হার্ভের আবিষ্কার ইউরোপের সর্বত্র স্বীকৃত হয়েছে। ১৬৫৪ সালে রয়্যাল কলেজ তাঁকে সভাপতির পদে বসিয়ে সম্মান দেন। কিন্তু তিনি তার গ্রহণ করেন নি। কারণ বয়স বেশি ও শারীরিক অসুস্থতা। ১৬৫৭ সালে তিনি সম্পূর্ণভাবে বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এবং কথা বলার ক্ষমতাও ছিল না। হার্ভে নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রী মারা যান। স্ত্রী মারা যাবার পর তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি রয়্যাল কলেজকে দান করে দেন। যাতে চিকিৎসকরা গবেষণা করে নতুন নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে পারে। ১৮৮৩ সালে কলেজের ফেলোরা হার্ভের যাবতীয় স্মৃতি সরিয়ে সংরক্ষণ করেন হেম্পস্টেড গির্জার মার্বেল পাথরে তৈরী হার্ভে স্মৃতিকক্ষে। উইলিয়াম হার্ভের আবিষ্কার চিকিৎসা জগতে এক অমর কীর্তি। ১৬৫৭ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তি এক ভাইপোকে দিতে না দিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
৭৩. পিথাগোরাস (৫৮০–৫০০)
গণিতশাস্ত্রের ইতিহাসে যিনি আদিপুরুষ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে আছেন তার নাম পিথাগোরাস। তিনি ছিলেন একাধারে গণিতজ্ঞ চিন্তাবিদ দার্শনিক। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমে ইজিয়ান সাগরের সামস দ্বীপে পিথাগোরাসের জন্ম। এই সামস ছিল গ্রীসের ক্ৰোতনা দ্বীপের অন্তর্ভুক্ত। ছেলেবেলা থেকেই বিদ্যা অনুরাগের প্রতি প্রবল আকর্ষণ ছিল পিথাগোরাসের। তিনি বিশ্বাস করতেন কোন একজন গুরুর কাছে জ্ঞান সম্পূর্ণ হয় না। জ্ঞানের ভাণ্ডার ছড়িয়ে আছে পৃথিবীব্যাপী। তাই সামস শহরে তাঁর শিক্ষা শেষ করে বার হলেন দেশভ্রমণে। সেই সময় গ্রীস দেশের বাণিজ্যতরীগুলো বিভিন্ন দেশে বাণিজ্য করতে যেত। এমনি একটি জাহাজে করে তিনি রওনা হলেন মিশরে। প্রাচীন গ্রীসের মত প্রাচীন মিশরও ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রভূমি। এখানে প্রধানত গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের শিক্ষালাভ করেন।
মিশরে অবস্থানের সময় পিরমিড দর্শন করে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যান। বিশাল পিরামিড নির্মাণের সময় যে গাণিতিক নিয়ম অনুসারে পাথরগুলোকে সাজান হয়েছিল তা থেকেই সম্ভবত তার মনে প্রথম জ্যামিতির সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা জেগে ওঠে। যদিও জ্যামিতির জনক ইউক্লিড, (আনুমানিক ৩২০-২৭৫ খ্রিস্টপূর্ব)। তিনিই প্রথম জ্যামিতির জন্য সুসংহতভাবে নির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।কিন্তু তার অন্তত দুশো বছর আগে পিথাগোরাস জ্যামিতি বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। এরই পরণতি তাঁর বিখ্যাত উপপাদ্যটি সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজের উপর অঙ্কিত বর্গ ওই ত্রিভুজের অপর দুই বাহুর উপর বর্গের যোগফলের সমান।
এই বিষয়ে ভিন্ন মত প্রচলিত আছে। পিথাগোরাস দেশভ্রমণ করতে করতে ভারতবর্ষে এসে উপস্থিত হন। প্রাচীন মিশরের মত প্রাচীন ভারতবর্ষও ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্রভূমি। পিথাগোরাসের আবির্ভাবের অন্তত একশ বছর ভারতীয় পণ্ডিত বৌধয়ন জ্যামিতি সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন। সম্ভবত তার কোন সূত্র থেকে পিথাগোরাস এই উপপাদ্যটি রচনা করেন। কোন সূত্র থেকে তিনি এই রচনাট করেছিলেন তা জানা না গেলেও এটি যে তার মৌলিক রচনা এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
প্রকৃতপক্ষে পিথাগোরাসই জ্যামিতির চর্চা শুরু করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর বিরাট কিছু দান না থাকলেও তিনি যে পথের সূচনা করেছিলেন নেই পথ ধরেই পরবর্তীকালে অন্যরা জ্যামিতিকে প্রসারিত করেছেন। পিথাগোরাস বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে ফিরে আসেন সামোসে। সেই সময় সামোসের রাজা ছিলেন পলিক্রেটিস। পরিক্রেটিস ছিলেন যেমনই স্বেচ্ছাচারী তেমনি অত্যাচারী। পিথাগোরাস ক্রোনায় গিয়ে বসবাস আরম্ভ করলেন। ইতিমধ্যেই জ্ঞানী পণ্ডিত হিসাবে পিথাগোরাসের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছাত্ররা শিক্ষালাভের জন্য ক্রোনায় এসে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে আরম্ভ করল। মূলত ধর্ম, দর্শন এবং বিজ্ঞান এই তিনটি বিষয়ে তিনি শিক্ষা দিতেন। তাঁর শিষ্যদের বলা হত পিথাগোরীয়ান। শিষ্যত্ব গ্রহণের আগে সকলকে কিছু অঙ্গীকার করতে হত। পিথাগোরাস নির্দেশিত কিছু নিয়ম সকলকে মেনে চলতে হত। এই নিয়মগুলো পিথাগোরাস নিজেও মেনে চলতেন। খাদ্যের ব্যাপারে তারা পশুমাংস, ডিম বর্জন করেছিলেন। তাঁরা মনে করতেন একই পৃথিবীর সন্তান হিসাবে মানুষ ও পশুর মধ্যে নিকট সম্পর্ক বিদ্যমান। তাই পশুর মাংস খাওয়া অন্যায়। তবে দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীয় মাংস খেতেন।
সকলকেই সমস্ত দিনের কাজকর্ম সম্বন্ধে রাত্রিবেলায় পর্যালোচনা করতে হত। নিজেদের দোষত্রুটি বিচার করে তা সংশোধন করবার জন্য সকলকে প্রয়াসী হতে হত।
পিথাগোরাসের শিষ্যরা তাকে দেবতা বলেই সম্মান করত। এবং স্বয়ং এ্যাপোলো বলেই মনে করত। তিনি ছিলেন জ্ঞানের সাধক। তার জীবনযাত্রা ছিল সহজ সরল অনাড়ম্বর। নিজে সর্বদা সাদা পোশাক প্রতেন। দেশের মানুষ তাঁকে দেবতার আসনে বসালেও তিনি সর্বদাই নিজেকে বলতেন জ্ঞান-ভিক্ষুক। তাঁর শিক্ষা ছিল অর্থের মধ্যে জীবনের প্রকৃত সুখ নেই। জ্ঞানলাভের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করবার মধ্যেই প্রকৃত সুখ।
পিথাগোরাসের শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে গেলে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হত। তারপর সে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার লাভ করত। পাঁচ বছর যথাযথভাবে শিক্ষালাভ করবার পর তারা অঙ্কশাস্ত্র শিক্ষার অধিকার পেত। জ্যামিতি, অঙ্কশাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, সঙ্গীত, দর্শন শিক্ষা দেওয়া হত। সকলেই তাদের শিক্ষা ও গবেষণার বিষয় গোপন রাখবার অঙ্গীকার করত।
