কেপটাউনে থাকাকালীন সময়ে লিভিংস্টোনের সাথে পরিচয় হল জ্যোতির্বিজ্ঞানী স্যার টমাস ম্যাকলার-এর সাথে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি বরাবরই আগ্রহ ছিল লিভিংস্টোনের। ম্যাকলারের কাছে আরা গভীরভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নানান বিষয় শিক্ষালাভ করলেন। এই শিক্ষা থেকে তিনি জীবনে নানাভাবে উপকৃত হয়েছিলেন।
ফিরে এরেন কোবেঙ্গে তাঁর গৃহে। কিন্তু সেখানে তার জন্যে অপেক্ষা করছিল এক সর্বনাশা দৃশ্য। বুয়র সম্প্রদায়ের লোকেরা এসে কোবেঙ্গের সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে। লিভিংস্টোনের বাড়িতে যে সমস্ত ঔষধ ছিল, সব মাটিতে ফেলে দিয়ে মূল্যবান বইপত্র ছিঁড়ে নষ্ট করেছে।
এই বিপর্যয়ে মনোবল হারালেন না লিভিংস্টোন। স্থানীয় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাধ্যমত তাদের সাহায্য করতে থাকেন। কয়েক মাসের চেষ্টায় নতুন করে গড়ে উঠল গ্রাম।
১৮৫২ সালে আবার অভিযানে বার হলেন। তার ইচ্ছা জাম্বেসির উত্তর একটা নতুন। মিশন স্থাপন করেন। আগেরবার পুত্রকন্যাদের অসুস্থতার জন্য এই অভিযান পরিত্যাক্ত হয়। দ্বিতীয়বার দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে জাম্বেসির উত্তরে গিয়ে পৌঁছলেন, চারদিকে অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া। একধরনের বিষাক্ত মাছির ভয়াবহ উপদ্রব। মানুষের বসতি নেই বললেই চলে। লিভিংস্টোন বুঝতে পারলেন এখানে মিশন স্থাপন করা সম্ভব নয়। কিছুটা হতাশ মনেই ফিরে এলেন লিভিংস্টোন।
মনের সাময়িক দুর্বলতাকে কাটিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই নতুন অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করলেন। এবার লক্ষ্য পশ্চিমের সমুদ্র উপকূলে পৌঁছবার সহজতম পথ খুঁজে বার করা। তাঁর সঙ্গী হল সাতাশ জন আদিবাসী। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে ১৮৫৩ সালের ১১ই নভেম্বর লিভিংস্টোন যাত্রা করলেন। আদিবাসী সর্দার প্রধান পথপ্রদর্শক। চলতে চলতে তারা এসে পড়লেন এক অসভ্য বর্বর প্রকৃতির আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়। এরা তুচ্ছ কারণে মানুষ খুন করে। লিভিংস্টোন ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের দেখে আদিবাসীরা চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলল। কিন্তু লিভিংস্টোনের দলভুক্ত আদিবাসী সর্দারের উপস্থিত বুদ্ধি অসীম সাহস ও ধৈর্যবলে বর্বর উপজাতিদের হাত থেকে বহুকষ্টে রক্ষা পেলেন লিভিংস্টোন। কিন্তু অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন লিভিংস্টোন। কিন্তু তাঁর চলার গতি কখনো রুদ্ধ হত না। কখনো গভরি অরণ্য, কখনো বন্ধুর পাথুরে পথ, জনমানবহীন বালুকাময় মরুভূমি পার হয়ে এগিয়ে চললেন। মাঝে মাঝে শরীর এত অসুস্থ হয়ে পড়ত আর পথ চলতে পারতেন না। কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলতেন। এত দীর্ঘ পথশ্রম, অনিশ্চিত গন্তব্যস্থল লিভিংস্টোনের আদিবাসী অনুচররা ক্রমশই অধৈর্য হয়ে ওঠে। অনেকে আর অগ্রসর হতে অস্বীকার করে। অসীম মানসিক দৃঢ়তায় অসুস্থ দেহেই পিস্তল হাতে এগিয়ে যান। সরাসরি সেই সব বিদ্রোহীদের সামনের দাঁড়িয়ে গর্জন করে ওঠেন, যারা আমার আদেশ অমান্য করবে তারা লড়াইয়ের জন্য তৈরি হও। আমি কোন কারণেই দলের প্রধান। আমার হুকুম মেনে চলাই তোমাদের কাজ।
এইভাবে নানান প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে পশ্চিম মুখে এগিয়ে চললেন। তারা এসে পড়লেন আঙ্গোলায়। সেখানে পর্তুগীজ সেনাবাহিনীর কাছ থেকে পথনির্দেশ পেয়ে অবশেষে এসে পৌঁছলেন সমুদ্রতীরের সাও পাওলা দ্য লুয়ান্ডায়। তারিখটা ছিল মে ৩১, ১৮৫৪ সাল। লিভিংস্টোনের স্বপ্ন সফল হল। সেখান থেকে ইংলন্ডে ফিরে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেলেন লিভিংস্টোন। তাঁর অভিযান তখনো শেষ হয়নি। তাছাড়া তার দলের সদস্যদের দেশে পৌঁছে দিতে হবে। নেতা হিসাবে সে দায়িত্ব তাঁর।
সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে পুনরায় রওনা হলেন। যে পথে তারা এসেছিলেন সেই পথ ধরে ফিরে চললেন। পথিমধ্যে প্রচণ্ড কলেরায় আক্রান্ত হলেন লিভিংস্টোন। জীবনের আশা প্রায় ছিল না, কিন্তু তবুও রক্ষা পেলেন এবার আর পায়ে হাঁটা নয়, পুরো পথটাই, বলদের পিঠে চেপে চলা। অবশেষে তিনি সদলবলে এসে পৌঁছলেন লিয়ান্টিতে। স্থানীয় মানুষ তাকে বীরের মত অভ্যর্থনা জানাল। তার সম্মানে উৎসবের আয়োজন করা হল।
অজানা পথের ডাকে বেশি দিন ঘরে থাকতে পারলেন না লিভিংস্টোন। কিছু দিন পর আবার পথে বার হলেন। এইবার আবিষ্কার করলেন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলপ্রোপাত ভিক্টোরিয়া। তখন স্থানীয় নাম ছিল মোসিয়াটুনিয়া (শব্দময় বাধা)। একদিকে যেমন তার প্রচণ্ড গর্জন অন্যদিকে অনেক উঁচু থেকে পড়বার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলবিন্দুতে ধোয়ার সৃষ্টি হত। এই সময় তাঁকে অমানুষিক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছিল। পথ ভুলে তিনি গিয়ে পড়েছিলেন মানুষখেকো উপজাতিদের মধ্যে। প্রাণ বাঁচাতে দিনের বেলায় জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতেন। গাছের শেকড়, বুনো ফল আর মধু খেয়ে দিন কাটাতেন। একবার ভুলক্রমে এক জলার মধ্যে গিয়ে পড়লেন। গভীর পাঁকের অতলে হয়ত চিরদিনের মত হারিয়ে যেতেন, ভাগ্নক্রমে তার একজন সঙ্গী দেখতে পেয়ে তাকে উদ্ধার করে।
নতুন অঞ্চল আবিষ্কারে নেশায় ঘর-বাড়ি ছাড়লেও স্ত্রী পুত্রদের কথা ভোলেননি লিভিংস্টোন। দীর্ঘ পাঁচ বছর তাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়নি তাঁর। তাছাড়া কিছুদিন ধরেই অন্তরে অনুভব করছিলেন স্বদেশের টান। লন্ডনের পথে রওনা হলেন লিভিংস্টোন। ইংলন্ডে পৌঁছতেই তিনি পেলেন বীরের সম্মান। সমস্ত দেশ অজানা আফ্রিকাকে আবিষ্কারের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানায়। রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটি তাঁকে ভৈক্টোরিয়া পদক প্রদান করল। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানিক ডিগ্রি প্রদান করল। এত সন্নানে ভূষিত হয়েও তিনি সামান্যতম অহঙ্কার অনুভব করেননি। তাঁর দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিলেন। এরই ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে গড়ে উঠল অভিনেত্রী মিশন। লিভিংস্টোনকে এই মিশনের প্রদান নিযুক্ত করা হল। ঠিক হল এই মিশন পূর্ব ও মধ্য আফ্রিকায় অভিযান চালাবে। লিভিংস্টোন লন্ডন মিশনারী সোসাইটি থেকে পদত্যাগ করে অভিযাত্রী মিশনের ভার গ্রহণ করলেন।
