লিভিংস্টোনের ইচ্ছা ছিল দূর কোন দেশে গিয়ে চিকিৎসাকে সেবার হিসাবে গ্রহণ করবেন। প্রথমে স্থির করলেন চীন দেশে যাবেন। কিন্তু সেখানে তখন শুরু হয়েছে আফিমের যুদ্ধ। তাই চীন যাত্রার পরিকল্পনা বাতিল করতে হল। এই সময় আফ্রিকায় একজন চিকিৎসক পাঠাবার প্রয়োজন হয়েছিল। লিভিংস্টোন আবেদন জানালেন, তাঁর আবেদন মঞ্জুর করা হল। অবশেষে ১৮৪০ সালের শেষ দিকে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় সমুদ্রপথে যাত্রা করলেন।
দীর্ঘ সমুদ্রপথ। জাহাজের কাপ্তেনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কাপ্তেনের কাছে নানান বিষয়ে শিক্ষালাভ করলেন লিভিংস্টোন। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল আকাশের গ্রহ-নক্ষত্র দেখে দিক নির্ণয় করা। এই শিক্ষা পরবর্তী জীবনে লিভিংস্টোনকে নানাভাবে সাহায্য করেছিল। অবশেষে লিভিংস্টোন দক্ষিণ আফ্রিকার আলগোয়ায় এসে অবতরণ করলেন। এই বার শুরু হল স্থলপথে যাত্রা। আলগোয়া থেকে মিশনারী সংস্থার প্রধান কার্যালয় কুরু মান প্রায় ৭০০ মাইল দূর। এই সুদীর্ঘ পথ কখনো পায়ে হেঁটে কখনো বলদের পিঠে চেপে রওনা হলেন। দুর্গম বন্ধুর পথ। কিন্তু কোন কছুিতেই বিচলিত হলেন না লিভিংস্টোন। এই সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে এক সময় কুরুমানে গিয়ে পৌঁছলেন। এখানে থেকেই শুরু হল তার কর্মজীবন।
লিভিংস্টোন সঙ্গী-সাথী, প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন দূরতম অঞ্চলে। সেইখানে তখনো সভ্যতার আলো গিয়ে পৌঁছায়নি। চিকিত্সার সাথে সাথে চলত ধর্মের শিক্ষা। এক এক বারে কয়েক মাস ধরে চলত তাঁর পরিক্রমা, তারপর ফিরে আসতেন কুরুমানে। এই সমস্ত পরিক্রমায় তাঁর অনুসন্ধিৎসু মন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করত চারদিকের প্রাকৃতিক পরিমন্ডল, গাছপালা, ভূ-প্রকৃতি এবং সবকিছু নিখুঁতভাবে ডাইরির পাতায় লিখে রাখতেন।
তিন বছর আফ্রিকায় রয়ে গেলেন লিভিংস্টোন। কুরুমান মিশনারী সংস্থার প্রধান ছিলেন ডঃ রবার্ট। তার একমাত্র মেয়ে মেরি। নির্জন নির্বান্ধব জগতে মেরিকে দেখে ভাল লেগে গিয়েছিল লিভিংস্টোনের। ১৮৪৪ সালে দুজনে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হলেন। লিভিংস্টোন স্ত্রীর সম্বন্ধে লিখেছেন, “সে সুন্দরী নয়, মাথায় খাটো, ভাল স্বাস্থ্য, একমাথা কোঁকড়ানো চুল। মোটের উপর একটা মেয়ে, এটাই আমার বড় পাওয়া।”
লিভিংস্টোন স্ত্রীকে নিয়ে কুরুমান থেকে ২০০ কি. মি. দূরে মাবেস্তা নামে এক জায়গায় বাসা বাঁধলেন। অল্পদিনের মধ্যেই নিজের চেষ্টায় এখানে একটা বাড়ি তৈরি করলেন লিভিংস্টোন। আফ্রিকার আদিম প্রকৃতির মধ্যে সুখেই দিন কাটছিল নব দম্পতির। ক্রমশই পারিপার্শ্বি অবস্থা, স্বামীর কঠোর অনাড়ম্বর সরল জীবনের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মানিয়ে নেন মেরি। প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন লিভিংস্টোনের আদর্শ সঙ্গিনী। প্রায়ই স্ত্রীকে রেখে ছোট ছোট অভিযানে বার হতেন লিভিংস্টোন। বিপদসঙ্কুল দুর্গম পথ। একদিন বাড়িতে ফিরছেন, এমন সময় আচমকা জঙ্গলের মধ্যে থেকে একটা সিংহ বেরিয়ে এল তার সামনে। সঙ্গী-সাথীরা বেশ কিছুটা দূরে। তাড়াতাড়ি হাতের বন্দুক তুলে নিলেন লিভিংস্টোন। গুলি করতেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন। গুলিটা সিংহকে সামান্য আহত করে বেরিয়ে গেল। মুহূর্তে আহত সিংহ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ক্ষিপ্ততার সঙ্গে দেহটাকে সরিয়ে নিলেন লিভিংস্টোন। কিন্তু সিংহের একটা থাবা এসে পড়ল তার বা হাতে। ততক্ষণে লিভিংস্টোনের সঙ্গীরা ছুটে এসেছে। সিংহ ভয়েতে পালিয়ে গেল। কিন্তু হাতের খানিকটা মাংস তুলে নিয়ে গেল। আহত রক্তাক্ত লিভিংস্টোনকে সকলে বাড়িতে নিয়ে এল। কয়েক মাসের সেবা-যত্নে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন লিভিংস্টোন। কিন্তু আগের মত বাঁ হাতের শক্তি আর ফিরে পেলেন না।
কাজের তাগিদে মাবেস্তা ত্যাগ করতে হল লিভিংস্টোনকে। এইবার এগিয়ে গেলেন আরো পশ্চিমে। নতুন বাসা বাঁধলেন কোবেঙ্গ নদীর তীরে। অল্পদিনেই স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠল লিভিংস্টোনের। তাদের একমাত্র জীবিকা ছিল চাষবাস। লিভিংস্টোন তাদের শেখালেন চাষের নতুন পদ্ধতি। জমিতে কিভাবে জল সেচ করতে হয় তার বিভিন্ন উপায়। কিছুদিনের মধ্যেই নতুন প্রবর্তিত কৃষি ব্যবস্থার সুফল পাওয়া গেল। কিন্তু এক জায়গায় দীর্ঘদিন বসবাস করবার কোন ইচ্ছাই ছিল না লিভিংস্টোনের। মাঝে মাঝেই তিনি অজানা দেশে পাড়ি দেবার স্বপ্ন দেখতেন। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে প্রশ্ন করে বুঝতে পারলেন উত্তরের দেশগুলো এখাননা অজানা রয়ে গিয়েছে। মিশনারী হিসাবে সেই সমস্ত অনাবিষ্কৃত অঞ্চল খুঁজে বার করে সেখানকার মানুষের কাছে সভ্যতার বাণীকে তুলে ধরতে হবে। কিছু লোক নাগামি নামে একটি হ্রদের সন্ধান করেছিল। ১৮৪৯ সালে লিভিংস্টোন দুজন ইংরেজ অভিযাত্রীকে সাথে নিয়ে অনুসন্ধানে বার হলেন। কয়েকদিন পথ চলার পর তাঁরা এসে পড়লেন কালাহারি মরুভূমির প্রান্তরে। ইতিপূর্বে কোন ইউরোপবাসীই সেই দুস্তর মরুভূমি পার হয়নি। অকুতোভয় লিভিংস্টোন তাঁর সাথীদের নিয়ে এগিয়ে চললেন। তারা উত্তর-পশ্চিম দিক লক্ষ্য করে চলতে চলতে মরুভূমি পার হয়ে একটা নদীর প্রান্তে এসে পৌঁছলেন। সেখানে কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার এগিয়ে চললেন। এবার জনমানবহীন শুষ্ক প্রান্তর। কোথাও জল নেই, চলার জন্য গরুর গাড়ি নেই। অমানুষিক পরিশ্রমে অবশেষে লিভিংস্টোনের প্রথম উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। এরপর থেকে লিভিংস্টোন আফ্রিকার অজানা অঞ্চলের সন্ধানেই জীবন উৎসর্গ করেন। পরের বছর লিভিংস্টোন আবার বার হলেন। এইবার তার সঙ্গী হল স্ত্রী মেরি ও ছেলেমেয়েরা। কিন্তু মাঝপথেই অভিযান পরিত্যাগ করতে হল লিভিংস্টোনকে। পথে এক ধরনের বিষাক্ত মাছির কামড়ে ছেলেমেয়েরা অসুস্থ হয়ে পড়ল।সাথে তেমন কোন ঔষধ নেই, তার উপর অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া, পথের কষ্ট। গৃহে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন। লিভিংস্টোন বুঝতে পারছিলেন আফ্রিকার আদিম অরণ্যময় পরিবেশে থাকলে স্ত্রী ছেলেমেয়েরা আরো অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাছাড়া ছেলেমেয়েরা শিক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা করলেন। কেপটাউন থেকে তাদের জাহাজে তুলে দেওয়া হল।
