ল্যাভোশিঁয়ে যখন তার নতুন নতুন তত্ত্বের মাধ্যমে মানুষের চিন্তাজগতে বিপ্লব সৃষ্টি করে চলেছেন, তখন সমগ্র ফ্রান্স জুড়ে চলেছে আরেক বিপ্লব। ফরাসী বিপ্লব। দেশের শাসনভার গ্রহণ করেছে বিপ্লবী ট্রাইবুন্যাল। তৈরি হয়েছে বিপ্লবী আইন। যারা বিপ্লবের বিরোধী, যারা পুরনো রাজতন্ত্রের সমর্থক বা কোনভাবে তার সঙ্গে জড়িত তাদের সকলকে গিলোটিন নামে এক যন্ত্রে শিরোচ্ছেদ করা হত। এইভাবে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মারা পড়ত। সমস্ত দেশ জুড়ে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হল।
প্রকৃতপক্ষে ল্যাভোশিঁয়ে এই রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে ছিলেন সম্পূর্ণ উদাসীন। গবেষণার কাজের মধ্যেই তিনি দিনরাত ডুবে থাকতেন। তবুও তিনি বিপ্লবী শাসকদের হাত থেকে রেহাই পেলেন না। একদিন (১৭৯১ সালের ৭ই জানুয়ারি) বিপ্লবী দলের সংবাদপত্রে তার সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ ছাপা হল। এক বিপ্লবী নেতা চেয়েছিলেন ল্যাভোশিঁয়েকে সরিয়ে নিজেই বিজ্ঞানের জগতে বিখ্যাত হবেন। সরাসরি ল্যাভোশিঁয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগে আনলেন।
“ল্যাভোশিঁয়ের রাজতন্ত্রের সমর্থক, প্রতারক, ঠক, চোরদের শিরোমনি। অসৎ উপায়ে লক্ষ লক্ষ মুদ্রা উপার্জন করে এখন প্যারিসের শাসনকর্তা হতে চাইছে! একে অফিসে পাঠানো নয়, প্রকাশ্য রাজপথের ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রাখাই আমাদের কর্তব্য। ল্যাভোশিঁয়ে এই সমালোচনা সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ করলেন না। কিন্তু পত্রিকার তরফে একের পর এক অভিযোগে উঠতে থাকে।
এরই মধ্যে বিপ্লবী নেতা আরো নেতার সমর্থনে ফরাসী বিজ্ঞান এ্যাকাডেমিকে। নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ল্যাভোশিঁয়ে তখন এ্যাকাডেমির প্রধান। তিনি এর প্রতিবাদ করলেন। এতদিন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল বিপ্লবী নেতা। বিপ্লবী পরিষদের আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর অপরাধে বন্দী করা হল ল্যাভোশিঁয়েকে।
কিন্তু অভিযোগহ বাড়ি খানাতল্লাসী করা হল। তাঁর সমস্ত কিছু আটক করা হল। গবেষণার কাগজপত্র ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছুই পাওয়া গেল না। তবুও তাকে মুক্তি দেওয়া হল না।
কারাগারে বন্দী থেকেও মনের সাহস হারালেন না ল্যাভোশিঁয়ে। তিনি জানতেন তাঁর সামনে নিশ্চিত মৃত্যুর হাতছানি। অথচ তার এক আত্মীয়কে চিঠিতে লিখিছেন, “আমি দীর্ঘ সুখী জীবন পেয়েছি। এখন বার্ধক্যের ভারে ক্লান্ত। পেছনে ফেলে এসেছি কিছু জ্ঞান, সামান্য কিছু গৌরব। এর বেশি পৃথিবীর মানুষ আর কি আশা করতে পারে?”
শুরু হল বিচারের মিথ্যা প্রহসন। প্রধান সাক্ষী ল্যাভোশিঁয়েরই এক কর্মচারী যাকে চুরির অপরাধে বরখাস্ত করা হয়েছিল। ল্যাভোশিঁয়ের উকিল তার বৈজ্ঞানিক গবেষণার কথা উল্লেখ করতেই প্রতিপক্ষের তরফে জবাব এল, “বিপ্লব বিজ্ঞানকে চায় না, তার প্রয়োজন ন্যায়ের।”
অবশেষে সেই বিচিত্র বিচার শেষ হল। সবচেয়ে বিচিত্র তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, “বিদেশী ও দেশের শত্রুদের সাথে ষঢ়যন্ত্র করার অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল।”
মৃত্যুর আগে যেন চিঠিতে তিনি স্ত্রীকে লিখেছেন, তোমার স্বাস্থ্যের যত্ন নিও প্রিয়তমা, দুঃখ করো না, আমি আমার কাজ শেষ করেছি, তার জন্যে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিও।
১৭৯৪ সালের মে মাসের কোন এক সকালে তাঁকে গিলোটিনে হত্যা করা হল।
তাঁর মৃত্যুর পর বিজ্ঞানী লরেঞ্জ বলেছিলেন, “শুধু একটি মুহূর্ত লেগেছিল তাঁর মাথাটি কাটতে। তেমন আর একটি মাথা পেতে হয়ত আমাদের আরো একশো বছর অপেক্ষা করতে হবে।”
৭৮. এডওয়ার্ড জেনার (১৭৪৯–১৮২৩)
শীতের রাত, চারদিকে কনকনে ঠাণ্ডা। পথে ঘাটে একটি মানুষও নেই। অধিকাংশ মানুষই নেই। অধিকাংশ মানুষই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে আগুনে পোয়াচ্ছে। যারা বাইরে গিয়েছিল, সকলেই ঘরে ফেরার জন্য উদগ্রীব।
ইংল্যান্ডের এক আধা শহর বার্কলেতে থাকতেন এক তরুণ ডাক্তার। বয়েসে তরুণ হলেও ডাক্তার হিসাবে ইতিমধ্যে চারিদিকে তার নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। দূর-দূরান্ত থেকে রুগী আসে তার কাছে। বহু দূরের এক রুগী দেখে বাড়ি ফিরতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামতেই ডাক্তার দেখলেন তাঁর বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাকে ঢাকা এক মহিলা। কছে এগিয়ে গেলেন! সামনে আসতেই মহিলাটি তাঁর পায়ের সামনে বসে পড়ল, আমার ছেলেকে বাঁচান ডাক্তারবাবু।
ডাক্তার তাড়াতাড়ি মহিলাটিকে তুলে ধরে বললেন, কোথায় আপনার ছেলে?
–ছেলেকে বাড়িতে রেখে এসেছি ডাক্তারবাবু। আমার চার চারটি ছেলে আগে মারা গিয়ে এই শেষ সম্বল।
সমস্ত দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে পড়েছিলেন ডাক্তার। তবুও মহিলাটির কাতর ডাকে সাড়া না দিয়ে পারলেন না…তার সাথে বাড়িতে গেলেন। গলির শেষ প্রান্তে ছোট্ট একটি ঘর, ঘরের মধ্যে প্রদীপ জ্বলছিল। এক কোণায় বিছানার উপর শুয়েছিল ছোট একটি বাচ্চা। সারা গায়ে ঢাকা দেওয়া। ডাক্তার গায়ের ঢাকা খুলতেই চমকে উঠলেন। শিশুটির সমস্ত শরীর গুটি বসন্তে ভরে গিয়েছে। জ্বরে বেহুঁশ।
ঔষধের বাক্স নিয়ে শিশুটির পাশে সমস্ত রাত জেগে রইলেন। সামনে উদবেলিত উৎকণ্ঠা ভরা চোখে চেয়ে আছে মহিলাটি।এই ভয়ঙ্কর অসুখ আমার আগের চারটি সন্তানকে কেড়ে নিয়েছে। একে আপনি বচন।
