক্তার সকলেই এর বিরুদ্ধে মতামত দিতে আরম্ভ করল। অনেকে অভিমত দিল এ এক নূতন ধরনের অপারেশন। এতে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর বিরুদ্ধে ব্যঙ্গকৌতুক ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হতে লাগল।
এই প্রচণ্ড বিরোধিতা সমালোচনা বিদ্রুপের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জেনার অটল অবিচলিতভাবে তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। তার অটল বিশ্বাস ছিল মানুষ একদিন না একদিন তার আবিষ্কারকে স্বীকরা করে নেবে।
এই সময় গবেষণার প্রয়োজনে চিকিৎসা করতে পারতেন না। হাতে সামান্য যা অর্থ পেতেন গবেষণার কাজেই তা ব্যয় হত। সংসারে অভাব অনটন প্রকট হয়ে উঠল। দু এক জন হিতৈষী বন্ধু কিছু অর্থ সাহায্য করতে চাইলে তিনি হাসিমুখে তাদের ফিরিয়ে দিলেন। পরিবারের প্রতিটি মানুষের সাথেই দারিদ্র্যকে ভাগাভাগি করে নিতেন।
একদিকে দারিদ্র অন্যদিকে প্রত্যক্ষ বিরোধিতা। এই দুইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাময়িক বিভ্রান্ত হয়ে পড়লেও ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে শক্তি সঞ্চয় করলেন। তিনি অনুভব করতে পারছিলেন তার আরো বাধার সম্মুখীন হতে হবে এবং সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করেই চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে হবে।
জেনারকে দুই ধরনের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হল। একদল লোক, তাদের বেশির ভাগ মানুষই ছিল ডাক্তার–তারা চারদিকে প্রচার করতে আরম্ভ করল গুটি বসন্তের প্রতিরোধক হিসাবে যে টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে তা মানুষের শরীরের পক্ষে ক্ষতি রিক, এতে মানুষের মত পর্যন্ত হতে পারে। এই ধরনের প্রচারে জেনার বিশেষ গুরুত্ব দিতেন না। কারণ তিনি জানতেন যে মানুষ একবার টিকা গ্রহণ করতে পারবে, সে নিজেই উপলব্ধি করতে পারবে এই টিকা কল্যাণকর না ক্ষতিকারক। কিন্তু বিপদ এল অন্য পথে।
সেই সময় ডাক্তার জর্জ পিয়ার্সন বলে একজন চিকিৎসক ঘোষণা করলেন ইতিপূর্বেই তিনি এই বিষয়ে গবেষণা করেছেন এবং টিকা দেওয়ার প্রণালী সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অবগত আছেন এবং তিনি তার একটি রচনা প্রকাশ করলেন, যদিও গো বসন্ত সম্বন্ধে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোন জ্ঞানই ছিল না।
তিনি গুটি বসন্তের সম্বন্ধে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে বক্তৃতা দিতে আরম্ভ করলেন, এবং গো বসন্তের পরিবর্তে মানুষের দেহে যে গুটি বসন্তু হয় তা দিয়েই টিকা তৈরি করে বিভিন্ন মানুষকে দিতে আরম্ভ করলেন।
জেনার তার গবেষণায় প্রমাণ করেছিলেন দু’ধরনের গো বসন্ত আছে। তার মধ্যে একটির গুটি বসন্ত প্রতিশেষধ ক্ষমতা আছে। এবং তা তখনই সম্ভব যদি একটি বিশেষ অবস্থায় অসুস্থ গরুর বা গো বসন্তে আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে টিকা তৈরি করে অন্যকে দেওয়া হয়। কিন্তু যদি গুটি বসন্তে আক্রান্ত দেহ পুঁজ রক্ত নিয়ে টিকা প্রস্তুত করা হয় তাতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রুগীর দেহে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠলেন রোগীর জীবনের আশঙ্কা থেকেই যায়। পিয়ার্সন এই ধরনের টিকা প্রস্তুত করে বিতরণ করতে আরম্ভ করলেন। শুধু তাই নয়, বিনামূল্যে টিকা দেওয়ার জন্য লন্ডনে একটি দাঁতব্য প্রতিষ্ঠান তৈরির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
অন্য কেউ এই ধরনের বিপজ্জনক কাজের পরিণতির কথা চিন্তা করতে না পারলেও জেনার তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তিনি সরাসরি এর বিরুদ্ধে প্রচার করতে আরম্ভ করলেন। সৌভাগ্যক্রমে কিছু খ্যাতনামা চিকিৎসক জেনারের বক্তব্যের সারমর্ম উপলব্ধি করতে পারলেন। তারাও এগিয়ে এলেন জেনারের সমর্থনে। সমবেত প্রতিরোধের সামনে পিয়ার্সন পিছু হটতে বাধ্য হলেন। এবং তার প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
মানুষ ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারছিল জেনারের আবিষ্কারের গুরুত্ব। এ বিষয়ে জানবার জন্য প্রতিদিন তিনি অজস্র মানুষের কাছ থেকে চিঠি পেতেন। কেউ চিঠি লিখে তাঁর কাছে সিরাম চাইত, কেউ এই মহান আবিষ্কারের জন্য তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধন্যবাদ দিত। অনেকে এ বিষয়ে আরো বিস্তৃতভাবে জানতে চাইত। ক্রমশই চিঠির সংখ্যা এতই বেড়ে চলল যে শুধু চিঠির উত্তর দেবার জন্য তাঁকে দুজন লোক রাখতে হল। এত চিঠি লেখার জন্যে তিনি কৌতুক করে বলতেন, “আমি একজন ভ্যাকসিন ক্লার্ক।” প্রশংসা ছাড়াও বিরোধী পক্ষেরও কম চিঠি পেতেন না। যদিও এদের বেশির ভাগই ছিল কিছু মূর্খ মানুষ আর হাতুড়ে ডাক্তার। তাদের মতে ধরনের টিকা মানুষের ‘ পক্ষে ক্ষতিকারক এবং এর ফলে দেশে গুটি বসন্তের আরো প্রসার ঘটবে।
কিন্তু অল্পদিনের মধ্যে তাদের সব সন্দেহ অমূলক বলে প্রমাণিত হত। পিয়ার্সন যাদের টিকা দিয়েছিলেন তাদের বেশির ভাগ লোকই গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয়েছিল। জেনার প্রমাণ করলেন করলেন সেই সব লোকেদের যে টিকা দেওয়া হয়েছিল তাদের প্রস্তুত প্রণালী ভুল ছিল। তাই লোকে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল হয়ে পড়েছিল। তিনি শত শত মানুষকে টিকা দিয়ে প্রমাণ করলেন তাঁর নির্দেশিত পদ্ধতিতে প্রস্তুত টিকা সম্পূর্ণ নিরাপদ। ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করতে পারল টিকা নেওয়ার সার্থকতা। ১৮ মাসে ইংলন্ডে প্রায় ১২০০০ মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক তৃতীয়ংশ কমে আসে।
