পিথাগোরাসের জীবনকালের মধ্যেই তাঁর অনুগামীদের নিয়ে একটি সম্প্রদায় গেড় ওঠে। এরা সকলেই ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা ছিল না বলেই তারা জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে জীবনাচরণ করতেন। পিথাগোরাস ছিলেন জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী। তাঁর সম্বন্ধে হেরাক্লিস্টাস লিখেছেন, পিথাগোরাসের জ্ঞান সাধনা সাধারণ মানুষের জ্ঞানের সীমাকে অতিক্রম করেছিল। বহু পদার্থ সম্বন্ধে যেমন তার জ্ঞান ছিল তেমনি বহু হানিকর প্রয়োগবিদ্যাও তাঁর জ্ঞাত ছিল। তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য এবং তিনি অপ্রাকৃত নিরাময় শক্তির অধিকারী ছিলেন।
পিথাগোরাস বিশ্বাস করতেন বিশ্বের সকল বস্তুকেই সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। সংখ্যা সম্বন্ধে তার দুর্বলতা ছিল অপরিসীম। সংখ্যা নিয়ে তাদের ব্যাখ্যা ছিল যেমন বিচিত্র তেমনি অদ্ভুত। যেমন কোন বিন্দুকে এক হিসাবে ধরে নিয়ে পর পর বিন্দু বসালে একটি রেখার সৃষ্টি হবে। এই রেখাকে ২ হিসাবে ধরে নেওয়া হত। দৈর্ঘ্য-প্রস্থের যে ক্ষেত্রফল তা প্রকাশ করবার জন্য ৩ কে বিবেচনা করা হত। ৪ সংখ্যাটিকে বস্তর ঘনত্রের। পরিমাপ হিসাবে ব্যবহার করা হত।
সেই যুগে মানুষ দশ অবধি গণনা করতে পারত। পিথাগোরাস সংখ্যাগুলোর এইভাবে ব্যাখ্যা করতেন, ১ সমস্ত সংখ্যার আদি। এর পূর্বে আর কোন সংখ্যা নেই, সুতরাং এই সংখ্যাটির মধ্যে দিয়ে স্বয়ং ঈশ্বরই ব্যক্ত হয়েছেন। সুতরাং ১ অত্যন্ত পবিত্র সংখ্যা পুরুষের প্রতীক। ২ (নারী) + ৩ (পুরুষ)= ৫ হল বিবাহের সংখ্যা। ৪ কে বলা হত ন্যায়ের প্রতীক। ১০ তিনি বিবেচনা করতেন যাদু সংখ্যা।
বিবাহ ও বন্ধু নির্বাচনের সময় তিনি সংখ্যার খুবই গুরুত্ব দিতেন। শোনা যায় কোন এক যুবরাজ তাঁর মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। বিবাহের সময় তিনি গণনা করে দেখলেন তাঁর নামের সংখ্যা ২৮৪। তিনি ঘোষণা করলেন যে কন্যার নামের সংখ্যা হবে ২২০, সেই হবে তার আদর্শ স্ত্রী।
তবে পিথাগোরাস তার নিজের বিবাহের সময় এই সংখ্যার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেননি। তিনি তাঁরই এক ছাত্রী থিয়ানোকে বিবাহ করেছিলেন। থিয়ানো শুধু তার যোগ্য ছাত্রী ছিলেন তাই নয়, তিনি ছিলেন আদর্শ স্ত্রী। থিয়ানোর গর্ভে পিথাগোরাসের একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তার নাম ড্যামো। ড্যামো ছিলেন পিতার মতই পণ্ডিত দার্শনিক। পিথাগোরাস সমস্ত জীবন ধরে যা কিছু রচনা করেছিলেন তা গুপ্ত রাখবার জন্য কন্যাকে নির্দেশ দিয়ে যান। আমৃত্যু কন্যা সেই নির্দেশ পালন করেছিল।
সংগীতের সঙ্গে সংখ্যার যে নিবিড় সম্পর্ক–অর্থাৎ সংগীতের সাথে তাল ও লয়ের যে ঐক্যতা পিথাগোরাসেরই আবিষ্কার। এই প্রসঙ্গে একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। তিনি একদিন রাজপথ দিয়ে হাঁটছিলেন, পথের ধারে এক কামারের দোকান। অকস্মাৎ তার কানে এল হাতুড়ি ঠোকার শব্দ। একটি শব্দের সাথে আরেকটি শব্দের কোন ঐক্য খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি দোকানে সব কটি হাতুড়ি ওজন করে দেখলেন–তাদের ওজন হল ৬, ৮, ৯, ৭, এই সংখ্যাগুলোর সম্পর্ক নির্ণয় করলেন (২x৩) অর্থাৎ ৬ (২x৪)= ৮ (৩x৩)= ৯। এই তিনটি হাতুড়ির আওয়াজের মধ্যে মিল খুঁজে পেলেন কিন্তু চতুর্থ হাতুড়িটির ওজন ছিল সামঞ্জস্যহীন, তাই তার আওয়াজও ছিল বেসুরো।
সংগীত ও ঔষধের মধ্যে একটি পারস্পরিক সম্পর্ক খুঁজে বার করেছিলেন পিথাগোরীয়ানরা। তাদের মতে মানুষের দেহও বাদ্যন্ত্রের মত নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। সংগীতের উচ্চ স্বর নিম্ন স্বরের মতই দেহ কখনো শীতন কখনো উত্তপ্ত হয়। নির্দিষ্ট সুরে যখন বাদ্যযন্ত্র বাধা থাকে তখনই তার তেকে সংগীতের উদ্ভব হয়। মানব দেহ যদি যন্ত্রের তারের মত চড়া পর্দায় বাঁধা হয় কিম্বা টান শিথিল হয়ে পড়ে তখন শরীরে নানান রোগের উদ্ভব হয়। বিপরীত বস্তুর প্রকৃত সংমিশ্রণের ফলে যে সুর ও ঐক্যের ভাব সৃষ্টি হয় তাই সত্যিকারের স্বাস্থ্য। সাস্থ্য বিষয়ে তাঁর বহু বক্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
পিথাগোরাসই প্রথম বলেছিলেন পৃথিবীর আকার গোল। আমাদের চারপাশের গ্রহ নক্ষত্র এই পৃথিবী আবর্তিত হচ্ছে। কোপার্নিকাস তাঁর রচনায় অপকটে পিথাগোরাসের কাছে ঋণ স্বীকার করেছেন।
প্রাচীন ভারতীয় ঋষিদের মত পিথাগোরাস জন্মান্তরবাদে বিশ্বাস করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন আত্মা অমরতার লয় নেই। মৃত্যুর পর আত্মা নতুন দেহে জন্ম নেয়। একদিন পিথাগোরাস দেখলেন একটি লোক কুকুরটিকে মারছে। যন্ত্রণায় কুকুরটি চিৎকার করছে। কুকুরটির চিৎকারে বিচলিত হয়ে পড়লেন পিথাগোরাস। তাঁর মনে হল ঐ কণ্ঠস্বর তার মৃত বন্ধুর। মৃত্যুর পর সে কুকুর হয়ে জন্মগ্রহণ করেছে।
গণিতে তাঁর অবদানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হেরোক্লিটাস স্বীকার করেছেন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অন্য সকলকে তিনি অতিক্রম করে গিয়েছেন। ধর্ম ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নির্ণয়ের প্রসঙ্গে তিনি বলতেন, বিজ্ঞানের মধ্যেই আছে সর্বশ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধতা এবং যে মানুষ এই বিশুদ্ধতাতেই নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ দার্শনিক।
অ্যারিস্টটল তার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, “পিথাগোরাসই প্রথম পাটিগণিতকে বাণিজ্যিক প্রয়োজনের সীমারেখার গণ্ডি অতিক্রম করে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছিলেন। তিনি ত্রিভুজের ব্যবহার জানতেন এবং ৩, ৪, ৫ সংখ্যার সাহায্যে সমকোণী ত্রিভুজ অঙ্কন করতে জানতেন। পরবর্তীকালে এটি পিথাগোরীয় ত্রিভুজ নামে পরিচিত হয়।
