প্রতিদিন সকালে উঠে থার্মোমিটার ব্যারোমিটার দেখা। তারপর মাটির রং, তার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা। যেখানে রয়েছে খনিজ সম্পদ তার সম্ভাব্য পরিমাণ বিস্তৃতি নিরূপণ করা, নদীর গতিপথ হ্রদ ঝর্ণার অবস্থায়, বিভিন্ন ধরনের গাছপালা তাদের বর্ণনা। নিখুঁতভাবে খাতার পাতায় লিখে রাখতে হয়। কয়েক মাস বিস্তৃত পর্যবেক্ষণের পর তাঁরা ফিরে এলেন প্যারিসে। এই দেশভ্রমণের ফলে একদিকে ল্যাভার্শিয়ের মধ্যে গড়ে উঠল নতুন জীবন দর্শন, বিশ্বপ্রকৃতিকে আরো গভীর ব্যাপকভাবে চেনবার ক্ষমতা, অন্যদিকে কঠোর পরিশ্রমের ক্ষমতা।
প্যারিসে ফিরে এসে স্থির করলেন আইন নয়, বিজ্ঞানই হবে তাঁর জীবনসাথী। কিছুটা আশাহীন ভাবেই ফরাসী বিজ্ঞান এ্যাকাডেমিতে সদস্য হবার জন্য আবেদন করলেন। সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবেই একদিন জানতে পারলেন তাকে বিজ্ঞান এ্যাকাডেমির সভ্য হিসাবে জানতে পারলেন তাঁকে বিজ্ঞান এ্যাকাডেমির সভ্য হিসাবে নির্বাচিত করা হয়েছে। তখন তার বয়েস মাত্র পঁচিশ। এক তরুণের পক্ষে এ অভাবনীয় গৌরব। শুরু হল তাঁর গবেষণা, এ্যাকাডেমির প্রত্যেক সদস্যকেই নিয়মিত গবেষণাপত্র জমা দিতে হত। গবেষণার বিষয় ছিল যেমন বিচিত্র তেমনি ব্যাপক। জীবদেহের উপর চুম্বকত্বরে প্রভাব, অভিকর্ষ, জল সরবরাহ, রঙের তত্ত্ব, বাকাকপির বীজ থেকে তেল নিষ্কাষণ, চিনি তৈরি, কয়লা থেকে পিচ তৈরি করা, কীটপতঙ্গের শ্বাস-প্রশ্বাস। এই বিচিত্র ধরনের গবেষণা করে যখন অন্যেরা সমস্ত দিন সামান্যতম সময় পেতেন না, ল্যাভোশিঁয়ে অন্য সকলের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করেও একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হলেন। প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল “Ferme”। এদের কাজ ছিল সরকারকে হিসাব মত রাজস্ব জমা দেওয়া। বিনিময়ে তারা চাষীদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন। খাজনার পরিমাণ রাজস্বের চেয়ে যত বেশি হত ততই “Ferme” এর লাভ।
ল্যাভোশিঁয়ে বুঝতে পারছিলেন গবেষণার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাই তিনি খাজনা সংগ্রহের চাকরি নিলেন। যে বিজ্ঞানের সাধনার জন্য তিনি অর্থ উপার্জন করতে চেয়েছিলেন সেই অর্থই একদিন তার মৃত্যুর কারণ হল।
Ferme-তে দু বছর চাকরি করবার পর ল্যাভেশিয়ে তাঁর এক উচ্চপদস্থ মনিবের সুনজরে পড়ে গেলেন। তার একমাত্র মেয়ে মেরী এ্যানির সাথে ল্যাভোশিঁয়ের বিবাহ দিলেন। মেরী তখন মাত্র চোদ্দ বছরের বালিকা। পরবর্তী জীবনে মেরী হয়ে উঠেছিলেন ল্যাভোশিঁয়ের যোগ্য সঙ্গিনী। তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণা কাজে নানাভাবে সাহায্য করতেন। বিভিন্ন ইংরাজি প্রবন্ধ ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করে দিতেন। ল্যাবরেটারির কাজের বিভিন্ন সাজসরঞ্জাম গুছিয়ে দিতেন। কখনো নোট তৈরি করতে সাহায্য করতেন। শ্বশুরের সাহায্যে চাকরিতে ক্রমশ উন্নতি করছিলেন ল্যাভোশিঁয়ে। কাজের চাপ বাড়া সত্ত্বেও বিজ্ঞানের গবেষণার জন্য তার সময় নির্দিষ্ট ছিল সকাল ছটা থেকে নটা পর্যন্ত, সন্ধ্যেবেলায় সাতটা থেকে দশটা পর্যন্ত।
গবেষণা কাজের জন্য বিরাট একটি ল্যাবরেটারি তৈরি করলেন। বিভিন্ন দেশ থেকে সংগ্রহ করলেন সর্বাধুনিক সব যন্ত্রপাতি। কিছু দক্ষ সহযোগীকে নিযুক্ত করলেন। গবেষণার জন্য তার মত তরুণ বিজ্ঞানীদের কাছে ল্যাবরেটারির জন্য যে বিরাট পরিমাণ অর্থ ব্যয় হত, সবটাই দিতেন ল্যাভেশিয়ে, প্রকৃতপক্ষে তার আয়ের প্রায় সবটুকুই এখানে ব্যয় করতেন। ব্যয় বাহুল্যের জন্য তাঁকে নিয়ে লোকে কৌতুক করত, বলত, ‘অর্থ খরচের পরীক্ষাগার। এই অর্থ খরচের গবেষণাগার থেকেই একদিন জন্ম নিল এক বিজ্ঞান যা পৃথিবীর জ্ঞানের জগতে নতুন আলোক শিখা জ্বালিয়ে দিল। অ্যালকেমির কুয়াশাচ্ছন্ন জগতে আবির্ভূত হল আধুনিক রসায়ন বিজ্ঞান।
ল্যাভোশিঁয়ে যখন গবেষণা আরম্ভ করেছিলেন তখন রসায়ন মধ্যযুগীর এক বিচিত্র চিন্তাভাবনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। রসায়নকে বিবেচনা করা হত শুধুমাত্র চিকিৎসার সহায়ক হিসাবে। লন্ডন গেজেটে প্রকাশিত একটি বিবরণ থেকে জানা যায় মিসেস স্টীফেন নামে এক ব্রিটিশ রসায়নবিদ একটি ঔষধ তৈরি করেছেন যা দিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পেটের পাথুরী সারানো সম্ভব হয়েছে। ঔষধটি তৈরি হয়েছে ডিমের খোলা, গুগলি, সাবানের দলা, আগুনে পুড়িয়ে নেওয়া, শাক, আর মধু একসাথে মিশিয়ে। এই বিচিত্র ঔষধ তৈরির জন্য মিসেস স্টীফেন পাঁচ হাজার পাউন্ড পুরস্কার পেয়েছিলেন।
অন্য আর একজন রসায়নবিদ পরীক্ষা করে সর্বসমক্ষে দেখালেন একটি বস্তুকে অন্য আর একটি বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়। একটি পাত্রে জল নিয়ে ফুটাতে আরম্ভ করা হল। পাত্রের মুখ যথাসম্ভব ঢেকে দেওয়া হল। সমস্ত জল বাষ্প হয়ে বার হবার পর দেখা গেল পাত্রের মধ্যে খানিকটা মাটির মত গুড়ো পড়ে রয়েছে। রসায়নবিদ বললেন, এর থেকেই প্রমাণ হচ্ছে জল থেকে সৃষ্টি হয় মাটি।
এই ঘটনাই প্রথম ল্যাভোশিঁয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। প্রকৃতপক্ষে এর সূত্রপাত যখণ তিনি গুটার্ড-এর সাথে মানচিত্র তৈরির কাজে দেশভ্রমণ করছিলেন। তিনি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন জলের ঘনত্ব, তার প্রকৃতি। তাঁর মনে সন্দেহ দেখা দিল সত্যিই কি জলের অবশিষ্ট অংশ মাটি না পাত্রের ভগ্নাবশেষ? শুধুমাত্র অনুমানের উপর নির্ভর করে কোন কিছুই বিশ্বাস করতে চাননি ল্যাভোশিঁয়ে। তিনি যুক্তি প্রমাণ পরীক্ষার সাহায্যে সত্যকে নিরূপণ করতে চাইলেন।
