পরবর্তী কালে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে যিনি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সেই মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানী গ্যালন (১৩০-১৯৯ খ্রিঃ) এই হিউমোরালা মতবাদকে গ্রহণ করেছিলেন এবং এ চিকিৎসা ক্ষেত্রে এই মতবাদই সর্বজনগ্রাহ্য হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে এই মতবাদ, হিউমোর মানব দেহকে নিয়ন্ত্রিত করে, বাতিল বলে গণ্য হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে দেহকোষের তরল পদার্থ, রক্ত, বিভিন্ন গ্রন্থি নির্গত রস মানব শরীরকে সুস্থ রাখবার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে।
বর্তমান কালে মানবদেহে কোন কারণে তাপ বৃদ্ধি পেলে তাকে অসুস্থ বলে বিবেচনা করা হয় এবং সেইভাবে চিকিৎসা করা হয়। হিপোক্রেটসই প্রথম মানবদেহের তাপের হাস-বৃদ্ধিকে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হিসাবে গ্রহণ করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে হিপোক্রিটাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান হল বিভিন্ন ধরনের ঘা, ফোঁড়া, কাটা, পচনের কারণ ও প্রতিকার নির্ণয়। এই বিষয় নিয়ে তিনি গভীরভাবে অনুশীলন করেছিলেন। তিনি দেখেছিলেন অপরিচ্ছন্নতা ও দূষিত দ্রব্য ব্যবহারই এই সব রোগের বৃদ্ধি ঘটায়। তাই তিনি পরিষ্কার পানি, ব্যান্ডেজ, ঔষধ। ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।
মৃগীরোগ সম্বন্ধে শুধু সেই যুগে নয়, বর্তমান কালেও বহু মানুষের ধারণা, কোন অপদেবতা কিম্বা শয়তান যখন মানুষের উপর ভর করে তখন মৃগীরোগ হয়। কিন্তু সেই যুগে হিপোক্রেপটস তার অন দি স্যাক্লেড ডিসিস গ্রন্থে লিখেছেন আর দশটি ব্যাধির মতই মৃগী একটি ব্যাধি এবং সুনির্দিষ্ট কারণেই এই ব্যাধির সৃষ্টি হয়। সেই যুগের প্রচলিত সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে হিপোক্রেটস তার শিষ্যদের কাছে নিজের জ্ঞানকে উজাড় করে দিতেন যাতে তারা চিকিৎসার আলোকে ছড়িয়ে দিতে পারে বৃহত্তর মানব সমাজের কাছে। মহান দার্শনিক প্লেটোর সাথে হিপোক্রেটসের পরিচয় ছিল। তিনি হিপোক্রেটসকে বলছেন চিকিৎসাবিদ্যার এক মহান গুরু আদর্শ শিক্ষক।
হিপোক্রেটস তাঁর জীবনব্যাপী গবেষণা, পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতার আলোয় যে জ্ঞান লাভ করেছিলেন, তাকে তিনি বিভিন্ন রচনায় লিপিবদ্ধ করে গিয়েছিলেন। এই সব রচনার সংগ্রহ ছিল প্রায় সাতাশিটি খণ্ডে। এক একটি খণ্ডে এক একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার একটি সংগ্রহশালা থেকে এই সব রচনার কিছু কিছু অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
এই সব রচনা থেকে জানা যায় হিপোক্রেটস শুধু রোগ বা রোগীদের সম্বন্ধেই আলোচনা করেননি, তিনি চিকিৎসকদের প্রতিও বহু নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন এবং এই নির্দেশগুলো সর্বকালেই প্রযোজ্য। যেমন তিনি বলেছেন যে চিকিৎসক রোগীর প্রাসঙ্গিক সর্ব বিষয়ে খোঁজ না নিয়ে শুধুমাত্র রোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তিনি কখনোই মহৎ চিকিৎসক হতে পারেন না। তিনি বলতেন জীবন ছোট কিন্তু বিধ্যা বিরাট। সকল বিদ্যার মধ্যে চিকিৎসাবিদ্যাই শ্রেষ্ঠ। শুধু মাত্র কিছু অজ্ঞ চিকিৎসকের জন্যেই এই বিদ্যা অন্য সব বিদ্যার পেছনে পড়ে রয়েছে।
এই মহান চিকিৎসাবিজ্ঞানী সমস্ত অজ্ঞতা আর কুসংস্কারের অন্ধকারকে দূর করে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যুক্তিনিষ্ঠ তত্ত্ব আর তথ্যের। তাই তিনি শুধু সে যুগে নন, সর্ব যুগে চিকিৎসকদের মধ্যে অগ্রগণ্য।
যাতে চিকিৎসকরা তাদের সুমহান আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হন সেই কারণে তিনি তার ছাত্রদের বিদ্যা শিক্ষা শেষ হলে শপথ করাতেন। একে বলা হল “হিপোক্রেটিস শপথ”। প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সব দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্ররা আজও এই শপথ নিয়ে থাকেন। আমি আমার জীবন ও এই পেশাকে পবিত্র, সুন্দর, নির্মল করে রাখব।’
হিপোক্রেটিসের নামাঙ্কিত এই শপথবাক্য আজও সর্বদেশে চিকিৎসাশাস্ত্রে শিক্ষানবীশ হওয়ার পূর্বে উচ্চারণ করিতে হয়। এই থেকেই হিপোক্রেটিস ও তাঁর অনুগামী চিকিৎসকদের সেবার আদর্শ ও সুমহানত্ব-র পরিচয় পাওয়া যায়।
যিনি আমাকে এই ব্যাখ্যাদান করছেন তাকে আমার নিজ পিতামাতা জ্ঞান করব। তার সন্তান-সন্ততিরা এই বিদ্যালাভে অভিলাষী হলে বিনাব্যয়ে শিক্ষাদান করব। আমি যে পথ্যাপথ্যের নির্দেশ দেব তা আমার যোগ্যতা ও বিচারবুদ্ধি অনুসারে রোগীর উপকারার্থে নির্ধারিত হবে। আমার কাছে চাইলেই কোনও ব্যক্তিকে কোন মারাত্মক ও ক্ষতিকারক ওষুধের পরামর্শ দেব না। রোগীর এবং তাদের পরিবারের সকল তথ্য সাধারণের কাছে গোপন রাখব। আমার জীবন ও শাস্ত্রকে আমি বিশুদ্ধ এবং পবিত্র রাখব। এই শপথ যথাযথ পালন করে সকল লোকের প্রশংসার পাত্র হয়ে আমি যেন আমার জীবন ও শাস্ত্র সমভাবে উপভোগ করতে পারি। শপথভ্রষ্ট হলে আমার ভাগ্যে যেন বিপরীত ঘটে।
যুগে যুগে এই আদর্শ চিকিৎসককে ন্যায়-সত্য ও সেবার পথে অবিচলিত রেখেছে
৬৬. জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮–১৯৩৭)
বিজ্ঞান তাপস আচার্য জগদীশচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বাড়ীখাল গ্রামে। তাঁর বাবা ভগবানচন্দ্র ছিলেন ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। জগদীশচন্দ্র যে বাড়িতে থাকতেন, বাড়ির পাশ দিয়ে পদ্মার একটি শাখা নদী বেয়ে গিয়েছিল। জগদীশচন্দ্র এই নদীর ধারে বসে থাকতে খুবই ভালবাসতেন। সমস্ত জীবনই তাঁর নদীর প্রতি আকর্ষণ ছিল। তাই পরবর্তীকাল তিনি গঙ্গার উৎস সন্ধানে যাত্রা করেছিলেন।
