পড়াশুনায় এই আগ্রহ দেখে কাকা তাঁকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কাকাকে ধর্মপ্রচারের কাজে প্রায়ই বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হত। কোপার্নিকাসও তাঁর সঙ্গী হতেন। এই দেম ভ্রমণ তাঁর মনের উপর এক সুদূর প্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল।
স্কুলের পড়া শেষ করে ১৮ বছর বয়েসে কোপার্নিকাস ক্র্যাকাও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। সেই যুগে ক্র্যাকাও গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র ছিল। সেই যুগের বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ব্রডজেৎস্কি ছিলেন এখানকার শিক্ষক। কোপার্নিকাস কলাবিভাগের ছাত্র হলেও বেশির ভাগ সময়েই গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চচাং করতেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তার এই আগ্রহ দেখে কাকা বলতেন, আকাশের দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকাও।
কাকার ইচ্ছা অনুসারে তিনি ডাক্তারিতে ভর্তি হলেন। ডাক্তারি পাশ করলেন। কিন্তু মানুষের দেহের জটিলতার চেয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জটিলতাই তাকে বেশি আকৃষ্ট করত। তাই স্থির করলেন ইউরোপের শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি ইতালিতে গিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করবেন। কাকা তাঁকে পড়বার অনুমতি দিলেন।
ইতালিতে যাওয়ার আগে কিছুদিন তিনি ছবি আঁকায় মনোযোগী হয়ে ওঠেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি চিত্রকলায় দক্ষ হয়ে উঠলেন।
২৩ বছর বয়েসে তিনি ইতালির বেলেগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এখানে তিনি চার বছর অধ্যয়ন করেন। এই সময় প্রধানত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করতেন। গ্রীক ও ল্যটিন ভাষা শিখলেন যাতে গ্রীক ভাষায় লেখা জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন বই পড়তে পারেন। তাছাড়া প্রাচীন আরব পণ্ডিতদের লেখা বহু বই গ্রীক ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। তিনি এই সমস্ত বইগুলো গভীর মনোযোগ সহকারে পড়াশুনা করতেন। বেলেগনা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন ডোমেনিকো মারিয়া দ্য নোভারার। তিনি কোপার্নিকাসকে খুবই স্নেহ করতেন। তাঁকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চায় নানাভাবে সাহায্য করতেন। দুজনে একই সাথে গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করতেন। এই সব পর্যবেক্ষণের বহু তথ্য তিনি পরে তাঁর রচনায় অন্তর্ভুক্ত করেন। যথাসময়ে তিনি বেলেগনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করে রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসাবে যোগ দিলেন।
সেই সময় টলেমির সিদ্ধান্তগুলোই ছিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রধান পাঠ্য। কিন্তু কোপার্নিকাসের মনে টলেমির সিদ্ধান্তগুলো সম্বন্ধে সন্দেহ জেগে ওঠে। পৃথিবী এই মহাবিশ্বের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, তাকে কেন্দ্র করে সূর্য তারা চাঁদ ঘুরছে। এই মতকে তিনি অন্তর থেকে গ্রহণ করতে পারেননি।
ক্লাসে যখন কোপার্নিকাস ছাত্রদের টলেমির সিদ্ধান্ত পড়াতেন তখন তাঁর বার বার মনে হত তিনি কি ছাত্রদের ভুল শিক্ষা দিচ্ছেন! প্রকৃত সত্যকে জানবার জন্য তাঁর সমস্ত মন ব্যাকুল হয়ে উঠত। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস ও টলেমির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যারা অভিমত পোষণ করতেন তাদের যুক্তির সিদ্ধান্তগুলো গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করতে আরম্ভ করলেন।
শুধু অ্যারিস্টরাস নয়, পরবর্তী যুগে ফ্রান্সের রাজা পঞ্চম চার্লসের ব্যক্তিগত উপদেষ্টা ওরসিমি অ্যারিস্টটলের অভিমতের বিরুদ্ধে গতিশীল পৃথিবীর ধারণার কথা বলেন। কুপার নিকোলাস নামে এক পণ্ডিত বলেন, গ্রহ-নক্ষত্রের মত পৃথিবীও আবর্তিত হচ্ছে। লিওনার্দ দ্য ভিঞ্চিও বিশ্বাস করতেন পৃথিবী স্থির নয়, গতিশীল। তিনি বললেন, শুধু মাত্র বিশ্বাস নয়, পরীক্ষার দ্বারাই একমাত্র প্রকৃত সত্যে উপনীত হওয়া যায়। তাছাড়া কোপার্নিকাসের শিক্ষক ডোমেনিকোও অ্যারিস্টটলের মতে বিশ্বাস করতেন না।
এই পরস্পর বিরোধী অভিমতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কোপার্নিকাসের মনে হল প্রকৃত সত্যকে উদঘাটন করতেই হবে। যে বিষয়ে তিনি নিজেই সন্দিহান কেমন করে তা ছাত্রদের পড়াচ্ছেন এমন সময় একটি ছাত্র তাকে প্রশ্ন করল, আপনি যা বলছেন তা কি বিশ্বাস করেন?
দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়লেন কোপার্নিকাস। মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিলেন। ফিরে এলেন কাকা লুকাসের কাছে ফ্রাউয়েনবর্গে। এখানে তিনি গ্রাম্য যাজকের কাজ নিলেন। এই সময় থেকে শুরু হল তাঁর জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার পালা। কার অভিমত সঠিক টলেমি না পিথাগোরাস? ফ্রাউয়েনবার্গ ছিল একটি পাহাড়ি গ্রাম। অল্পদিনের মধ্যেই সেখানকার মানুষদের সাথে একাত্ম হয়ে গেলেন কোপার্নিকাস। তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে বিচলিত হয়ে পড়তেন। গীর্জার কাজের চেয়ে মানুষের সেবার কাজেই তার ছিল বেশি আনন্দ। অসুস্থ মানুষেরা তাঁর কাছে চিকিৎসার জন্য আসত। অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসাবে তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল।
কোপার্নিকাস ছিলেন বিচিত্র প্রতিভার অধিকারী। নানা বিষয়ে ছিল তাঁর সহজাত দক্ষতা। গ্রামের মানুষদের জল আনবার জন্য দীর্ঘ দু মাইল দূরে নদীতে যেতে হত। তিনি পাহাড়ের মাথায় বাঁধ বেঁধে দিয়ে গ্রামে জল নিয়ে এলেন। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন জ্ঞান ও দয়ার প্রতীক।
শুধুমাত্র চিকিৎসা আর সমাজসেবা নয়, রাজনীতি ও অর্থনীতি সম্বন্ধেও তাঁর ছিল সুগভীর জ্ঞান। তিনি নানা ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দিতেন। অর্থনীতির উপর তিনি একটি বই লিখেছিলেন। এই বইতে সে যুগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নানান ভুল ত্রুটির উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর বহু অভিমত সরকার গ্রহণ করে। তিনি দেখেছিলেন একই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকরা বিভিন্ন ধরনের মুদ্রা তৈরি করে। তিনি বললেন এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়। এক অঞ্চলের মুদ্রা অন্য অঞ্চলের মানুষ গ্রহণ করতে চায় না। তাছাড়া বিদেশী বণিকদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করবার সময় নানান অসুবিধা দেখা দেয়। লাভের আশায় শাসকেরা ইচ্ছামত মুদ্রামান কমায় বা বাড়ায়। কোপার্নিকাস সারা দেশে একই ধরনের মুদ্রা চালু করার কথা বললেন। তাছাড়া মুদ্রামান কমানোর বিপক্ষেও তিনি অভিমত প্রকাশ করতেন।
