লরেন্সের মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী হল সমস্ত সম্পত্তির মালিক। একা তার পক্ষে এতবড় সম্পত্তি দেখাশুনা করা সম্ভব ছিল না বলে জর্জের উপর দেখাশুনার ভার পড়ল।
কয়েক বছর পরেই মারা গেল লরেন্সের স্ত্রী। তার কোন সন্তান-সন্ততি ছিল না। তাই বিশাল সম্পত্তির অধিকারী হলেন ওয়াশিংটন।
যে সব জমিতে চাষবাস হত না, তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন সেই সব জমিতে কিভাবে চাষ-আবাদ করা সম্ভব। শুধু তাই নয়, উৎপাদনের পরিমাণ কি করে বাড়ান যায় তার জন্যে চাষবাসের উপর বই পড়তেন, ইংল্যাণ্ডের কৃষি বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নতুন নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। এর সাথে তিনি চিন্তা-ভাবনা শুরু করলেন পশুপালন ব্যবসার কিভাবে শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো যায়। তার এই প্রচেষ্টায় আশাতীত সাফল্য দেখা গেল।
ভেরন উপত্যাকার বন্ধুর অঞ্চলে গড়ে উঠল এক আদর্শ খামার। মোট প্রায় আট হাজার একর জমি ছিল, তার মধ্যে সাড়ে তিন হাজার একর জমিকে কৃষির অন্তর্ভুক্ত করতে পারলেন। এখানে প্রায় দুশো জন চাকর কাজ করত। তারা শুধু চাষ করত না, তারা নানা ধরনের মদ তৈরি করত, শস্য পেষাই করত। অন্য আরেক দল লোক ছিল যারা পশুপালন করত, মেষ চরাত, তার লোম থেকে উল তৈরি করে বাজারে বিক্রি করত। এতবড় জমিদারির সব কিছু নিজেই তত্ত্ববধান করতেন ওয়াশিংটন।
ছেলেবেলায় তার মনে হত বড় সৈনিক হবেন। সেই সময় ভার্জিনিয়ার সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেবার জন্য যুবকদের আহ্বান করা হচ্ছিল।
ওয়াশিংটন ভার্জিনিয়ার গভর্নরকে লিখলেন, আমি সৈনিক হিসাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাই, আপনি আমার যোগ্যতার পরীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন।
গভর্নর ওয়াশিংটনকে বিশেষ কাজের জন্য ডেকে পাঠালেন।
ভার্জিনিয়ার ওহিও নদীর তীরবর্তী বিরাট অঞ্চল ছিল ফরাসীদের অধিকারে। গভর্নর আদেশ দিলেন ফরাসীদের অবিলম্বে এই অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে।
গভর্নর ওয়াশিংটনকে আদেশ দিলেন সৈন্যবাহিনী নিয়ে ফরাসীদের ঐ অঞ্চল থেকে হটিয়ে দিতে। ওয়াশিংটনকে লেফটেনান্ট কর্নেল পদে নিযুক্ত করা হল। ছশো সৈনিকের এক বাহিনী নিয়ে বিতর্কিত এলাকার দিকে রওনা হলেন ওয়াশিংটন। ফরাসীরা একটি দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিল। সুকৌশলে দুর্গ অধিকার করে ফরাসীদের বিতাড়ন করলেন ওয়াশিংটন। যুদ্ধে মারা গেলেন ফরাসী সেনাপতি।
প্রথম যুদ্ধে জয়লাভের পর তাকে আর একটি অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হল। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ইংরেজ সেনাপতি ব্রাডক। ওয়াশিংটনকে তাঁর অধীনের দায়িত্বভার দেওয়া হল।
রেড ইন্ডিয়ান এবং ফরাসী বাহিনী সম্মিলিতভাবে ইংরেজদের আক্রমণ করল। জেনারেল ব্রাডক ইউরোপিয়ান পদ্ধতিতে যুদ্ধ পরিচালনা করতে থাকেন। কিন্তু ওয়াশিংটন তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও বাস্তববাচিত দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে উপলব্ধি করলেন এইভাবে যুদ্ধ করলে জয় অসম্ভব। যুদ্ধে অসম সাহসিকতা প্রদর্শন করেও মৃত্যুবরণ করতে হল ব্রাডককে। বিরাট সংখ্যক ইংরেজ সৈন্য মারা পড়ল। আশ্চর্যজনকভাবে রক্ষা পেলেন ওয়াশিংটন। স্বপক্ষের সৈন্যদের এই বিপর্যয় দেখে সুকৌশলে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে এলেন ওয়াশিংটন। কিছু ঐতিহাসিকের ধারণা ওয়াশিংটনের ধারণা ওয়াশিংটনের কৃতিত্বের জন্য নয়, যুদ্ধক্লান্ত ফরাসী সৈনিকরা ইংরেজ সৈন্যদের অনুসরণ করতে চায়নি। সেই সুযোগে তারা রক্ষা পেয়েছিল। যে কারণেই হোক, এই যুদ্ধের ফলে ওয়াশিংটনের অসাধারণ শৌর্য, বীরত্ব, সাহস, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ল।
১৭৫৫ সালে ভার্জিনিয়ার গভর্নর ব্রাডকের শূন্য পদে ওয়াশিংটনকে নিযুক্ত করলেন। সমগ্র ভার্জিনিয়ার সৈন্যবাহিনীর প্রদান হলেন ওয়াশিংটন।
সেনাপতি হিসাবে তিনি অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও রণকুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। সেই জন্যে তাঁকে বলা হত ধূর্ত শেয়াল। শত্রুরা কখনো তার পরিকল্পনা সম্বন্ধে সামান্যতম আঁচ করতে পারত না। কখন কিভাবে আক্রমণ করবেন সে সম্বন্ধেও শত্রুদের নানাভাবে বিভ্রান্ত করতেন। শত্রুদের বিপথে চালিত করবার জন্য মাঝে মাঝেই তিনি ভুল তথ্য এমনভাবে পাঠাতেন, সহজেই তা শত্রুদের হাতে গিয়ে পড়ত এবং সেই সংবাদ বিশ্বাস করে বহুবার ব্রিটিশ বাহিনী পরাজিত হয়েছে।
ভার্জিনিয়ার সেনাপতি হিসাবে তিনি মাত্র তিন বছর ছিলেন। তারপর স্বাস্থ্যের কারণে পদত্যাগ করে ফিরে এলেন নিজের জমিদারি মাউন্ট ভার্ননে। এই সময় পরিচয় হল মার্থা ড্রানড্রিজের সাথে। ড্রানড্রিজ ছিলেন বিধবা, বিরাট জমিদারির মালিক। মার্থা আকৃষ্ট হলেন ওয়াশিংটনের ব্যক্তিত্বে বিয়ে হল দুজনের। এই বিবাহিত জীবনে দুজনেই সুখী হয়েছিলেন। এর পরের সতেরো বছর তিনি জামিদারির কাজকর্ম নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন। ১৭৭৪ সালে ফিলাডেলফিয়া শহরে তেরোটি মার্কিন উপনিবেশের প্রতিনিধিদের প্রথম সম্মেলন বসল। জর্জ ওয়াশিংটন ছিলেন ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে ধনী ও সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁকে ভার্জিনিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে নির্বাচিত করা হল। এই অধিবেশনেই সমস্ত সদস্যদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়ে উঠল ইংল্যন্ডের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।
পরের বছর দ্বিতীয় অধিবেশন বসল। এই অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে ওয়াশিংটনকে সমগ্র উপনিবেশের সেনাপ্রধান হিসাবে নিযুক্ত করা হল। ওয়াশিংটন স্ত্রীকে লিখলেন, “আমার ভাগ্য আমাকে এই পদ দিয়েছে।”
