সেই যুগে এথেন্স ছিল শিক্ষা-সংস্কৃতির পীঠস্থান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হত লাইসিয়াম–এর অর্থ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। এক একটি লাইসিয়াম এক এক জন প্রখ্যাত শিক্ষকের অধীনে গড়ে উঠত। প্রত্যেকে নিজের অধিগত বিদ্যা ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিক্ষকরা জ্ঞানের সামান্য অংশই ছাত্রদের দিতেন। নিজের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের বেশির ভাগ অংশই প্রকাশ করতেন না। হিপোক্রেস চিকিৎসকের পুত্র হলেও নিজের গভীর জ্ঞান, বাস্তব যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, যে যুগের চিকিৎসা ব্যবস্থার ভ্রান্তি আর দোষত্রুটি। তার অবৈজ্ঞানিক দিকগুলো তার চোখে প্রকট হয়ে উঠেছিল।
তিনি ঠিক করলেন বিভিন্ন চিকিৎসকদের কাছ থেকে তাঁদের জ্ঞানকে অর্জন করতে হবে। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। কারণ বেশির ভাগ চিকিৎসকই ছিলেন অহংকারী দাম্ভিক। হিপোক্রেটস তাঁদের অনুগত শিষ্য হয়ে নানান স্তুতি প্রশংসায় তাদের মন জয় করে নিতেন। তারপর নিজের অসাধারণ প্রতিভায় অল্পদিনের মধ্যেই গুরুর সব জ্ঞান আয়ত্ত করে নিতেন।
তাছাড়া এথেন্সে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জ্ঞানী-গুণী মানুষেরা আসতেন। তাদের কাছ থেকে নানাভাবে শিক্ষা অর্জন করতেন। এই ভাবে সেই যুগের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্বন্ধে পরিপূর্ণ একটি ধারণা গড়ে তুললেন এবং এর মধ্যেকার ভ্রান্তি, ভুল-ত্রুটি, মিথ্যাচার, প্রতারণা কোন কিছুই তার অজানা রইল না। তিনি স্থির করলেন এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাকে দূর করে প্রকৃত চিকিৎসা ব্যবস্থার সূচনা করবেন।
তিনি তার চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠিত করলেন। শুরু হল রুগীর চিকিৎসা। এতদিনকার প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থা থেকে এ সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তখন শুধুমাত্র রোগীর রোগের উপসর্গ দেখে চিকিৎসকরা বিধান দিত। অন্য কিছু জিজ্ঞাসা বা বিচার করবার প্রয়োজন মনে করত না। কিন্তু হিপোক্রেটস বললেন, একজন প্রকৃত চিকিৎসকের উচিত রোগ নয়, রুগীর চিকিৎসা করা। একটি উপসর্গ বা রোগ লক্ষণের উপর নির্ভর করে রোগ নির্ণয় করা উচিত নয়। একজন চিকিৎসকের রোগীর যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন যেমন রোগীর প্রতিদিনকার জীবনযাত্রা, তাঁর পিতা-মাতা বা অন্যদের রোগের ইতিহাস, তার কাজকর্ম, কোন পরিবেশে সে বাস করে। এই সব তথ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই রোগীর সঠিক চিকিৎসা প্রণালী নির্ধারণ করতে হবে।
অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসাবে তার খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দূর দূরান্ত থেকে রোগীর দল এসে ভিড় করে তাঁর কাছে। তাঁর মত একজন তরুণ চিকিৎসকের জনপ্রিয়তা, সেই সাথে তাঁর নতুন নতুন মতবাদের কথা শুনে এথেন্সের প্রবীণ চিকিৎসকের দল তাঁর প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল। হিপোক্রেটস শুধু যে চিকিৎসকের পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন তাই নয় চিকিৎসাবিদ্যার নামে ভণ্ডামি শঠতার বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন। তিনি পুরোহিত সম্প্রদায়ের সব ফাঁকিকে প্রকাশ করতে আরম্ভ করলেন। এতদিনকার প্রভাব-প্রতিপত্তি বিনষ্ট হয়ে যেতে দেখে পুরোহিত আর চিকিৎসকের দল হিপোক্রেটসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করল। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার শুরু হল। হিপোক্রেটস উপলব্ধি করতে পারলেন তার পক্ষে এথেন্সে থাকা নিরাপদ নয়। তিনি এথেন্স ত্যাগ করে অনত্র চলে গেলেন।
কয়েক বছরের মধ্যেই নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি গড়ে তুললেন হিপোক্রেটস। এর ভিত্তি ছিল যুক্তি আর প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং বস্তুনিষ্ঠ চিন্তা-ভাবনা।
সেই যুগে শবব্যবচ্ছেদ নিষিদ্ধ ছিল। মনে করা হত এ কাজ ধর্মবিরুদ্ধ। সেই কারণে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থান, তাদের প্রকৃতি সম্বন্ধে কারোরই বিশেষ কোন জ্ঞান ছিল না—তাছাড়া প্যাথলজি শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে মানুষের বাস্তব কোন ধারণা ছিল না। এ সব অসুবিধা সত্ত্বেও মানবদেহ সম্বন্ধে বহু ক্ষেত্রে হিপোক্রেটস নির্ভুল ধারণা করে চিকিৎসার বিধান দিয়েছেন। যেমন তাঁর লেখা হাড় ভাঙা এবং হাড় সরে যাওয়ার উপর একটি বই থেকে জানা যায় তিনি তখন আধুনিক কালের চিকিৎসা ব্যবস্থার মতই ভাঙা হাড় জোড়ার জন্য সেই জায়গায় এক টুকরো কাঠ দিয়ে তার উপরে ব্যান্ডেস বাধবার নির্দেশ দিয়েছেন। পেশী সংক্রান্ত বিভিন্ন অসুখের ক্ষেত্রেও তিনি নির্ভুল চিকিৎসার বিধান দিয়েছেন।
সেই যুগে গ্রীসদেশে শরীরচর্চাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিম্বা বিকলাঙ্গ শিশু জন্মগ্রহণ করলে তাকে হত্যা করবার বিধান দেওয়া হত। মনে করা হত সুস্থ সবল নাগরিকদেরই বেঁচে থাকবার অধিকার আছে। খেলাধূলা ব্যায়ামচর্চার জন্য গ্রীসের সর্বত্র অসংখ্য ব্যায়ামাগার গড়ে উঠেছিল। এই সব কেন্দ্রে মাঝে মাঝেই দুর্ঘটনা ঘটত। এখানে নিয়মিত যেতেন হিপোক্রেটস। খেলোয়াড়দের পেশী অস্থি সংক্রান্ত যে সব অসুবিধা দেখা দিত তা থেকে জ্ঞান লাভ করে তিনি চিকিৎসার বিধান দিতেন। প্রকৃতপক্ষে আধুনিক শল্য চিকিৎসার সূচনা তিনি করেছিলেন।
সমকালীন চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি জেহাদ ঘোষণা করে তিনি হিউমোরাল বা মানবদেহ নির্গত বিভিন্ন ধরনের রস সংক্রান্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রবর্তন করেন। তিনি মনে করতেন মানুষের দেহ তার মানসিকতা, আচার-ব্যবহার, তার অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর প্রধান কারণ এই দেহ নিঃসৃত রস বা হিউমোর। এই রস কখনো বা শীতল, কখনো কখনো উষ্ণ, কখনো বা শুষ্ক হতে পারে। এই রসের পরিবর্তনের অর্থ দেহের স্বাভাবিকতার পরিবর্তন।
