সমস্ত রাত জীবন আর মৃত্যুর লড়াই চলতে থাকে। অবশেষে পরাজিত হয় জীবন, মৃত্যু এসে ছিনিয়ে নিয়ে যায় জীবন। মায়ের কান্নায় মুখর হয়ে ওঠে চারদিক।
রণক্লান্ত পরাজিত সৈনিকের মত বাড়ি ফিরে চলেন ডাক্তার। তার বুকের মধ্যে বাজতে থাকে বিধবা মায়ের সন্তান হারাবার কান্না। নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। দীর্ঘক্ষণ পাথরের মূর্তির মত স্থির নিস্পন্দ হয়ে থাকেন। তারপর এক সময় উঠে দাঁড়ান। পুত্রহারা মায়ের এই কান্না তাকে বন্ধ করতেই হবে। পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে হবে মৃত্যুরূপী এই ভয়ঙ্কর গুটি বসন্তকে।
শুরু হল তাঁর সাধনা। একদিন দুদিন নয়, দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর। কোন ক্লান্তি নেই, অবসন্নতা নেই, এই সাধনায় তাঁকে সিদ্ধিলাভ করতেই হবে। অবশেষে সাফল্য এসে ধরা দিল সাধনার কাছে। জয়ী হল মানুষের সংগ্রাম। বসন্তের ভয়াবহ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল পৃথিবী। যে মানুষটির নিরলস সাধনায় পরাজিত হল ভয়াবহ ব্যাধি, তার নাম এডওয়ার্ড জেনার।
১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই মে ইংলন্ডের বার্কলে শহরে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন সেখানকার ধর্মযাজক। বার্কলের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত প্রিয়। ধর্মপ্রচারের সাথে সাথে স্থানীয় মানুষের সুখে-দুঃখে তিনি ছিলেন তাদের অকৃত্রিম বন্ধু। গরীব দুঃখী মানুষের প্রতি তাঁর ছিল সীমাহীন ভালবাসা। পিতার এই মহৎ গুণ শিশুবেলা থেকেই জেনারের চরিত্রে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কিন্তু পিতার সান্নিধ্য দীর্ঘদিন পাননি জেনার। যখন তাঁর মাত্র পাঁচ বছর বয়েস তখন বাবা মারা যান। তাঁর সব ভার এসে পড়ে দাদা রেভারেন্ড স্টিফেন জেনারেলে উপর। দাদার স্নেহচ্ছায়াতেই বড় হয়ে উঠতে থাকেন জেনার। জেনার যেখানে থাকতেন সেই বার্কলের সংলগ্ন অঞ্চলে ছিল সবুজ মাঠ, গাছপালা, মাঝে মাঝে চাষের জমি, কোথাও গোচারণ ভূমি। চাষীরা চাষ করত, রাখাল ছেলেরা মাঠে গরু নিয়ে আসত।
ছেলেবেলা থেকেই এই উদার মুক্ত প্রকৃতি জেনারকে নেশার মত আকর্ষণ করত, তিনি একা একা ঘুরে বেড়াতেন মাঠের ধারে গাছের তলায়। মনে হত তারা যেন সজীব পদার্থ। প্রতিটি গাছের পাতায় ছোট ছোট ঘাসের মধ্যে তিনি যেন প্রাণের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছেন। পাখির ডাক তার কলকাকলি মনে হত সঙ্গীতের মূচ্ছনা। প্রকৃতির মুখোমুখি হলেই তন্ময়তার গভীরে ডুব দিতেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করতেন, তার বৈচিত্র বৈশিষ্ট্য। যা কিছু দেখতেন জানতেন, বাড়ি ফিরে এসে খাতার পাতায় লিখে র আর লিখতেন কবিতা, কবিতার প্রতি ছেলেবেলা থেকেই ছিল তাঁর আকর্ষণ, পরিণত বয়েসেও তিনি অবসর পেলেই কবিতা লিখতেন। অন্তরে ছিলেন তিনি অবসর পেলেই কবিতা লিখতেন। অন্তরে ছিলেন তিনি কবি, প্রকৃতিপ্রেমিক, কর্মে বিজ্ঞানী চিকিৎসক।
ভর্তি হলেন স্থানীয় স্কুলে। এই সময় দেখতেন অসুস্থ মানুষের দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা। তাঁর মনে হত বড় হয়ে এই কষ্ট দুঃখ তিনি দূর করবেন। স্কুলের ছাত্র অবস্থাতেই মনস্থির করলেন তিনি ডাক্তারি পড়বেন। সেই সময় চিকিৎসা ক্ষেত্রে শিক্ষা পদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেউ চিকিৎসা শাস্ত্র অধ্যয়ন করতে চাইলে তাকে কোন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসকের কাছে ছাত্র হিসাবে কাজ করতে হত। গুরুর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে থেকে তারা হাতে-কলমে কাজ শিখত।
বার্কলেতে কোন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার ছিল না। জেনার এলেন লন্ডনে। সেই সময় লন্ডনের সবচেয়ে খ্যাতিমান ডাক্তার ছিলেন জন হান্টার। তার কাছে ছাত্র হিসাবে ভর্তি হলেন। অল্পদিনের মধ্যেই হান্টার জেনারের একাগ্রতা, নিষ্ঠা, সাধনার পরিচয় পেয়ে মুগ্ধ হলেন। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে তার কাছে ছাত্র হিসাবে কাজ করলেন। অবশেষে ১৭৭৩ সালে চব্বিশ বছর বয়সে ডাক্তার হান্টানের কাছে চিকিৎসার পাঠ শেষ করে বার্কলেতে ফিরে এলেন জেনার। স্থির করলেন এখানেই তাঁর চিকিৎসার পেশা শুরু করবেন।
চিকিৎসক হিসাবে জেনারের ছিল সহজাত প্রতিভা, অন্যদিকে রুগীর প্রতি ছিল তার আন্তরিক দরদ মমতা ভালবাসা। অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসাবে চারদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়ল।
সেই সময় সবচেয়ে ভয়াবহ অসুখ ছিল বসন্ত। যখন কোথাও বসন্তের প্রাদুর্ভাব দেখা যেত, সেই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ মারা পড়ত। তার কোন চিকিৎসা ছিল না। কিভাবে সেই রোগ নিরাময় করা যায় সে সম্বন্ধেও কারোর কোন ধারণা ছিল না। শুধুমাত্র কিছু প্রচলিত বিশ্বাস ছিল। যারা গরুর দুধ গোয়ায় তাদের গো বসন্ত হয়, একবার কারো গো বসন্ত হলে তার আর গুটি বসন্ত হয় না। এই তথ্যের সপক্ষে কেউ কোন প্রমাণ দিতে পারেনি। প্রত্যেকেই বলত তারা অন্যের কাছে শুনেছে মাত্র।
জেনারের কাছে অনেক বসন্তের রোগী আসত, তাদের কারোই প্রাণ বাঁচাতে পারতেন না। চোখের সামনে অসহায়ের মত দেখতেন তাদের মৃত্যু। কিভাবে এই রোগ নির্মূল করা যায় সেই সময়কার খ্যাতিমান সব ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ করলেন, তাদের কেউই কোন পথের সন্ধান দিতে পারল না।
জেনার উপলব্ধি করতে পারলেন, মৃত্যুরূপী এই ভয়ঙ্কর অসুখের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করবার কাজে তাঁকে সাহায্য করবার কেউ নেই, তাঁকে একাই এগিয়ে যেতে হবে।
শুরু হল তাঁর পড়াশুনা, তিনি বিভিন্ন পুঁথি থেকে জানতে পারলেন অষ্টাদশ শতাব্দীতে চীন দেশের লোকেরা বসন্ত রোগ নিবারণের জন্য এক ধরনের টিকা ব্যবহার করত। যার দেহে বসন্ত হয়েছে তার থেকে খানিকটা পুঁজ নিয়ে অন্যের শরীরে ঢুকিয়ে দিত। তার ফলে সুস্থ মানুষটি সামান্য পরিমাণে অসুস্থ হলেও তার আর বসন্ত হত না। কিন্তু এই কাজ করবার সময় দেখা গিয়েছিল। সুস্থ লোকের দেহে বসন্তের পুঁজ ঢোকানোর ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা অসুস্থ হয়ে মারা পড়ছে। তাই এই পদ্ধতি সাফল্যলাভ করেনি।
