জীবনকালে গ্রীস দেশে পিথাগোরাসের জনপ্রিয়তা ছিল বিরাট। তাঁর ছাত্র শিষ্য ছাড়াও দেশের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তার পাণ্ডিত্যের জন্য তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা করত। ক্রমশই পিথাগোরাসের অনুগামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাদের মধ্যে অনেকে জ্ঞানচর্চার চেয়ে রাজনীতির চর্চায় বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠে। দেশের রাজশক্তি এতে চিন্তিত হয়ে ওঠে। তাছাড়া কিছু বুদ্ধিজীবীও পিথাগোরাসের খ্যাতির জনপ্রিয়তা সম্মানে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিল। তারা রাজশক্তির সাথে একত্রিত হয়ে পিথাগোরাসের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করতে আরম্ভ করল। এই প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে জনসাধারণ পিথাগোরাসের শিক্ষাকেন্দ্র আক্রমণ করল। পিথাগোরাসের শিষ্য যারা বাধা দিতে এল তারা মারা পড়ল, অনেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচাল।
শিষ্যদের অনুরোধে পিথাগোরাসও পালাতে আরম্ভ করলেন। তিনি বিক্ষুব্ধদের প্রায় নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিলেন। হঠাৎ সামনে পড়ল কলাই জাতীয় এক শস্যের ক্ষেত। তিনি ইচ্ছে করলেই ক্ষেতের উপর দিয়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি বিশ্বাস করতেন–কলাইয়েরও প্রাণ আছে। একটি জীবন্ত কলাইয়ের উপর পা দেওয়ার অর্থ একটি জীবনকে হত্যা করা। নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও কলাইয়ের উপর পা রাখলেন না। সেই সুযোগে বিপক্ষ দলের লোকেরা এসে তাকে হত্যা করল। নিজের জীবন দিয়ে নিজের আদর্শকে রক্ষা করলেন পিথাগোরাস।
৭৪. ডেভিড লিভিংস্টোন (১৮১৩-১৮৭৩)
প্রায় দেড়শো বছর আগেকার কথা। তখন আফ্রিকা মহাদেশকে বলা হত অন্ধকার মহাদেশ। উত্তরে মিশরকে বাদ দিয়ে আফ্রিকার অবশিষ্ট সমস্ত অঞ্চল জুড়েই ছিল গভীর অরণ্য। মানুষেরা ছিল আদিম অসভ্য বর্বর। শিক্ষার কোন আলোই সেখানে পৌঁছায়নি। সভ্য মানুষেরা যেখানে যেত শিকারের লোভে আর দেশ জয়ের আকাঙ্ক্ষায়। ডেভিট লিভিংস্টোন প্রথম মানুষ যিনি অন্ধকারে মহাদেশে গেলেন, মনে অদম্য সাহস, উৎসাহ, ভালবাসা আর আত্ম-উৎসর্গের অনুপ্রেরণা। তিনিই প্রথম মানুষ যিনি পাশ্চাত্য সভ্যতার আলোকে তুলে ধরেছিলেন আফ্রিকার মানুষের কাছে।
ডেভিড লিভিংস্টোনের জন্ম ১৮১৩ সালের ১৯শে মার্চ গ্লাসগোর কাছে ব্লানটায়ারে। তাঁর পিতা নীল লিভিংস্টোন ছিলেন সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। খুচরো চায়ের কারবারের সাথে মিশনারীর কাজ করতেন। প্রায়শই ধর্মীয় কাজে এত বেশি জড়িত হয়ে পড়তে ব্যবসায়ের ক্ষতি হত। কখনো তার জন্যে সামান্যতম দুঃখিত হতেন না নীল লিভিংস্টোন। মনে করতেন তিনি যা কিছু করেন ঈশ্বরের অভিপ্রেত অনুসারেই করেন।
নিজের এই ঈশ্বর বিশ্বাস পুত্রের মধ্যে অনুপ্রাণিত করেছিলেন পিতা। তিনি চাইতেন লিভিংস্টোন যেন কোন বিজ্ঞানের বই না পড়ে। ধর্মীয় সাধনায় পরিপূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করে। লিভিংস্টোন সমস্ত জীবন ধরে ছিলেন ঈশ্বর বিশ্বাসী কিন্তু কোন ধর্মীয় গোঁড়ামি তার মধ্যে ছিল না। তিনি লিখেছিলেন কোন কোন ব্যাপারে আমি পিতার সঙ্গে কিছুতেই একমত হতে পারতাম না। তার ইচ্ছা অনুসারে কোনদিনই আমি ধর্মের শুকনো নিয়মের মধ্যে নিজেকে বাঁধতে পারিনি।
সংসারের অভাব-অনটনের জন্য দশ বছর বয়েসে ডেভিডকে সুতো কারখানায় কাজ নিতে হল। সেই শিশু বয়সেই তাকে প্রতিদিন চোদ্দ ঘণ্টা করে কাজ করতে হত। এত পরিশ্রম করেও তার মধ্যে ছিল পড়াশুনা করবার প্রবল আগ্রহ। কাজের ফাঁকে যেটুকু সময় পেতেন তখনই নানান বিষয়ের বই পড়তেন। কারখানার অন্য শ্রমিকরা ভাবত বয়সের তুলনায় পাকা ছেলে। অনেকেই তাকে ঠাট্টা করত। কিন্তু শিশুকাল থেকেই এমন গভীর আত্মবিশ্বাস ছিল যে সামান্যতম বিচলিত হতেন না লিভিংস্টোন।
বই পড়তে পড়তে মনের মধ্যে জেগে উঠত নানান কল্পনা। সবচেয়ে ভাল লাগত ভ্রমণ কাহিনী। তাঁর মন ভেসে চলত অজানা দেশে। ভাবতেন তিনিও যাবেন ঐ সমস্ত দেশে। একদিন এক জার্মান মিশনারীর লেখা একটি বই তার হাতে এল। বইখানি পড়তে পড়তে মিশনারী জীবনের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। কিন্তু পিতার ধর্মীয় উন্মাদনাকে কোনদিনই শ্রদ্ধার চোখে দেখতে পারেননি লিভিংস্টোন। তাঁর মনের মধ্যে জেগে ওঠে এক গভীর সংশয় আর দ্বন্দ্ব। টমাস ডিকের লেখা একটি বই পড়ে তার মনের মধ্যে এক নতুন চেতনার উন্মেষ হল। “ধর্ম এবং বিজ্ঞান কেউ পরস্পরের বিরোধী নয়। উভয়েই উভয়ের পরিপূরক। বিজ্ঞান চেতনা নিয়ে যদি ধর্মের সাধনা করা যায় তবে সেখানে কোন গোঁড়ামি, ধর্মীয় উন্মাদনা প্রবল হয়ে উঠতে পারে না।” তখনই তিনি মিশনারী জীবনকে গ্রহণ করবার জন্য মনস্থির করলেন।
কৈশোর অতিক্রম করে তারুণ্যে পা দিয়েছেন লিভিংস্টোন। ইতিমধ্যে সামান্য কিছু সঞ্চয়ও হয়েছিল। তাঁর এক ভাইও অর্থ উপার্জন করছিল। বাবা ও ভাইয়ের উৎসাহে তেইশ বছর বয়েসে তিনি গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। এখানে তাঁর পাঠ্য বিষয় ছিল গ্রীক ভাষা সাহিত্য, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং ধর্মশাস্ত্র। এক বছর পর তিনি লন্ডন মিশনারী সোসাইটিতে শিক্ষানবিসি শুরু করলেন। কিন্তু ধর্মপ্রচারক হিসাবে তার ব্যর্থতা অল্পদিনেই প্রকট হয়ে উঠল। তাছাড়া এই কাজের মধ্যে তিনি তার মানসিক আনন্দও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মিশনারী সোসাইটির শিক্ষানবিসি ছেড়ে চিকিৎসাবিদ্যা সংক্রান্ত কাজে ভর্তি হলেন। লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে দীর্ঘ কাজে ভর্তি হলেন। লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে দীর্ঘ দু’বছর শিক্ষানবিসি করে ডাক্তারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
