কোপার্নিকাস–আহ্নিক গতি না থাকলে দূরের আকাশের তারারা পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে, একথা স্বীকার করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। তাহলে তারাদের গতি হবে আরো তীব্র, সে-ক্ষেত্রে তারারা কেন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে না।
যুক্তিনিষ্ঠ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কোপার্নিকাস তাঁর রচনা প্রকাশ করলেন না। তিনি শুধুমাত্র একটি সংক্ষিপ্তসার প্রকাশ করলেন। তখনকার মানুষ এটিকে মজাদার কাহিনী বলে মনে করেছিল। এর মধ্যেকার বৈজ্ঞানিক সত্যকে কেউই উপলব্ধি করতে পারেনি। মার্টিন লুথারের অনুগামীরা এর মধ্যেকার কিছুটা সত্যকে অনুধাবন করতে সমর্থ হয়েছিল। লুথার ছিলেন যেমন পোপের বিরোধী তেমনি আধুনিক চিন্তা-ভাবনার বিরোধী। বাইবেলের প্রতি তাঁর ছিল অন্ধ বিশ্বাস। তিনি কোপার্নিকাসের বিরুদ্ধে লিখলেন–
“পুণ্যগ্রন্থে এই কথাই লিখেছেণন যীশু–
সূর্যকে স্থির থাকতে বললেন, পৃথিবীকে নয়।”
জীবনের শেষ পর্বে এসে কোপার্নিকাসের সাথে পরিচয় হল রেটিকাস নামে এক তরুণ জার্মান পণ্ডিতের সাথে। রেটিকাস কোপাণি কাসের অভিমতকে স্বীকার করতেন। তিনি রিভোলুশনিবাস পড়ে মুগ্ধ হলেন। তাঁরই আন্তরিক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত কোপার্নিকাস এই বই প্রকাশ করতে সম্মত হলেন। তখন তিনি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তাই বই প্রকাশের দায়িত্ব দিলেন রেটিকাসের উপর। যাতে যাজক সম্প্রদায়ের অনুমোদন পাওয়া যায় তাই কোপার্নিকাস এই বইটি উৎসর্গ করলেন তৃতীয় পোপ পলকে।
নুরেমবার্গের একজন মুদ্রাকর আন্দ্রে ও সিথান্ডারের ছাপাখানায় এই বই ছাপার ব্যবস্থা হয়। আন্দ্রেই ছিলেন লুথারপন্থী–তাছাড়া এই বই প্রকাশিত হলে কোপার্নিকাসের সাথে তাকেও যে বিপদগ্রস্ত হতে হবে এই ভয়ে ভীত হয়ে পড়লেন। তাই বইয়ের প্রথমে লিখেছিলেন, এই বইয়ের বিষয়বস্তু পুরোপুরি সত্য নয়। অনুমানের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। তা সত্য না হওয়াই সম্ভব। এই কথাগুলোর মধ্যে দিয়ে তিনি সত্যমিথ্যার একটা সংশয়াচ্ছান্ন ধারণার সৃষ্টি করলেন যাতে প্রয়োজন এই বইটির বিষয়বস্তু মিথ্যা বলে চালানো যেতে পারে।
শুধু তাই নয়, ওসিথান্ডার ইচ্ছামত বই থেকে বহু নাম তুলে দিলেন, তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল অরিস্টার্কাসের নাম। যিনি প্রথম গভীর বিশ্বাসের সাথে বলেছিলেন সূর্য স্থির পৃথিবী গতিশীল। এ বই প্রকাশিত হওয়ার পর বহুদিন পর্যন্ত পণ্ডিতরা কোপার্নিকাসের সমালোচনা করেছে, তিনি পূর্বসূরীদের ঋণ স্বীকার করেননি। পরে যখন মূল পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় তখন জানা যায় প্রকৃত তথ্য।
১৫৪৩ সালে বইটি প্রকাশিত হল। তখন তিনি মৃত্যুশয্যায়। শোনা যায় যখন এই বইটি ছাপা অবস্থায় তাঁর কাছে এসে পৌঁছল তখন তার পড়ে দেখবার মত অবস্থা ছিল না। তিনি শুধু দুহাতে বইটি কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন, তার কয়েক ঘণ্টা পরেই তাঁর মৃত্যু হল (১৫৪৩ সালের ২১ মে)। কোপার্নিকাস এই বইয়ের মধ্যে দিয়ে যে সত্যের প্রতিষ্ঠা করলেন তার উপর ভিত্তি করে গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন, আইনস্টান জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করলেন।
তিনি যে শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার করেছিলেন তাই নয়, তিনি ইউরোপের প্রথম বিজ্ঞানী মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, অন্ধকার বিশ্বাসের মূলে তীব্র আঘাত হেনেছিলেন। তাই বিংশ শতকের মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোপার্নিকাসই হচ্ছেন আধুনিক যুগের পথিকৃৎ।
৭৭. এন্টনি লরেন্ট ল্যাভোশিঁয়ে (১৭৪৩-১৭৯৪)
১৭৪৩ সালের ২৬ আগস্ট ফ্রান্সের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ল্যাভোশিঁয়ে। পিতা ছিলেন পার্লামেন্টের এটর্নি। তাঁর পূর্বপুরুষেরা অবশ্য ছিলেন রাজপরিবারের ঘোড়াশালার কর্মচারী। নিজের চেষ্টায় পরিশ্রমে ল্যাভের্শিয়ের পিতা নিজেকে প্যারিসের সম্ভ্রান্ত মহলে প্রতিষ্ঠিত করেন।
পিতার ইচ্ছা ছিল তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে আইনের ব্যবসায়যুক্ত হবে। এগারো বছর বয়েসে তাকে শিক্ষায়তনে ভর্তি করে দেওয়া হল। জন্ম থেকেই ল্যাভোশিঁয়ে অন্যসব বিষয়ের মধ্যে বিজ্ঞানই ল্যাভোশিঁয়েকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করত। স্কুলজীবন শেষ করে কলেজে ভর্তি হলেন ল্যাভোশিঁয়ে। এখানে তাঁর শিক্ষক ছিলেন প্রখ্যাত অঙ্কবিদ ও জ্যোতির্বিদ নিকোলাস লুইস। অল্পদিনেই দুজনে দুজনের প্রতি আকৃষ্ট হলেন। গুরু-শিষ্যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। নিকোলাস আবহবিদ্যার প্রতি ল্যাভোশিঁয়েকে আকৃষ্ট করে তোলেন। তারই ফলে সমস্ত জীবন আহতবিদ্যার প্রতি ল্যাভোশিঁয়ের ছিল গভীর অনুরাগ।
এই সময় পিতার ইচ্ছা অনুসারে ল্যাভোশিঁয়ে আইনের ক্লাসে ভর্তি হলেন। আইনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও আইনের প্রতি তাঁর সামান্যতম আকর্ষণ ছিল না। দিন-রাতের অধিকাংশ সময় তাঁর কেটে যেত বিজ্ঞানচর্চায়। বাড়িতেই ছোট একটি গবেষণার গড়ে তুলেছিলেন তিনি। বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে গবেষণাতেই ডুবে থাকতেন ল্যাভোশিঁয়ে। এই সময় (১৭৬৪ সালে। তিনি ফরাসী বিজ্ঞান একাডেমিতে প্রথম তার বিজ্ঞান বিষয়ক রজনা পড়লেন। তাতে মৌলিক কোন তথ্য না থাকলেও তার প্রচেষ্টার সকলেই প্রশংসা করল। পরের বছর ফরাসী এ্যাকাডেমির পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞান বিষয়ক রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। রচনার বিষয় ছিল “পথে কিভাবে আলো দেওয়া সম্ভব এবং তার সমস্যা”। সেই প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করলেন ল্যাভোশিঁয়ে। অনেক জ্ঞাণীগুণী মানুষের সাথে পরিচয় হল ল্যাভোশিঁয়ের। এদের মধ্যে ছিলেন ভূতত্ত্ববিদ জিন গুটার্ড। গুটার্ড সেই সময় ফরাসী দেশের ভূতত্ত্ব বিষয়ক মানচিত্র তৈরির কাজে তার সঙ্গী হবার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। এই কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিভ্রমণ করতে হবে জেনে সানন্দে নিজের সম্মতি জানালেন ল্যাভোশিঁয়ের। ১৭৬৭ সালে মানচিত্র তৈরির কাজে বেরিয়ে পড়লেন ল্যাভোশিঁয়ে। কাছে আছে মাত্র পঞ্চাশ লুইস। সঙ্গী বলতে একটি ঘোড়া, চাকর জোফেস আর প্রৌঢ় বিজ্ঞানী গুটার্ড। দুজনের মনেই অদম্য সাহস আর অজানাকে জানবার তীব্র কৌতূহল। নির্জন প্রান্তর পাহাড় নদী পথ ধরে দুজনে ঘুরে বেড়ালেন ফ্রান্সের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখেই শুধু মুগ্ধ হন না ল্যাভোশিঁয়ে, তার অপার রহস্য তার মনকে নাড়া দিয়ে যায়।
