তাঁর প্রিয় চাকরটি বহুকষ্টে লিভিংস্টোনের মৃতদেহ, তার জিনিসপত্র সবকিছু নিয়ে এল জনজিবারে সাগরের উপকূলে। সেখান থেকে সেই মৃহদেহ জাহাজে করে ইংলন্ডের ওয়েস্ট মিনিস্টার এ্যবেতে নিয়ে গিয়ে সমাধিস্থ করা হল। দেহ ইংলন্ডে গেলেও লিভিংস্টোনের আত্মা রয়ে গিয়েছিল তাঁর প্রিয় আফ্রিকায়।
৭৫. লুই পাস্তুর (১৮২২-১৮৯৫)
প্যারিসের এক চার্চে একটি বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন চলেছে। কন্যাপক্ষের সকলে কনেকে নিয়ে আগেই উপস্থিত হয়েছে। পাত্রপক্ষের অনেকেই উপস্থিত। শুধু বর এখনো এসে পৌঁছাননি। সকলেই অধীর উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছে কখন বর আসবে। কিন্তু বরের দেখা নেই।
চার্চের পাদ্রীও অধৈর্য হয়ে ওঠে। কনের বাবা পাত্রের এক বন্ধুকে ডেকে বললেন, কি ব্যাপার, এখনো তো তোমার বন্ধু এল না? পথে কোন বিপদ হল না তো?
বন্ধু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ল। দু-চার জায়গায় খোঁজ করল কিন্তু কোথাও বরের দেখা নেই। হঠাৎ মনে হল একবার ল্যাবরেটরিতে গিয়ে খোঁজ করলে হত। যা কাজপাগল মানুষ, বিয়ের কথা হয়ত একেবারেই ভুলে গিয়েছে।
ল্যাবরিটরিতে গিয়ে হাজির হল বন্ধু। যা অনুমান করেছিল তাই সত্যি। টেবিলের সামনে মাথা নিচু করে আপন মনে কাজ করে চলেছে বর। চারপাশের কোন কিছুর প্রতিই তার দষ্টি নেই। এমনকি বন্ধর পায়ের শব্দেও তাঁর তনায়তা ভাঙে না। আর সহ্য করতে পারে না বন্ধু, রাগেতে চেঁচিয়ে ওঠে, আজ তোর বিয়ে, সবাই চার্চে অপেক্ষা করছে আর তুই এখানে কাজ করছিস!
মানুষটা বন্ধুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল, বিয়ের কথা আমার মনে আছে কিন্তু কাজটা শেষ না করে কি করে বিয়ের আসরে যাই!
বিজ্ঞানের গবেষণায় উৎসর্গীকৃত এই মানুষটির নাম লুই পাস্তুর। ১৮২২ সালের ক্রীসমাস পর্বের দুদিন পর ফ্রান্সের এক ক্ষুদ্র গ্রাম জেলেতে পাস্তুর জনুগ্রহণ করেন। বাবা যোসেফ পাস্তুর প্রথম জীবনে নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীতে সৈন্যাধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করতেন। ওয়ার্টালুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের পর যোসেফ পাস্তুর প্রথম জীবনে নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীতে সৈন্যাধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করতেন। ওয়ার্টালুর যুদ্ধে নেপোলিয়েনের পরাজয়ের পর যোসেফ পাস্তুর নিজের গ্রামে ফিরে এসে ট্যানারির কাজে যুক্ত হন। অল্প কিছুদিন পরেই স্বগ্রাম পরিত্যাগ করে আরবয় নামে এক গ্রামে এসে পাকাপাকিভাবে বসবাস আরম্ভ করলেন। এখানেই ট্যানারির (চমড়া তৈরির কাজ) কারখানা খুললেন। যোফেস কোনদিনই তাঁর পুত্র লুইকে ট্যানারির ব্যবসায়ে যুক্ত করতে চাননি। তার ইচ্ছা ছিল পুত্র উপযুক্ত শিক্ষালাভ করুক। কয়েক বছর স্থানীয় স্কুলে পড়াশুনা করবার পর যোফেস পুত্রকে পাঠালেন প্যারিসের এক স্কুলে।
গ্রামের মুক্ত প্রকৃতির বুকে বেড়ে ওঠা লুই প্যারিসের পরিবেশ কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। শহরের দমবন্ধ পরিবেশ অসহ্য হয়ে উঠত তাঁর কাছে। মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। এই সময় একটা চিঠিতে লিখেছেন, “যদি আবার বুক ভরে চামড়া গন্ধ নিতে পারতাম, কয়েকদিনেই আমি সুস্থ হয়ে উঠতাম।”
অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই ধীরে ধীরে শহরের নতুন পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেন লুই। তাঁর গভীর মেধা অধ্যাবসায় পরিশ্রম শিক্ষকদের দৃষ্টি এড়াল না। ছাত্রের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, লুই পাস্তুর একজন কৃতি শিক্ষক হবে, তার সে ভবিষ্যত্বাণী মিথ্যে হয়নি।
এরপর তিনি ভর্তি হলেন রয়েল কলেজে। সেখান থেকে ১৮ বছর বয়েসে স্নাতক হলেন। এই সময় নিজের কলেজেই তিনি একদিকে শিক্ষকতার কাজ শুরু করলেন, অন্যদিকে বিজ্ঞানে ডিগ্রী নেবার জন্য পড়াশুনা করতে থাকেন। মাত্র কুড়ি বছর বয়েসে তিনি বিজ্ঞানে স্নাতক হলেন।
বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে পাস্তুরের প্রিয় বিষয় ছিল রসায়ন। রসায়নের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করতে আরম্ভ করলেন। দু’বছর পর মাত্র বছরে লুই পাস্তুর স্টাপবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের অধ্যাপক পদ গ্রহণের জন্য ডাক পেলেন। আনন্দের সঙ্গে এই পদ গ্রহণ করলেন পাস্তুর।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর ছিলেন মঁসিয়ে লরেন্ট। তাঁর গৃহে নিয়মিত যাতায়াত করতে করতে রেক্টরের ছোট মেয়ে মেরির প্রেমে পড়ে যান। কয়েক সপ্তাহ পরেই রেক্টরের কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন পাস্তুর। চঁসিয়ে লরেন্টও অনুভব করেছিলেন পাস্তুরের প্রতিভা। তাই এই বিয়েতে তিনি সানন্দে সম্মতি দিলেন।
কিন্তু বিজ্ঞান তপস্বী লুই পাস্তুর বিয়ের দিনেই বিয়ের কথা প্রায় ভুলতে বসেছিলেন। এই মিলন পাস্তুরের জীবনকে সুখ-শান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছিল। স্ত্রী মেরি ছিলেন পাস্তুরের যোগ্য সহচরী। স্বামীর সর্বকাজে আজীবন তিনি সাহায্য করে গিয়েছেন।
একবার ফ্রান্সের যুবরাজ স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে এলেন, সেই উপলক্ষে বিরাট আনন্দ উৎসবের আয়োজন করা হল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষকরাই তাদের পরিবারের লোকজন নিয়ে সেই আনন্দ উৎসবে যোগদান করল। শুধু পাস্তুর তার গবেষণাগারে আপন কাজে এত আত্মমগ্ন হয়ে গিয়েছিলেন, ভুলেই গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানের কথা।
সন্ধ্যেবেলায় যখন নিজের গৃহে ফিরে এলেন পাস্তুর সমস্ত দিনের আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেন নি বলে একটিবারের জন্য অনুযোগ করলেন না মেরি। স্বামীর সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি। তাই পরবর্তীকালে পাস্তুরের এক ছাত্র বলেছিল, তিনি শুধু পাস্তুরের স্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন তার যোগ্য সহচরী।
