শুরু হল জেনারের গবেষণা। বিভিন্ন রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের পুঁজ নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। তার মনে হল প্রচলিত বিশ্বাসের মধ্যে কোথাও কোন সত্য আছে কিনা তাও যাচাই করে দেখতে হবে।
১৭৮০ সাল নাগাদ। দীর্ঘ গবেষণার পর জেনার উপলব্ধি করলেন, গো বসন্ত সম্বন্ধে যে ধারণা প্রচলিত তা আংশিক সত্য। এই গো বসন্ত সাধারণত গরুর শরীরে হয়। এতে গরুর বিশেষ কোন ক্ষতি হয় না। বিভিন্ন ধরনের গো বসন্তের পুঁজ এনে পরীক্ষা করলেন। দেখলেন শুধুমাত্র এক ধরনের গো বসন্তের পুঁজই গুটি বসন্তের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে কোন কার্যকারী ভূমিকা গ্রহণ করতে পারবে কি না সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারলেন না জেনার।
ইতিমধ্যে দেশে বসন্তের প্রাদুর্ভাব ক্রমশই বেড়ে চলছিল। মানুষের হাহাকার শুনতে শুনতে বিচলিত হয়ে পড়তেন জেনার। মনে হত, জীবননাশিনী এই রোগের বিরুদ্ধে কি মানুষ কোনদিন জয়ী হতে পারবে না? মৃত্যুর কান্না কি বন্ধ হবে না?
জেনারের বাড়িতে আসত একটি গোয়ালিনী, নাম সারা নেলনিস। নেলনিস জেনারের বাড়িতে দুধ দিত। একদিন নেলনিসের কাছে জানতে পারলেন তার বাড়ির সকলের বসন্ত হয়েছে, কিন্তু নেলনিসের কিছু হয়নি। শুধুমাত্র তার হাতে কয়েকটি ছোট ছোট গুটি বেরিয়েছে। জেনার অনুমান করতে পারলেন যেহেতু কয়েক মাস আগে নেলনিসের গো বসন্ত হয়েছে তাই গুটি বসন্ত তাকে আক্রমণ করতে পারেনি।
ভাগ্যক্রমে সেই সময় একটি আট বছরের মা-বাপ মরা ছেলে জেমস ফিপস তার কাছে এল। ছেলেটিকে নিজের কাছে আশ্রয় দিলেন জেনার।
বহুদিন ধরেই জেনার চিন্তা করছিলেন গো বসন্তের টিকা নিয়ে মানুষের দেহে প্রয়োগ করবেন। ইতিপূর্বে তিনি বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের উপর প্রয়োগ করেছিলেন এবং প্রতি ক্ষেত্রেই সফল হয়েছিলেন কিন্তু যতক্ষণ না কোন মানুষের দেহে প্রয়োগ করতে পারছেন ততক্ষণ তো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেন না।
প্রথমে মনে হয়েছিল নিজের দেহে প্রয়োগ করবেন। কিন্তু যদি তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন কে তাকে সুস্থ করে তুলবেন? তাই জেমসের উপরেই ঔষধ প্রয়োগ করবার সিদ্ধান্ত নিলেন। দীর্ঘ কুড়ি বছরের গবেষণার পর অবশেষে ১৭৯৬ সালের ১৪ই মে জেনার প্রথমে সারা নেলনিসের হাতের গুটি থেকে ইনজেকশন করে সামান্য পুঁজ তুলে নিলেন তারপর ঈশ্বরের নাম করে সেই পুঁজ জেমসের শরীরে টিকা দিলেন।
জেমসের আগে কোনদিন বসন্ত হয়নি। টিকা নেওয়ার দু-একদিন পরেই দেখা গেল যেখানে টিকা নেওয়া হয়েছিল সেই জায়গায় একটা ঘা সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিনের চিকিৎসায় সেই ঘা ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেল। কিন্তু ক্ষতস্থানের একটা চিহ্ন রয়ে গেল।
কয়েকদিন ধরে জেনার জেমসকে নিয়ে বসন্ত রুদীদের মধ্যে চিকিৎসার কাজ করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় জেমসের বসন্ত হল না। তিনি উপলব্ধি করতে পারলেন তার কুড়ি বছরের সাধনা অবশেষে সফল হয়েছে। এখন প্রয়োজন তার এই সাফল্যের কথা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা। কিন্তু তার আগে সর্বসমক্ষে পরীক্ষ দিতে হবে। প্রমাণ করতে হবে তিনি গুটি বসন্তের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছেন। জেনার লন্ডনের বিখ্যাত সব চিকিৎসকদের ডেকে তার গবেষণার কথা জানালেন। ঘোষণা করলেন সর্বসমক্ষে তিনি জেমসের শরীরে বসন্ত রোগের পুঁজ প্রবেশ করাবেন।
চারদিকে গুঞ্জন উঠল, কেউ বলল, জেনার অর্থহীন প্রলাপ বকছেন, কেউ বলল তিনি একটি শিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এ জঘন্য অপরাধ, কেউ কেউ মন্তব্য করর জেনার অর্থের লোভে জুয়াচুরি শুরু করেছেন। কিন্তু জেনার কারো সমালোচনাতেই কান দিলেন না।
১লা জুলাই ১৭৯৬ সাল। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য দিন। জেনার উপস্থিত ডাক্তারদের সামনে এক বসন্ত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে পুঁজ নিয়ে জেমসের শরীরে ঢুকিয়ে দিলেন। সকলেই উৎকণ্ঠিত কৌতূহলী হয়ে উঠলেন…একদিন দুদিন করে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু জেমসের দেহে বসন্তের সামান্যতম চিহ্ন দেখা গেল না। টিকা নেওয়ার জন্যে জেমসের দেহে প্রতিষেধক শক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
কিন্তু চিকিৎসকরা কেউই জেনারের এই আবিষ্কারকে স্বীকৃতি দিতে চাইল না। এর পেছনে দুটি কারণ ছিল। একদল ভঁর এই অসাধারণ আবিষ্কারে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল, অন্যদল বিশ্বাস করতে পারছিল না গুটি বসন্তের মত ভয়াবহ অসুখকে নির্মূল করা সম্ভব।
নিজের বিশ্বাসে অটল ছিলেন জেনার। একের পর এক তেইশ জনকে টিকা দিলেন এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি সফল হলেন।
এই সময় তার কাছে একাধিক প্রলোভন আসতে থাকে। স্যার ওয়ালটার নামে এক ভদ্রলোক জেনারকে এক লক্ষ পাউন্ড এবং বছরে দশ হাজার পাউন্ড দেবার কথা বলল, বিনিময়ে এই আবিষ্কারের ফর্মুলা তুলে দিতে হবে।
মানব কল্যাণে উৎসর্গীকৃত প্রাণ জেনার হাসিমুখে সেই অর্থ ফিরিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, মানুষের কল্যাণে আমি আমার এই আবিষ্কারকে ব্যবহার করতে চাই, অর্থ উপার্জনের জন্য নয়।
অবশেষে ১৭৯৮ সালে তিনি প্রকাশ করলেন তার যুগান্তকারী প্রবন্ধ Inquiry into cause and effect of the Variolae Vaccinae। এর পরের বছর প্রকাশ করলেন দ্বিতীয় প্রবন্ধ Further inquiry…। এবং চূড়ান্ত প্রবন্ধ প্রকাশ করলেন ১৮০০ সালে Complete Statement of facts and observations.
