প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছেন কবি। পরিণতির সাথে সাথে রচনায় ফুটে ওঠে পরিবর্তনের ছোওয়া। লিখলেন রক্তকরবী, চণ্ডলিকা। রাশিয়ায় গিয়ে ভাল লেগেছিল কবির সেখানকার মানুষ কর্মপ্রচেষ্টা। নতুন দেশ গড়ার উদ্যত কবিকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি লিখলেন রাশিয়ার চিঠি’।
বৃদ্ধ বয়সে এসে কবি ডুবে থাকেন গান আর ছবি আঁকায়। আবার তারই ফাঁকে ফাঁকে লিখলেন শ্যামলী, প্রান্তিক, সেঁজুতি, আকাশ প্রদীপ, ছড়ার উৎসব, নৃত্যনাট্য শ্যামা।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দেবার জন্য কবির ডাক এল। তিনিই প্রথম বেসরকারী ব্যক্তি যিনি এই সম্মান পেলেন। চিরাচরিত প্রথা ভেঙে কবি। বাংলায় বক্তৃতা দিলেন।
১৯০৪ সালের ৭ই আগস্ট অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে শান্তিনিকেতনে কবিকে ডক্টর উপাধি দেওয়া হল। ইংরেজরা দেরিতে হলেও শেষ পর্যন্ত সম্মান জানাল কবিকে।
কবির স্বাস্থ্য ভেঙে পড়েছে। দেহ আগের মত সচল নয়। তবুও তারই মধ্যে লিখলেন তাঁর বিখ্যাত গল্প ল্যাবরেটরি, বদনাম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বলে যান অন্যে লিখে নেয়। এই সময়ে লেখা কবিতাগুলো সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হল ‘রোগশয্যায়’।
কবি শান্তিনিকেতনে ছিলেন। চিকিৎসার জন্য কলকাতার নিয়ে আসা হল। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে কবির অপারেশন করা হল। তার কিছুক্ষণ আগে লিখেছেন জীবনের শেষ কবিতা।
তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছে আকীর্ণ করে
বিচিত্র ছলনা জালে হে ছলনাময়ী।
……………………….
……………………….
শেষ পুরষ্কার নিয়ে যায় সে যে আপন ভাণ্ডারে
অনায়াসে যে পেরেছে ছলনা সহিতে
সে পায় তোমার হাতে শান্তি অক্ষয়
অধিকার
অপারেশনের পর কবি জ্ঞান হারালেন। সে জ্ঞান আর ফিরল না। রাখী পূর্ণিমার দিন দুপুর বেলায় ১৩৪৮ সালের ২২ শ্রাবণ (১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট) একটি মহাজীবনের পরিসমপ্তি ঘটল।
৬৫. হিপোক্রেটস (৪৬০-৩৭০)
মানব সভ্যতার ইতিহাসে গ্রীকদের দান অতুলনীয়। দর্শন, সাহিত্য, বিজ্ঞান সর্বক্ষেত্রেই পৃথিবীর মানুষ তাদের কাছে ঋণী। দর্শনে সক্রেটিস, প্লেটো, এ্যারিস্টটল মানুষের চিন্তা মনীষাকে সমৃদ্ধ করেছেন। এ্যাসকাইলাস, সোফাক্লিস, ইউরিপিদেস বিশ্বের নাট্য সাহিত্য ভাণ্ডারকে পূর্ণ করেছেন তাদের অবিস্মরণীয় সব নাটকে। বিজ্ঞানের জগৎকে আলোকিত করেছেন হিপোক্রেটস, ইউক্লিড, আর্কিমিডিস, পিথাগোরাস। মানুষের মনের অন্ধকারের বুকে এঁরা জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন।
এই সব মহান মানুষের মধ্যে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিপোক্রেটস। তাঁকে বলা হয় চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক। যে সময় তাঁর জন্ম সেই সময় চিকিৎসা বিজ্ঞান ছিল। কুহেলিকায় ঢাকা। শুধুই কুসংস্কার আর বিচিত্র সব তন্ত্রমন্ত্রের মধ্যেই চিকিৎসকদের জ্ঞান। সীমাবদ্ধ ছিল।
প্রাচীন গ্রীসদেশে চিকিৎসার দেবতা ছিলেন অ্যাপেলো। তার হাতে থাকত দণ্ড। একে বলা হত হার্মিসের দণ্ড। এই দণ্ড চিকিৎসাবিদ্যার প্রতীক। গ্রীসের বিভিন্ন স্থানে এই অ্যাপেলোর মন্দির ছিল। লোকে অসুস্থ হলে এই মন্দিরে গিয়ে পূজা দিত, শূকর ভেড়া। উৎসর্গ করত। মন্দিরের পুরোহিতরাই প্রধানত ছিল চিকিৎসক। তারা খুশিমত চিকিৎসার নানান বিধান দিত। লোকে ভাবত দেবতার ক্রোধে মানুষ অসুস্থ হয়। পুরোহিতরা দেবতার প্রতিনিধি, তারা ইচ্ছা করলে সেই রোগ সুস্থ করে তুলতে পারে। এইভাবে এক শ্রেণীর পুরোহিত সম্প্রদায় গড়ে উঠল, চিকিৎসাই হল তাদের প্রধান পেশা। কালক্রমে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চিকিৎসার সম্বন্ধে তারা কিছু জ্ঞান অর্জন করল। যে যেটুকু জ্ঞান অর্জন করত তাকে অ্যাপেলো প্রদত্ত মনে করে গোপন করে রাখত। তখন চিকিৎসাবিদ্যাকে বলা হত গুপ্ত বিদ্যা। এই বিদ্যা শুধুমাত্র পিতা তার সন্তানকে দিত।
হিপোক্রেটস ছিলেন এমনি এক চিকিৎসকের পুত্র। তিনি যে সময়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন প্রায় একই সময়ে গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন সক্রেটিস, এসকাইলাস, কিছু পরে সোফোক্লিস প্লেটোর মত মহান দার্শনিক নাট্যকাররা। তাদের মুক্ত স্বাধীন চিন্তা হয়ত হিপোক্রেটসকে প্রভাবিত করেছিল।
হিপোক্রেটসের জন্য অ্যাপিয়ান সাগরের “কস” দ্বীপে। তাঁর জীবন সম্বন্ধে বিশেষ কোন তথ্য উদ্ধার যায় না। সামান্য যেটুকু তথ্য পরবর্তীকালে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তার ভিত্তিতে জানা যায় হিপোক্রেটসের বাবা ছিলেন কসের অ্যাপোলো মন্দিরের প্রধান পুরোহিত। সেই সূত্রে সমাজে ছিল যেমন প্রভাব তেমনি প্রতিপত্তি। সুখ-স্বচ্ছন্দ্যের মধ্যেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন তিনি।
শিক্ষার সূত্রপাত হয় তার পিতার কাছে। পিতার কাছ থেকে যাবতীয় গুপ্তবিদ্যা তিনি অর্জন করেছিলেন। ছেলেবলা থেকেই হিপোক্রেটস ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। সেই সময় একমাত্র এথেন্সে চিকিৎসাশাস্ত্র সংক্রান্ত কিছু পড়াশুনা হত। হিপোক্রেটস পিতার কাছ থেকে সব কিছু শিক্ষা লাভ করবার পর এথেন্সে গেলেন চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়াশুনা করতে। সেখানে তার শিক্ষক ছিলেন ডিমোক্রিটাস। তিনি ছিলেন সে যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তি। বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন তিনটি বিষয়েই ডিমোক্রিটাসের ছিল অসাধারণ পাণ্ডিত্য। এছাড়াও এথেন্সের আরো কয়েকজন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতের কাছে হিপোক্রেটস শিক্ষা লাভ করেন।
