স্থানীয় স্কুলে পড়া শেষ হলে ভগবানচন্দ্ৰ জগদীশকে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু ইংরেজীতে আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় তিন মাস পর জগদীশচন্দ্র ভর্তি হলেন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। ভগবানচন্দ্র তখন বর্ধমানের অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হল জগদীশচন্দ্রের। সেই সময় জগদীশচন্দ্রের বয়স এগারো।
ছাত্র হিসাবে জগদীশচন্দ্র ছিলেন যেমন মেধাবী, পড়াশুনায় ছিল তেমনি গভীর অনুরাগ। ষোল বছর বয়েসে জগদীশচন্দ্র প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পরীক্ষায় পাশ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হলেন।
১৮৭৭ সালে বয়েসে তিনি এফ. এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করলেন। তিন বছর পর দ্বিতীয় বিভাগেই বিজ্ঞান বিভাগে বি-এ পাশ করলেন। ১৮৮০ সালে জগদীশচন্দ্র বিলাতের পথে যাত্রা করলেন।
লন্ডনে গিয়ে ডাক্তারি পড়বার জন্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেন। কিন্তু মৃতদেহ কাটাকুটির সময় প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। শেষে ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে তিনি কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। অবশেষে ১৮৮৪ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি-এস-সি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এলেন ভারতবর্ষে।
ভারতে ফিরে আসার আগে ইংল্যান্ডের পোস্ট মাস্টার জেনারেল ভারতের বড়লাট লর্ড রিপনের কাছে জগদীশচন্দ্র বসুর সম্বন্ধে চিঠি লিখে দিলেন।
লর্ড রিপন তখন ছিলেন সিমলায়। তিনি বাংলার গভর্নকে চিঠি লিখে দিলেন যাতে জগদীশচন্দ্রকে শিক্ষা বিভাগে কোন ভাল পদ দেওয়া যায়। সেই সময় সাহেবদের ধারণা ছিল ভারতীয়রা বিজ্ঞান শিক্ষায় অনুপযুক্ত। সেই কারণে চাকরিতে নিয়োগের ব্যাপারে নানা অজুহাত সৃষ্টি করা হল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লর্ড রিপনের আদেশে তাকে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করা হল। এই পদে ইংরেজ অধ্যাপকরা যে বেতন পেত, জগদীশচন্দ্রকে তার দুই-তৃতীয়াংশ বেতন স্থির হল। আবার অস্থায়ী বলে ঐ বেতনের অর্ধেক হাতে দেওয়া হত।
এই ব্যবস্থায় জগদীশচন্দ্রের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করবার জন্য তিনি প্রথমে প্রতিবাদ জানালেন। বাঙালী তরুণ অধ্যাপকের এই প্রতিবাদে কেউ কোন কর্ণপাত করল না। শেষে তিনি স্থির করলেন কোন বেতন নেবেন না। বেতন না নিলেও তিনি নিয়মিত ক্লাস নিতে আরম্ভ করলেন।
১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র অবলা দাসকে বিয়ে করলেন। অবলা দাস ছিলেন বিদূষী উচ্চশিক্ষিতা। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে কয়েক বছর ডাক্তারি পড়েছিলেন। যখন দুজনের বিয়ে হল তখন জগদীশ বসু কোন মাইনে নেন না। সংসারে অভাব অনটন।
অধ্যাপনার এক বছরের মধ্যেই জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণাপত্র ইংলন্ডের রয়েল সোসাইটিতে পাঠালেন। অল্পদিনের মধ্যেই তার প্রকাশিত হল। রয়েল সোসাইটির তরফ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বৃত্তি দেওয়া হল। এছাড়া লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে D. Sc. উপাধি দিল।
ইতিমধ্যে তিন বছর তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কলেজে অধ্যাপনা করে গেলেন। তাঁর এই অসহযোগ আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হল কলেজ কর্তৃপক্ষ। জগদীশচন্দ্রকে শুধু যে ইংরেজ অধ্যাপকের সমান বেতন দিতে স্বীকৃতি হল তার তিন বছরের সমস্ত প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে দেওয়া হল। এই অর্থে পিতার সমস্ত দেনা শোধ করলেন জগদীশচন্দ্র।
গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই জগদীশচন্দ্র ইলেকট্রিক রেডিয়েশন বিষয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ছিল, “বিদ্যুৎ-উৎপাদক ইথার তরঙ্গের কম্পনের দিকে পরিবর্তন” এই প্রবন্ধটি তিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে পেশ করেছিলেন। এর পরের প্রবন্ধগুলো ইংল্যান্ডের “ইলেকট্রিসিয়ান” পত্রিকায় প্রকাশ করেন।
এই সময় জগদীশচন্দ্র বিনা তারে বৈদুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কিভাবে পাঠানো যায় সেই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন, আমেরিকায় বিজ্ঞানী লজ, ইতালিতে মার্কনী। জগদীশচন্দ্র ছিলেন এ বিষয়ে অগ্রণী।
১৮৯৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম এই বিষয় পরীক্ষা করেন। কলকাতার টাউন হলে সর্বসমক্ষে এই পরীক্ষা করেন।
এর পরে তিনি বিনা তারে তার উদ্ভাসিত যন্ত্রের সাহায্যে নিজের বাসা থেকে এক মাইল দূরে কলেজে সঙ্কেত আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করলেন। এই কাজ অসমাপ্ত রেখেই তিনি পশ্চিমে যাত্রা করলেন।
১৮৯৬ সালে তিনি এক বছরের ছুটির জন্য দরখাস্ত করলেন। প্রথমে সম্মত না হলেও শেষ পর্যন্ত গভর্নর তাঁকে গবেষণার জন্য ইংল্যন্ডে যাবার অনুমতি দিলেন।
Wireless telgraphy সম্বন্ধে তার আবিষ্কার ইংল্যান্ডে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে জগদীশচন্দ্র লিখেছেন, “একটি বিখ্যাত ইলেকট্রিক কোম্পানি আমার পরামর্শ মত কাজ করে Wireless telgraphy বিষয়ে প্রভূত উন্নতি করিয়াছেন আমি আর একটি নূতন পেপার লিখিয়াছি তাহাতে Practical Wireless telgraphy-র অনেক সুবিধা হইবে।”
অর্থনৈতিক কারণে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা ব্যাহত হয়েছিল। ইতিমধ্যে ১৮৯৬ সালে মার্কনী Wireless telgraphy-র প্রথম পেটেন্ট নিলেন।
ব্রিটেনে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত হয়ে উঠলেন।
