নানাভাবে পরীক্ষার পর তিনি সিদ্ধান্তে এলেন জল ফোঁটাবার পর যে গুড়ো পদার্থটুকু পাত্রের মধ্যে পড়ে থাকে তা মাটি নয়, পাত্রের ক্ষয়ে যাওয়া অংশ। তিনি জল পুরোপুরি বাষ্পীভূত হওয়ার পর ওজন করে দেখা গেল পাত্রের ওজন কমে গিয়েছে। যেটুকু ওজন কমেছে তা হচ্ছে গুঁড়ো পদার্থের সমান ওজন। এর থেকেই সিদ্ধান্তে এলেন ল্যাভোশিঁয়ে জল ফোঁটাবার জন্যেই পাত্রের ক্ষয় হচ্ছে। জল থেকে মাটি সৃষ্টি হচ্ছে না।
এই নিরূপিত সত্য এ্যালকেমি সম্বন্ধে বহু যুগের প্রচলিত বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করল।
ল্যাভোশিঁয়ে এখানেই থেমে গেলেন না। তিনি বললেন, জলই পরিবর্তিত হয়ে জন্ম দেয় গাছের এই ধারণা ভ্রান্ত। গাছ বিভিন্ন পদার্থের সংমিশ্রণ। এই সমস্ত পদার্থ গাছ। গ্রহণ করে মাটি থেকে, জল থেকে, বাতাস থেকে।
এই প্রতিটি উপাদানই বিভিন্ন উপাদানের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। ল্যাভোশিঁয়ে বিশেষভাবে আকৃষ্ট হলেন বাতাসের উপাদান নিয়ে। তখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল বিভিন্ন ধরনের বাতাস আছে। ল্যাভোশিঁয়ে প্রথম বললেন, বাতাসের দুটি উপাদনি। একটি শ্বাসযোগ্য অপরটি বিষাক্ত। যেটি শ্বাসযোগ্য তার নাম দিলেন অক্সিজেন গ্রীক শব্দ “অক্সিস”, এর অর্থ অ্যাসিড এবং “জেনান”, এর অর্থ উৎপাদন করা। শুধু অক্সিজেন নয়, রসায়ন শাস্ত্রের ব্যবহৃত একাধিক শব্দের সংজ্ঞা নিরূপণ করলেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁরই আন্তরিক প্রচেষ্টায় গড়ে উঠল আধুনিক রসায়ন শাস্ত্রের ভিত্তিমূল। আধুনিক রসায়নের জনক ল্যাভোশিঁয়ের আরেকটি মহৎ কীর্তি রসায়নের জন্য অভিধান তৈরি করা। তাঁর উদ্ভাসিত বহু শব্দ আজও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
ল্যাভোশিঁয়ে তাঁর এই বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক কাজকর্ম বিভিন্ন ধরনের সরকারী বেসরকারী কাজের মধ্যেই চালিয়ে যেতেন। তবে Ferme কোম্পানির খাজনা আদায় করবার জন্যই তাঁকে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হত। এছাড়াও ফরাসী বিজ্ঞান এ্যাকাডেমির সদস্য হিসাবে তাকে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের গবেষণাপত্র জমা দিতে হত।
পরিশ্রম করবার ক্ষমতা, অধ্যবসায়, নিষ্ঠা, মৌলিক সৃষ্টির জন্য ল্যাভোশিঁয়ের নাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। সরকারী তরফেও কোন বৈজ্ঞানিক বিষয়ক সমস্যা দেখা দিলে তা সমাধানের ভার দেওয়া হত ল্যাভোশিঁয়ের উপর।
সেই সময় একটি বেসরকারী সংস্থা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র কামানের গোলা-বারুদ তৈরি কর ফরাসী সরকারের কাছে বিক্রি করত। কিন্তু ক্রমশই তাদের উৎপাদিত দ্রব্যের গুণমান খারাপ হচ্ছিল। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করে সকলেই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ফ্রান্সের সম্রাট দেশের বিজ্ঞান এ্যাকাডেমিকে অভিমত দেবার জন্য আহ্বান করলেন। বিজ্ঞান এ্যাকাডেমি চারজনের একটি কমিটি তৈরি করলেন। তার প্রধান হলেন ল্যাভোশিঁয়ে। তাঁদের উপর ভার দেওয়া হল কিভাবে সামরিক প্রয়োজনে উৎপাদিত দ্রব্যের পরিমাণ বাড়ানো যায় এবং কিভাবে তার গুণমান বৃদ্ধি করা সম্ভব সেই বিষয়ে এ এক সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ। কিন্তু দেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সানন্দে নতুন কার্যভার গ্রহণ করলেন। শুরু হল তার নিরন্তর প্রচেষ্টা, কিভাবে সামরিক প্রয়োজনে গোলা বারুদের উন্নতি করা যায়।
এই দায়িত্বভার তাঁর জীবনে বিরাট এক আশীর্বাদ হয়ে এল। গবেষণার প্রয়োজনে তাঁকে চাহিদা মত গবেষণার সাজ-সরঞ্জাম। সামরিক বাহিনীর কাজের সাথে দীর্ঘ সতেরো বছর (১৭৭৫–১৭৯২) তিনি যুক্ত ছিলেন। তিনি গোলা-বারুদের ব্যবহারিক কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি করেন। এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকেও আরো সহজ করে তোলেন। এবং উৎপাদন ব্যবস্থাকেও আরো সহজ করে তোলেন। এর ফলে শুধু ফরাসী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হয় তাই নয়, আয়ও বৃদ্ধি পায়।
সামরিক কাজকর্মের মধ্যেও তিনি তাঁর নিজস্ব গবেষণা সংক্রান্ত কাজকর্ম বন্ধ করেননি। দিনের বেলায় চলত সামরিক কাজের প্রস্তুতি। রাতের বেলায় তিনি লিখতেন বৈজ্ঞানিক হিসাবে তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, গবেষণার নানা বিষয়, বিভিন্ন তথ্য, বিবরণ। দীর্ঘ তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করবার পর তিনি প্রকাশ করলেন তার যুগান্তকারী রচনা “Elementary Treatise of Chemistry” (1789)! এই বইয়ের কোথাও তিনি একটি অজানা তথ্যকে যুক্ত করেননি। শুধুমাত্র যা তার পরীক্ষার দ্বারা সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে তাকেই গ্রহণ করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে এই বই আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞানের নতুন দিগন্তকে উন্মোচিত করল। কিন্তু একদল প্রাচীনপন্থী মানুষ মুখর হয়ে উঠল এর বিরুদ্ধে, “এই বই-এর সমস্তই অবাস্তব ধারণার উপর গড়ে উঠেছে। যা কিছু নতুন তাই সত্য নয়। আবার যা কিছু সত্য তাই নতুন নয়।” ল্যাভোশিঁয়ের বিরুদ্ধবাদীদের সরব চিৎকারের জবাব দিতে এগিয়ে এলেন বিজ্ঞান এ্যাকাডেমির সদস্যরা। রসায়ন বিজ্ঞানের কুয়াশাচ্ছন্ন জগতে যে আলো ল্যাভোশিঁয়ে জ্বালালেন তার জয়গানে সকলে মুখর হয়ে উঠলেন।
এক চিঠিতে ল্যাভোশিঁয়ে লিখেছেন, আমি খুবই আনন্দিত। আমার নতুন তত্ত্ব পণ্ডিত মহলে এক ঝড় তুলেছে।
এরই মধ্যে ল্যাভোশিঁয়ে আরো একটি যুগান্তকারী তত্ত্ব আবিষ্কার করেছেন। নির্দিষ্ট অনুপাতে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন-এর সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার মধ্যে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ চালনা রলেন জল।
