বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতাগুলো নিয়ে প্রকাশিত হল মানসী (১৮৯০)। এতে কবি প্রতিভার শুধু যে পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে তাই নয়, বাংলা কাব্য জগতেও এ এক নতুন সংযোজন।
বন্ধু শ্রীশচীন্দ্র প্রকাশ করলেন নতুন একটি পত্রিকা ‘হিতবাদী।’ রবীন্দ্রনাথ হলেন এর সাহিত্য বিভাগের সম্পাদক। সেই সময় জমিদারির কাজে নিয়মিত যেতে হল শিলাইহে। ঘুরে বেড়ান গ্রামে গ্রামে। সেখানকার মানুষের ছোট ছোট সুখ-দুঃখের আলোয় জন্ম দিতে থাকে একের পর এক ছোট গল্প–দেনা-পাওয়া, গিনি, পোস্টমাস্টার, ব্যবধান রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, প্রতিটি গল্পই প্রকাশিত হয় হিতবাদীতে। কিন্তু কয়েক মাস পরেই হিতবাদীর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল। তার ভ্রাতুস্পুত্রেরা একটি পত্রিকা বের করল, ‘সাধনা’। রবীন্দ্রনাথের গল্পের জোয়ার বইতে শুরু হল। প্রথম গল্প বার হল খখাকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, তারপর সম্পত্তি সমর্পণ, কঙ্কাল, জীবিত ও মৃত, স্বর্ণমৃগ, জয় পরাজয় দালিয়া। প্রতিটি গল্পই বিয়োগান্ত।
নিজের দেশ ও দেশবাসীর প্রতি ছিল তার গভীর শ্রদ্ধা। ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে লিখেছিলেন বেশ কিছু প্রবন্ধ, “ইংরেজ ও ভারতবাসী”, “ইংরেজের আতঙ্ক”, সুবিচরের অধিকার”, “রাজা ও প্রজা”।
১৩০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হল বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ প্রতিষ্ঠা থেকেই এর সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁরই উদ্যোগে বাংলাদেশের ছড়া সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। দক্ষিণারঞ্জন রচনা করলেন ঠাকুরমার ঝুলি।
পরের বছর প্রকাশিত হল চিত্রা আর চৈতালি। চিত্রায় কবি স্বপ্নলোক থেকে বাস্তব জীবনের পটভূমিতে নেমে এসেছেন। এতে সংকলিত হয়েছে কবির কিছু অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। এবার ফিরাও মোরে, পূর্ণিমা, স্বর্গ হতে বিদায় উর্বশী, ব্রাহ্মণ। এছাড়া তার দুটি জনপ্রিয় কবিতা পুরাতন ভৃত্য ও দুই বিঘা জমিতে অবহেলিত নির্যাতিত মানুষের প্রতি ফুটে উঠেছে গভীর সমবেদনা।
কবিতা আর গানের পাশাপাশি লিখতে থাকেন একের পর এক কাব্য নাটক। বহুদিন পূর্বে লিখেছিলেন প্রকৃতির পরিশোধ, চিত্রাঙ্গদা, বিদায়, অভিশাপ, মালিনী। এবার লিখলেন গান্ধারীর আবেদন, সতী, নরকবাস, লক্ষ্মীর পরীক্ষা।
কবিতা আর গানের জগতে থাকতে মন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। লিখলেন হাস্যরসাত্মক রচনা চিরকুমার সভা।
১৩০৮ (ইং ১৯০১) নতুন করে বঙ্গদর্শন প্রকাশিত হল। রবীন্দ্রনাথ হলেন তার সম্পাদক। প্রবন্ধ কবিতার সাথে প্রকাশিত হল নতুন উপন্যাস চোখের বালি।
শিলাইদহে বহুদিন ছিলেন সপরিবারে। এলেন শান্তিনিকেতনে। এখানে প্রতিষ্ঠা করলেন আবাসিক বিদ্যালয়। স্ত্রী মৃণালিনী দেবী অসুস্থ হয়ে পড়লেন, কলকাতায় নিয়ে। আসা হয়। অল্পদিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হল। তখন মৃণালিণী দেবীর বয়স ছিল ত্রিশ, রবীন্দ্রনাথের একচল্লিশ। তাঁদের তিন কন্যা মাধুরীলতা, রেণুকা, মীরা, দুই পুত্র রথীন্দ্রনাথ আর মনীন্দ্র।
মৃণালিনী দেবীর মৃত্যুর অল্পদিন পরই কন্যা রেণুকা অসুস্থ হয়ে পড়ল। কবির আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও বাঁচানো গেল না। তখন রেণুকার বয়স মাত্র তেরো।
কবির ভাবনা বিকশিত হয়ে ওঠে শান্তিনিকেতন আর শিলাইদহে। তারই সাথে গীতাঞ্জলির গান লেখা। প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের অনুরোধে কবি লিখতে আরম্ভ করলেন ‘গোরা’ উপন্যাস। প্রায় তিন বছর ধরে গোরা প্রকাশিত হল প্রবাসীতে। রবীন্দ্রনাথের এক শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। হিন্দু সমাজ জীবন, তার দশীয় সংকীর্ণতা, জাতিভেদের ঊর্ধ্বে রবীন্দ্রনাথ এক সত্যের ইঙ্গিত করেছেন।
শান্তিনিকেতনে বসে কবি লিখেছেন ‘ডাকঘর’।
বহুদিন দেশের বাইরে যাননি রবীন্দ্রনাথ। পুত্র-পুত্রবধূ প্রতিমাকে নিয়ে গেলেন বিলেতে।
বিলেতে এসে কবির সাথে পরিচয় হল ইংরেজ কবি ইয়েটস্-এর সাথে। ইয়েটস্ রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ। তিনি এর ভূমিকা লিখলেন।
ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হল গীতাঞ্জলি। ইংল্যাণ্ডের শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। কাগজে কাগজে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা।
কবি আমেরিকা হয়ে ফিরে এলেন কলকাতায়। সেখানকার পরিবেশ ভাল লাগে না। ফিরে এলেন শান্তিনিকেতনে। ১৫ই নভেম্বর ১৯১৩। সন্ধ্যাবেলায় সংবাদ এল কবি সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন। তিনিই প্রথম প্রাচীনবাসী যিনি এই পুরষ্কার পেলেন।
লিখলেন নতুন কবিতা ‘ছবি’। তারপর একের পর এক সৃষ্টি হতে থাকে বলাকার অবিস্মণীয় সব কবিতা। সবুজের অভিযান, শখ, শাজাহান, ঝড়ের খেয়া, বলাকা।
নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ‘সবুজ পত্র’। নতুন কোন পত্রিকা চালু হলেই তাকে ভরিয়ে তোলবার দায়িত্ব এসে রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের উপর।
সবুজ পত্রে একে পর এক প্রকাশিত হল ছোট গল্প। এদের মধ্যে বিখ্যাত হৈমন্তী, বোষ্টমী, স্ত্রীর পত্র।
১৩২২ সাল রবীন্দ্রনাথ সবুজপত্র লিখতে আরম্ভ করলেন, “ঘরে বাইরে”।
১৯১১-এর ১৩ই এপ্রিল ইংরেজ সৈন্যরা জালিয়ানওয়ালাবাগে ৩৭৯ জনকে নৃশংসভাবে হত্যা করল। তীব্র ঘৃণায় রবীন্দ্রনাথের সমস্ত অন্তর ভরে উঠল। তিনি বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা এক খোলা চিঠিতে সরকার প্রদত্ত নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করবার কথা ঘোষণা করলেন।
