কিন্তু সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন তিনি নির্দোষ, তাই রায় ঘোষিত হবার পর তিনি উত্তর দিলেন, হে এথেন্সের অধিবাসীগণ, আমার পক্ষ থেকে কি পালটা দণ্ড প্রস্তাব করব? আমার যা ন্যায়ত প্রাপ্য তাই নয় কি? আমি তোমাদের প্রত্যেকের কাছে ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছি, সে শুধু তোমাদের কল্যাণের জন্য। আমি আমার ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছি, সে শুধু তোমাদের কল্যাণের জন্য। আমি আমার ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা চিন্তা করার আগে চিন্তা করেছি এথেন্সের স্বার্থ। এইভাবে আমি তোমাদের উপকার করতে চেয়েছি। উপকারীকে সরকারী ব্যায়ে ভরণ-পোষণের ভার গ্রহণ করা হোক এই আমার শেষ ইচ্ছা। সক্রেটিসের এই বক্তব্যে জুরীরা আরো ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। তাঁদের ধারণা ইল সক্রেটিস তাদের ব্যঙ্গ করছেন। আরো অনেকে তার বিরুদ্ধে চলে গেল এবং বিচারে তার মৃত্যুদণ্ড করা হল।
সেই ভয়ঙ্কর রায় শুনে এতটুকু বিচলিত হলেন না সক্রেটিস। স্থির শান্তভাবে বললেন, এখন সময় হয়েছে আমাদের সকলকে চলে যাবার, তবে আমি যাব মৃত্যুর দিকে, তোমরা যাবে জীবনের দিকে। জীবন কিম্বা মৃত্য–একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারেন। এর মাঝে শ্রেষ্ঠ কে? সক্রেটিসের বন্ধুদের মধ্যে ক্ৰিটো ছিলেন সবচেয়ে ধনী। তিনি কারারক্ষীদের ঘুষ দিয়ে সক্রেটিসকে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দিলেন। কিন্তু সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন দেশের প্রত্যেক নাগরিকেরই দেশের আইন শৃংখলা মেনে চলা কর্তব্য। বিচারালয়ের আদেশ উপেক্ষা করে অন্য দেশে পালিয়ে যাওয়ার অর্থ আইনের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করা। তাছাড়া এতে সকলের মনে এই ধারণা হবে যে সক্রেটিস সত্যি সত্যিই অপরাধী। তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে বিচারকরা ঠিক কাজই করেছেন।
মৃত্যুর দিন সকাল শিষ্যরা একে একে উপস্থিত হলেন কারাগারে।
তিনি গোসল করে ফিরে এলেন। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। মুহূর্তে মৃত্যুদূতের মত দ্বারে এসে দাঁড়াল জেলের কর্মচারী। গভীর বেদনায় কাঁদতে কাঁদতে ঘোষণা করল সক্রেটিসের বিষপানের সময় হয়েছে। ক্রিটো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রাজকর্মচারীর দিকে ইঙ্গিত করতেই জল্লাদ কক্ষে প্রবেশ করল, হাতে তার বিষের পাত্র। সক্রেটিস হাসিমুখে সেই পাত্র নিজের হাতে তুলে নিলেন। অকম্পিতভাবে শেষবারের মত ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করলেন তারপরই সমস্ত বিষ পান করলেন।
তারপর জল্লাদের নির্দেশে ঘরে মধ্যে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে বিষ তার সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। পা দুটো ভারী হয়ে এল। চলৎশক্তিহীন হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কাপড়ে মুখ ঢেকে দিলেন। কয়েক মুহূর্ত সব শান্ত। মৃত্যুর সব শান্ত। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সক্রেটিস যাত্রা করলেন অমৃতলোকে। তার মৃত্যুর পরেই এথেন্সের মানুষ ক্ষোভে দুঃখে ফেটে পড়ল। চারদিকে ধিক্কার ধ্বনি উঠল।
বিচারকদের দল সর্বত্র একঘরে হয়ে পড়ল। অনেকে অনুশোচনায় আত্মহত্যা করলেন। অভিযোগকারীদের মধ্যে মেনেতুসকে পিটিয়ে মারা হল, অন্যদেশ থেকে বিতাড়িত করা হল। দেশের লোকেরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে বিরাট মূর্তি প্রতিষ্ঠা করল। প্রকৃতপক্ষে সকেটিসই পৃথিবীর প্রথম দার্শনিক, চিন্তাবিদ যাকে তার চিন্তা দর্শনের জন্য মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে তাঁর নশ্বর দেহের শেষ হলেও চিন্তার শেষ হয়নি। তাঁর শিষ্য প্লেটো, প্লেটোর শিষ্য অ্যারিস্টটলের মধ্যে দিয়ে সেই চিন্তার এক নতুন জগৎ সৃষ্টি হল যা মানুষকে উত্তেজিত করেছে আজকের পৃথিবীতে।
৭১. জর্জ ওয়াশিংটন (১৭৩২-১৭৯৯)
জর্জ ওয়াশিংটনের জন্য আমেরিকায় ভার্জিনিয়াতে। জন্ম তারিখ ২২.২.১৭৩২। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ইংল্যণ্ডের নর্দম্পটনসায়ারের অধিবাসী। জর্জের বাবা নিজের চেষ্টায় বেশ কিছু বিরাট বিরাট খামার গড়ে তুলেছিলেন।
জর্জের বাবা প্রথম স্ত্রী মারা যাবার পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। প্রথম স্ত্রীর একটি মাত্র ছেলে ছিল। দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রথম সন্তান জর্জ। ছেলেবেলায় বাড়িতেই পড়াশুনা করতেন জর্জ।
আর বাকি সময়ে খামার ঘুরে ঘুরে চাষবাস দেখাশুনা করতেন। যখন তাঁর এগারো বছর বয়স, অপ্রত্যাশিতভাবেই বাবা মারা গেলেন।
জর্জের বৈমাত্রেয় ভাই লরেন্স শ্বশুরবাড়িতে থাকত। লরেন্সের শ্বশুর লর্ড ফেয়ারফ্যাক্স ছিলেন ভার্জিনিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। লরেন্স জর্জকে নিয়ে এলেন নিজের কাছে। তিনিই জর্জের শিক্ষার বন্দোবস্ত করলেন। পাঁচ বছর ফেয়ারফ্যাক্স (FairFax} পরিবারেই রয়ে গেলেন জর্জ।
এই সময় সেনানডোয়া নামে এক উপত্যাকায় ষাট লক্ষ একর জমি কিনলেন লর্ড ফেয়ারফ্যাক্স। এই জমির মাপ করবার জন্য একদল সার্ভেয়ারকে সেখানে পাঠানো হল। জর্জ ওয়াশিংটনকে একজন সহকারী সার্ভেয়ার হিসাবে কাজে নিলেন ফেয়ারফ্যাক্স।
প্রতিকূলতা অসুবিধা সত্ত্বেও নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করলেন ওয়াশিংটন। যথাসময়ে কাজ শেষ হল। জর্জের কাজে খুশি হয়ে ফেয়ারফ্যাক্স তাঁকে প্রধান সার্ভেয়ারের পদে নিযুক্ত করলেন। তখন ওয়াশিংটনের বয়স মাত্র ১৭। দু’বছর প্রধান সার্ভেয়ার হিসাবে কাজ করলেন।
এই সময় ভাই লরেন্স ব্যবসায়ের কাজে ওয়েস্ট ইণ্ডিজের বার্বাডোজে গেলেন। ভার্জিনিয়ার ফেরবার পর অসুস্থ হয়ে পড়ল লরেন্স। সমস্ত চেষ্টা ব্যর্থ করে মারা গেল লরেন্স।
