অবশেষে ৭ জুন ১৭৭৬ তেরোটি প্রদেশের প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে আমেরিকার। স্বাধীনতা ঘোষণা করল। পাঁচজনের এক পরিচালনা গোষ্ঠী তৈরি হল। এর প্রধান হলেন টমাস জেফারেসন।
৪ জুলাই (4 July) ১৭৭৬ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রচার করা হল। এতে স্বাধীনতা ঐক্যের কথা প্রচারিত হল।
দেশের বিভিন্ন প্রদেশে শুরু হয়ে গেল ব্রিটিশ বাহিনীর সাথে আমেরিকানদের যুদ্ধ। নানান প্রতিকূলতার মধ্যে ওয়াশিংটনকে তার সৈন্যবহিনী সংগঠিত করতে হয়েছিল। তার সৈন্যদের মধ্যে খুব কমই ছিল নিয়মিত সৈন্য। তাদের যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও ছিল না। উন্নত মানের অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না।
ওয়াশিংটন জানতেন তার সেনাদলের সামর্থ্য নিতান্তই কম। তারা অবর্ণনীয় দুঃখ কষ্টের মধ্যে যুদ্ধ করে চলেছে। তাই পদমর্যাদার কথা ভুলে গিয়ে তাদের সাথে একাত্ম হয়ে গেলেন। ওয়াশিংটনের সৈনিকরা তাঁকে বলত “দরকারী মানুষ”। অথচ নিজের জীবনকে তিনি কখনো দরকারী বলে মনে করতেন না। একদিন অন্য সব সামরিক অফিসারদের সাথে খেতে বসেছেন, এমন সময় একটি রেড ইন্ডিয়ান ঘরে ঢুকে পড়ল। টেবিলের উপর রাখা মাংসের পুরো রোস্টটা তুলে নিয়ে খেতে আরম্ভ করল। তখন খাবারের ভীষণ অভাব। সকলে রেড ইন্ডিয়ানকে শাস্তি দেবার জন্য উঠে দাঁড়িতেই ওয়াশিংটন বাধা দিলেন। তিনি বললেন, ওকে ছেড়ে দাও, দেখে মনে হচ্ছে অনেকদিন ওর কিছু খাওয়া হয়নি।
তাঁর দলের সৈনিকদের সুযোগ-সুবিধার দিকে তাঁর ছিল তীক্ষ্ণ নজর। একদিন কোন একটি ক্যাম্পে একজন সৈনিক ঠাণ্ডা লেগে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সমস্ত রাত ধরে কাশছিল। শেষ রাতে হঠাৎ দেখতে পেল কেউ তার তাবুতে ঢুকছে। কাছে আসতেই চমকে উঠল, স্বয়ং ওয়াশিংটন তার কষ্ট দেখে চা নিয়ে এসেছেন।
প্রথম দিকে ইংরেজ বাহিনী সাফল্যলাভ করলেও শেষ পর্যন্ত তারা পিছু হটতে বাধ্য হল। দীর্ঘ পাঁচ বছর মরণপণ সংগ্রামের পর অবশেষে ইংরেজ সেনাপতি কর্ণওয়ালিশ ১৭৮১ সালে আত্মসমর্পণ করলেন। যুদ্ধে জয়ী হল আমেরিকানরা। এই যুদ্ধ জয়ের পেছনে ওয়শিংটনের ভূমিকার ছিল সবেচেয়ে বেশি। তাঁর ইচ্ছাশক্তি, সৈনিকদের প্রতি ভালবাসা এবং শৃঙ্খলাবোধ এই যুদ্ধে তাঁকে বিজয়ী নায়কের গৌরব দিয়েছিল।
আমেরিকায় স্বাধীনতা যুদ্ধের নায়ক হয়েও তার কোন উচ্চাশা ছিল না। তিনি নিজের কর্তব্য শেষ করে প্রধান সেনাপতির পদ ত্যাগ করলেন। ফিরে এলেন নিজের জমিদারিতে। কিন্তু আমেরিকার মানুষ চাইছিল তাঁর অসামান্য কর্মকুশলতাকে কাজে লাগাতে। ১৭৮৭ সালে দেশের সংবিধান তৈরি করার জন্য সমস্ত প্রদেশের প্রতিনিধিরা সম্মিলিত হলেন। ওয়াশিংটনও সেখানে যোগ দিলেন নতুন সংবিধানের রূপরেখা বর্ণনা করে সদস্যরা ঐক্যবদ্ধভাবে জর্জ ওয়াশিংটনকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করলেন। তিনি হলেন আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতি পদের দায়িত্বভার গ্রহণ করে প্রথমেই তিনি দেশ ও সমস্ত জাতিকে শান্তিপূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ হবার আহ্বান জানালেন।
তিনি জানতেন দেশের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মত ও বিরোধী পক্ষ। সকলে সাহায্য ছাড়া এই শিশু রাষ্ট্রকে কখনোই গড়ে তোলা সম্ভবপর নয়। তাই তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় দুটি বিরোধী পক্ষকে একত্রিত করবার চেষ্টা করলেন। আলেকজাণ্ডার হ্যাঁমিলটন ছিলেন রক্ষণশীল দলের প্রধান এবং ধনতন্ত্রের জোরালো সমর্থক। তাঁকে দেশের রাজস্ব বিভাগের ভার দেওয়া হল এবং টমাস জেফারসন ছিলেন গণতন্ত্রের সমর্থক, তাকে স্বরাষ্ট্র বিভাগের দায়িত্ব দিলেন।
ওয়াশিংটন জানতেন দেশের সামনে এখন সমস্যা। একমাত্র যোগ্যতম ব্যক্তিরাই এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। তাই সমস্ত দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জেফারসন ও হ্যাঁমিলটনকে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বভার অর্পণ করেছিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত ছিল সঠিক। হ্যাঁমিলটন ছিলেন সুদক্ষ সেনাপতি, দার্শনিক, আইনজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ। তিনি নানান কর বসিয়ে ইউনিয়ন সরকারের আয় বৃদ্ধির দিকে নজর দিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যে ঋণ হয়েছিল। সেই ঋণভার রাজ্য সরকারের হাত থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দিলেন। জাতীয় ব্যাঙ্ক স্থাপন করা হল।
অভ্যন্তরীণ উন্নতির সাথে সাথে বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলবার দিকে নজর দিলেন ওয়াশিংটন। এমনকি ব্রিটেনের সাথেও তিনি চেষ্টা করতে লাগলেন নতুন কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে।
১৭৯৩ সালে যখন ফরাসী বিপ্লব শুরু হল, তিনি বিপ্লবীদের সমর্থন করলেও নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করলেন। এর ফলে আমেরিকা প্রতিটি বিবদমান দেশেই বাণিজ্য করবার সুযোগ পেল।
দেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে অসাধারণ যোগ্যতা প্রদর্শনের জন্য ১৭৯২ সালে তাঁকে দ্বিতীয়বারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করা হল।
দ্বিতীয় বারে নির্বাচন কাল শেষ হল। তাঁকে সকলেই অনুরোধ জানালে তৃতীয় বারের জন্য নির্বাচিত হতে। তিনি সবিনয়ে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বললেন, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমি কর্মক্ষম স্বাস্থ্যবান রয়েছি…শুধুমাত্র সেই কারণেই আমি এই পদ চাইনা এটা শুধু অযৌক্তিক নয়, অপরাধ হবে যদি আমি পদ আঁকড়ে থাকি। হয়ত অপর কেউ আমার চেয়েও আরো ভালভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারবে।”
