মিশনারী সোসাইটি থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি তাঁর জবাবে বললেন, “আমি নিজেকে কখনো ঈশ্বরের দাস ছাড়া অন্য কিছু চিন্তা করিনি। তাঁরই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে আমি চালিত হয়েছি। মিশনারী হিসাবে আমি যে দায়িত্ব পালন করেছি তা বাইবেল হাতে ধর্মান্ধ প্রচারকদের থেকে কিছুমাত্র আলাদা নয়। তবে আমি শুধু ধর্মের প্রচারের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখিনি। তারই সাথে সাথে মানুষের চিকিৎসা করেছি, রাজমিস্ত্রির কাজ করেছি, ছুতোরের কাজ করেছি। আমি মনে করি যখন আমি আমার সঙ্গীদের খাবার জন্য শিকার করি, যখন আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করি, মানুষের জন্য কোন কাজ করি, সবই প্রভু যীশুর সেবা।”
তিনি ফিরে এলেন আফ্রিকায়। শুরু হল নতুন করে জাম্বেসি অভিযান। এইবার লিভিংস্টোনের সঙ্গী হলেন তাঁর ভাই জন। কিন্তু নানান অসুবিধার জন্য মাঝপথেই এই। অভিযান পরিত্যাক্ত হল। অকস্মাৎ লিভিংস্টোনে জীবনে নেমে এল এক বিচ্ছেদ বেদনা। তাঁর প্রিয়তমা পত্নীর মৃত্যু হল। লিভিংস্টোন লিখেছেন, “যখন তিনি তাকে বিয়ে করেছিলাম তখন থেকেই তাকে ভালবাসি, যতদিন বাঁচব তাকে ভালবেসে যাব।”
স্ত্রীর এই বিচ্ছেদ বেদনায় সাময়িক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন লিভিংস্টোন। সময়ের ব্যবধানে মনের শোক প্রশমিত হতেই নতুন অভিযানে বার হলেন। এইবার আবিষ্কার করলেন নিয়ামাহ্রদ। তার দশ দিনের মধ্যে উপস্থিত হলেন বাঙ্গোয়েল হদের তীরে। এই হ্রদটিও অজানা ছিল ইউরোপীয়ানদের কাছে। নিয়ামা হ্রদের তীরে এসে সমুদ্রে ভাসার মত ছোট একটি ডিঙি তৈরি করলেন। এই ডিঙি বেয়েই আফ্রিকার সমুদ্র উপকূল থেকে ২৫০০ মাইল উত্তাল সমুদ্র পার হয়ে লিভিংস্টোন এসে পৌঁছলেন ভারতবর্ষের বোম্বে শহরে। ভারতবর্ষ তখন ইংরেজ উপনিবেশ। ভারত ভ্রমণের ইচ্ছা ছিল লিভিংস্টোনের। কিন্তু তখন লন্ডন অভিমুখী একখানি জাহাজ যাত্রার জন্যে অপেক্ষা করছিল। লিভিংস্টোন আর অপেক্ষা করলেন না। সেই জাহাজের আরোহী হলেন। ১লা জুলাই ১৮৬৪ সালে তিনি ইংলন্ডের মাটিতে পা রাখলেন! ইংলন্ডে থাকাকালীন সময়ে তিনি তাঁর জাম্বেসি অভিযানের কাহিনী নিয়ে একখানি বই লিখলেন। এই বই প্রকাশের ব্যবস্থা করে তিনি আবার ফিরে চললেন আফ্রিকায়। ইংলন্ড তার জন্মভূমি হলেও আফ্রিকা ছিল তার কর্মভূমি। ইংলন্ডের সুখ বিলাসের মধ্যে থেকে প্রতিমুহূর্তে তিনি অন্তরে অনুভব করতেন আফ্রিকার আদিম অরণ্যের আহ্বান। এইবার আফ্রিকা যাত্রার সময় তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নীল নদের উৎস আবিষ্কার করবেন। আফ্রিকায় থাকার সময় তিনি দেখেছিলেন নিগ্রোদের নিয়ে ইউরোপীয়ানদের দাস ব্যবসা শুরু হয়েছে। এই ঘৃণিত ব্যবসা দেখে মনে মনে ব্যথিত হতে লিভিংস্টোন। মনে হয়েছিল মানবিতার বিরুদ্ধে এই ঘৃণিত অপরাধকে যেমন করেই হোক তাকে বন্ধ করতেই হবে। আফ্রিকায় ফিরে কিছু সাথী, একদল সিপাই নিয়ে যাত্রা করলেন। দলের অধিকাংশই ছির অভিযানের পক্ষে অযোগ্য। কিছু লোক মাঝপথে দল ত্যাগ করল। তারা ফিরে গিয়ে চারদিকে প্রচার করে দিল লিভিংস্টোনকে হত্যা করা হয়েছে। সাথে সাথে অনুসন্ধানী দল পাঠানো হল। অনেক অনুসন্ধানের পর এই সংবাদ মিথ্যা প্রমাণিত হল।
এইবার লিভিংস্টোন উত্তরের পথে চলতে চলতে গিয়ে পৌঁছলেন ট্যাঙ্গানিকা হ্রদের তীরে। বিশাল হ্রদ। কয়েক হাজার মাইল জুড়ে তার বিস্তৃত জলরাশি। এখানে গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন লিভিংস্টোন। কিন্তু নিজের দেহের প্রতি সামান্যতম ভ্রূক্ষেপ নেই লিভিংস্টোনে। ধীর পদক্ষেপে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলেছেন। কখনো ভিজে পোশাক গায়েই শুকিয়ে যাচ্ছে। ঠিক সময়ে খাওয়া হয় না। ক্রমশই শরীরের এমন অবস্থা হল, চলবার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেললেন। একদল আরব সেই পথে যাচ্ছিল। তাদের চিকিৎসা ও সেবাযত্নে পুনরায় সুস্থ হয়ে উঠলেন লিভিংস্টোন। আবার শুরু হল যাত্রা, লক্ষ্য নীল নদের উৎসস্থল! কিন্তু শরীরে আর আগের শক্তি ছিল না, তার উপর ক্রমাগত জ্বর আর আমাশায় ভুগছিলেন। সঙ্গীদের মধ্যে অধিকাংশই হয়ে উঠেছিল বিদ্রোহী। একটি নিগ্রো ছেলে তার সমস্ত ঔষুধ চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। সঙ্গের জিনিসপত্রও ফুরিয়ে এসেছিল। চলবার শক্তি হারিয়ে একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় অযাচিতভাবেই ঈশ্বরের আশীর্বাদ এসে গেল।
মিঃ এইচ. এম. স্টেনলি নামে এক ইংরেজ অভিযাত্রীকে লিভিংস্টোনের সন্ধানে পাঠানো হয়েছিল। একদিন মিঃ স্টেনলি দেখলেন একদল আরবের সাথে এক শীর্ণকায় শ্বেতাঙ্গ। সারা মুখে বড় বড় দাড়ি, মাথায় টুপি। মিঃ স্টেনলি এগিয়ে গিয়ে হাত ধরলেন–আপনিই কি ডঃ লিভিংস্টোন? মুহূর্তে লিভিংস্টোনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। মনে হল অন্ধকারে যেন আলোর দিশা খুঁজে পেলেন।
কয়েকদিন পর নতুন উদ্যমে দুজনে টাঙ্গানিকার উত্তর তীর ধরে এগিয়ে চললেন, এখান থেকে মিঃ স্টেনলি বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে লিভিংস্টোনের প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র, নতুন কুলি যোগাড় করে দিয়ে গেলেন।
কিন্তু লিভিংস্টোনের জীবনিশক্তি শেষ হয়ে এসেছিল, কিন্তু তাঁর অদম্য মনোবলে এতটুকু ফাটল ধরেনি। কোনক্রমে এগিয়ে চলেছেন আর প্রতিদিনকার বিবরণী খাতায় লিখে রাখলেন। দিনটা ছিল ১৮৭৩ সালের ২৭শে এপ্রিল। শেষ ডাইরি লিখলেন লিভিংস্টোন। তারপর আচ্ছন্নের মত বিছানায় লুটিয়ে পড়লেন। দুটো দিন কেটে গেল, ১লা মে ভোরবেলায় একটি নিগ্রো চাকর এসে দেখল তিনি বিছানার পাশে প্রার্থনারত অবস্থাতেই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন।
