কোপার্নিকাসের আর একটি উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব হল আধুনিক ক্যালেন্ডারের প্রবর্তন করা। ক্যালেন্ডার চালু হওয়ার পর থেকে তাতে বিশেষ কোন সংশোধনের কাজে হাত দিলেন এবং সঠিকভাবে দিন মাস বছরের হিসাব নির্ণয় করলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই প্রথম বছরের সঠিক কাল পরিমাণ আবিষ্কার করেন।
সমস্ত কাজের অন্তরালে চলছিল তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাধনা। তাঁর মনে হত যদি সূর্য পৃথিবীর চারদিকে একই বৃত্তাকার পথে আবর্তিত হয় তাহলে ঋতু পরিবর্তন হয় কি করে? তখনো দূরবীন আবিষ্কার হয়নি। রাতের পর রাত তিনি আকাশের দিকে চেয়ে পর্যবেক্ষণ করতে চেষ্টা করতেন তার অনন্ত রহস্য। এবং প্রতিটি পর্যবেক্ষণ অনুসন্ধানের ফলাফল তিনি খাতায় পাতায় লিখে রাখতেন। এতদিন পর্যন্ত টলেমির লেখা আলমাগেস্ট গ্রন্থখানিই ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান গ্রন্থ। প্রায় ১৪০০ বছর ধরে মানুষ এর প্রতিটি যুক্তিকেই নির্ভুল বলে মনে করত। কিন্তু কোপার্নিকাস এই বইটি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে উপলব্ধি করলেন, টলেমির বিপরীত ধারণা অর্থাৎ গ্রহগুলো সূর্যের চারদিকে পরিভ্রমণ করছে, এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলে খালি চোখে প্রতিদিন আমরা বিশ্ব প্রকৃতির যে পরিবর্তন দেখছি তার ব্যাখ্যা আরো অনেক সহজ হয় এবং টলেমির জ্যামিতিক জটিলতা পরিহার করা সম্ভব হয়।
বেশ কয়েকজন প্রাচীন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর রচনার মধ্যে তাঁর অভিমতের সপক্ষে যুক্তি খুঁজে পেলেন। কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রমাণের জন্য খালি চোখের উপরই নির্ভর করতে হত। দূরের আকাশ তাঁর পক্ষে দেখা সম্ভব হত না। খালি চোখে যতটুকু দেখেছিলেন এবং ১৫০৫ এবং ১৫১১ সালে দুটি সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করে এই বিশ্ব প্রকৃতির গঠন সম্বন্ধে একটা ধারণা গড়ে তোলেন, এবং প্রধানত তার উপরে ভিত্তি করেই গণিতের সূত্রের সাহায্যে ছাড়াই কিভাবে এত নির্ভুলভাবে স্থির করেছিলেন তা ভাবতে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়।
টলেমি যখন গবেষণায় নিমগ্ন, কিছু মানুষ তার উদারতা সরলতার সুযোগ নিয়ে নানানভাবে বিব্রত করতে আরম্ভ করল। এরা সাধারণ মানুষের কাছে নানাভাবে প্রচার করতে আরম্ভ করল, একটা নিতান্তই বোকা লোক খালি চোখে দেখতে পায়, ‘সূর্য আমাদের চারদিকে ঘুরছে আর পৃথিবী স্থির’ আর কোপার্নিকাস মানুষকে বোকা বানাতে বলছে পৃথিবী ঘুরছে আর সূর্য স্থির।
কোপার্নিকাস জানতেন তিনি যে সূত্র আবিষ্কার করেছেন তা সাধারণ মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। যুগ যুগ যে অন্ধ বিশ্বাস তাদের উপর পাহাড়ের মত চেপে রয়েছে, সহজে তাকে দূর করা সম্ভব নয়। এতে শুধু তাদের কুসংস্কারই নয়, অন্ধ বিশ্বাসের উপরেই আঘাত হানবে। এবং এর প্রতিক্রিয়া হতে ভয়ঙ্কর। সেই কারণে মুষ্টিমেয় কিছু অনুরাগীর কাছেই নিজের অভিমত প্রকাশ করেছিলেন।
যখন তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা তাঁর অভিমতের বিরুদ্ধে প্রচার করছিল, কোপার্নিকাসের বন্ধুরা তাঁকে এর প্রতিবাদ করবার জন্যে অনুরোধ করলে তিনি শুধু হাসিমুখে বললেন, এই সব মূর্খ মানুষগুলোর চিৎকারে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথে সামান্যতম পরিবর্তন ঘটবে না। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, শিক্ষক মানুষেরাও তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রূপ উপহাস করতেন। প্রটেস্টান্ট ধর্মগুরু মার্টিন লুথার বললেন, কোপার্নিকাস একজন নির্বোধ। গোটা জ্যোতির্বিজ্ঞানকেই ওলট-পালট করে দিতে চাইছে। আর একজন বাইবেল থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বললেন, পৃথিবী স্থির, কেউ একে নড়াতে পারবে না।
দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতাকে কখনোই তিনি প্রকাশ করেননি। সাধারণ মানুষের বিদ্রূপ উপহাসের চেয়ে পোপের ইনইকুইজিসিনের ভয় ছিল অনেকে বেশি। বাইবেলের বিরুদ্ধে কিছু প্রচার করার অর্থই নিশ্চিত মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া।
জীবন সায়াহ্নে এসে কোপার্নিকাস তাঁর জীবনব্যাপী পর্যবেক্ষণ আর আবিষ্কারকে প্রকাশ করলেন তার যুগান্তকারী গ্রন্থে দি রিভোলুশনিবাস আররিথার কোয়েলেসটিয়াম (মহাজাগতিক বস্তুগুলোর ঘূর্ণন)। বইটি রচনা করলেও প্রকাশ করলেন না।
এই বইটির প্রথম সিদ্ধান্ত ছিল পৃথিবী আপন অক্ষের চারদিকে আবর্তনশীল। কিন্তু মানুষ তা জানে না। তাদের অনুমান জ্যোতিষ্করাই পৃথিবীকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। পৃথিবীর আহ্নিক আবর্তনই সত্য। আকাশের বুকে গ্রহ নক্ষত্রের যে আপাত আবর্তন ও লক্ষ্য করা যায় তা পৃথিবীর প্রকৃত আবর্তনের প্রতিফলন মাত্র। এই অভিমতের সপক্ষে তারা বলতেন জাহাজ ছাড়লে মনে হয় দেশ-বন্দর সব পিছনে সরে যাচ্ছে।
কোপার্নিকাসের দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত ছিল সূর্যই কেন্দ্রে অবস্থান করছে। পৃথিবী সহ প্রত্যেকটি গ্রহ সূর্যই কেন্দ্রে অবস্থান করছে। পৃথিবীসহ প্রত্যেকটি গ্রহ ব্যাসার্ধের নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে আপন আপন বৃত্তপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধুমাত্র চাঁদই পৃথিবীর চারদিকে বৃত্তপথে ঘুরছে। তারকারা বহু দূরে বৃত্তপথে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে।
তাঁর এই অভিমত ছিল সরল, সহজ এবং সুসমন্বিত। পিথাগোরাস বিশ্বত্ত্ব সম্বন্ধে যে অভিমত পোষণ করতেন তার সঙ্গে বহু ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার অনুমান ভুল ছিল। টেলিস্কোপের অভাবে তাঁর পক্ষে বহু দূরের আকাশ গ্রহ নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভবপর হয়নি। অন্যদের তথ্যের উপরেই প্রধানত তাকে নির্ভর করতে হত। সে যুগে বৃত্তগতিই বিশ্বের স্বাভাবিক গতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। কোপার্নিকাসও তাই বিশ্বাস করতেন। এ বইটি ছিল কথোপকথনের ভঙ্গিতে লেখা। টলেমি–পৃথিবীর আহ্নিক গতি থাকলে এমন তীব্র বায়ুপ্রবাহের সৃষ্টি হত যে কোন পাখি তার নীড় ছেড়ে বার হলে আর ফিরে আসতে পারে। টলেমি–আহ্নিক গতি থাকলে পৃথিবী সাথে ঘুরছে তাই পাখিরা কুলায় ফিরে আসতে পারে। টলেমি–আহ্নিক গতি থাকলে পৃথিবী ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যেত।
