লন্ডনে থাকার সময় জগদীশ অনুভব করলেন বিলাতে বিজ্ঞানীরা কত আধুনিক গবেষণাগারের সুযোগ পাচ্ছে। তার অনুরোধে লর্ড কেলভিন ও অন্য বিজ্ঞানীরা ভারত সচিবের কাছে গবেষণার সুযোগ প্রদান করবার জন্য অনুরোধ জানালেন।
ভারতবর্ষে এসে তিনি এই বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করলেন, মূলত তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯১৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি গড়ে উঠল।
১৮৯৭ সালে জগদীশচন্দ্র দীর্ঘ প্রবাস জীবন যাপন করার পর ভারতবর্ষে ফিরে এলেন।
ভারতবর্ষে ফিরে এসে আবার অধ্যাপনার কাজ শুরু করলেন সেই সাথে গবেষণা। এই সময়েই তাঁর উদ্ভিদ বিষয়ক যুগান্তকারী গবেষণা আরম্ভ করেন।
১৯০০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পদার্থবিদ্যা বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য ডাক এল জগদীশচন্দ্রের। জুলাই মাসে জগদীশচন্দ্র প্যারিসে পৌঁছবেন। এখানে তার বক্তৃতার বিষয় ছিল “জীব ও জড়ের উপর বৈদ্যুতিক সাড়ার একতৃতা।”
ফ্রান্স থেকে জগদীশচন্দ্র গেলেন ইংলন্ডে। সেখানে জীব ও জড়ের সম্পর্ক বিষয়ে ব্রিটিশ এ্যাসোসিয়েশনের ব্রাডফোর্ড সভায় বক্তৃতা দিলেন।
১৯০২ সালে জগদীশচন্দ্র ভারতে ফিরে এসে রচনা করলেন তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে “জীব ও জড়ের সাড়া” (১৯০২) (Responses in the living and non living) ১৯০৬ সাল প্রকাশিত হল তাঁর আর একটি গ্রন্থ “উদ্ভিদের সাড়া” (Plant Responses 1906)।
এই দুটি গ্রন্থের মধ্যে তিনি প্রমাণ করলেন উদ্ভিদ বা প্রাণীকে কোনভাবে উত্তেজিত করলে তা থেকে একই রকম সাড়া পাওয়া যায়।
এই সময় ইউরোপ থেকে ডাক এল। তিনি প্রথমে গেলেন ইংল্যান্ড, সেখান থেকে আমেরিকা। বিশেষত আমেরিকার বিজ্ঞানীরা তার আবিষ্কার সম্বন্ধে ছিল যথেষ্ট কৌতূহলী তাছাড়া ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী মহলও ধীরে ধীরে গবেষণার সত্যতাকে স্বীকার করে নিচ্ছিলেন।
দেশে ফিরে এসে তার তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণা শুরু করলেন, “উদ্ভিদ ও প্রাণীদের দেহকলার মধ্যে তুলনামূলক গবেষণা”। এই সময় তিনি উদ্ভাবন করলেন তাঁর বিখ্যাত যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ। এই যন্ত্রের সাহায্যে কোন বস্তুর অতি সূক্ষ্মতম সঞ্চালনকেও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেখানো সম্ভবপর।
ইতিমধ্যে দেশে বিদেশে তার একাধিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯১৪ সালে তিনি চতুর্থবারের জন্য ইংল্যান্ড গেলেন। এইবার যাত্রার সময় তিনি সাথে করে শুধু যে তাঁর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে গেলেন তাই নয়, তাঁর সঙ্গে ছিল লজ্জবতী ও বনাড়াল গাছ। এই গাছগুলো সহজেই সাড়া দেয়।
তিনি অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, এছাড়া রয়েল সোসাইটিতেও তাঁর উদ্ভাসিত যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করলেন, জীবদেহের মত বৃক্ষেরও প্রাণ আছে, তারাও আঘাতে উত্তেজনায় অনুরণিত হয়।
১৯১৩ সালে জগদীশচন্দ্র চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করবার সময় ছিল, কিন্তু তার চাকরির মেয়াদ আরো দু’বছর বাড়ানো হল। ১৯১৫ সালে সুদীর্ঘ ৩১ বছর অধ্যাপনা করবার পর চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেন।
চাকরি জীবন শেষ হলেও তাঁর গবেষণার কাজ বন্ধ হল না। তিনি ইংল্যন্ডে থাকার সময় লন্ডনের রয়াল ইনস্টিটউটের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল ভারতবর্ষে যদি এই ধরনের একটি গবেষণার কাজে আগ্রহী হয়ে উঠবে। তিনি তাঁর পরিচিত জনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তাঁর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন।
এবার এই কাজে এগিয়ে এলেন দেশের বহু মানুষ। কাশিমবাজারের মহারাজা মণীচন্দ্রচন্দ্র নন্দী দুই লক্ষ টাকা দিলেন। এছাড়া বম্বের দুই ব্যবসায়ী মিঃ এস আর বোমানজী দিলেন এক লক্ষ টাকা। মিঃ মূলরাজ খাতা সোয়া লক্ষ টাকা দিলেন। তাছাড়া জগদীশচন্দ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে অর্থ সঞ্চয় করলেন, এইভাবে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা সংগৃহিত হল। জগদীশ নিজের সমস্ত জীবনেরর উপার্জন পাঁচ লক্ষ টাকা দিলেন।
সরকারের তরক্ষেকে বার্ষিক অনুদান হিসাবে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হল। এবং জমি অধিগ্রহণ করার ব্যাপারে সাহায্য করা হল। অবশেষে ১৯১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর জগদীশচন্দ্রের ৫৯তম জন্মদিনে প্রতিষ্ঠা হল বিজ্ঞান মন্দির।
জগদীশচন্দ্রের স্বপ্নের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র বিশ্বের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার।
১৯২৮ সালে জগদীশচন্দ্র জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে যোগ দেবার জন্য জেনেভা গেলেন। জেনেভাতে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন জগদীশচন্দ্র। তাঁর গবেষণা দেখে আইনস্টাইন মুগ্ধ বিস্ময়ে বলেছিলেন, জগদীশচন্দ্র পৃথিবীকে যে সব অমূল্য উপহার দিয়েছেন তার যে কোন একটির জন্যই বিজয় স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।
পরিণত বয়সে তিনি বেরিয়ে পড়েন পদ্মার উৎস সন্ধানে। তার এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন অপূর্ব ভাষায় ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে বিজ্ঞানী আর সাহিত্যিক জগদীশ একাকার হয়ে গিয়েছেন। বাংলা গ্রন্থ আর লেখা হয়নি।
বয়স বাড়বার সাথে সাথে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়তেন জগদীশচন্দ্র।
গবেষণার কাজ ছেড়ে দিলেও বসু বিজ্ঞান মন্দিরের কাজ নিয়মিত দেখাশুনা করতেন। মাঝে মাঝে দার্জিলিং যেতেন। জীবনের শেষ চার বছর কয়েক মাসের জন্য গিরিডিতে চলে যেতেন। ১৯৩৭ সালে তিনি তখন গিরিডিতে ছিলেন, বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কলকাতায় আসবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন,২৩শে নভেম্বর সকালের গোসলের সময় অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন, অল্পক্ষণের মধ্যেই তার হৃদয়স্পন্দন চিরদিনের মত স্তব্ধ হয়ে গেল।
