আশি বছরে পা দিলেন তলস্তয়। সমস্ত দেশের মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানবতা আর রুশ সংস্কৃতির মূর্ত প্রতীক।
সমস্ত পৃথিবী তাঁকে সম্মান জানালেও সংসারে চরম অশান্তি। তলস্তয় তার সমস্ত রচানায় গ্রন্থস্বত্ব সমগ্র মানবজাতিকে দান করেছিলেন। তার স্ত্রী সোফিয়া এটি মেনে নিতে পারছিলেন না। তার অর্থের প্রতি লোভ ক্রমশই বেড়ে চলছিল। এক এক সময় বিবাদ তীব্র আকার ধারণ করত। ক্রমশই অসুস্থ হয়ে পড়লেন তলস্তয়। এই সময় তাকে সেবা-শুশ্রূষা করতেন তার ছোট মেয়ে আলেকজাণ্ডার। কিন্তু স্ত্রী নির্যাতন এমন অবস্থায় পৌঁছাল তিনি আর ঘরে থাকতে পারলেন না। বেরিয়ে পড়লেন অজানার উদ্দেশ্যে।
পথে আস্তাপগে নামে এক স্টেশনে এসে নেমে পড়লেন। তখন তার প্রচণ্ড জ্বর সেই সাথে কাশির সঙ্গে রক্ত উঠছে। স্টেশন সংলগ্ন একটি বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ১৯১০-এর ৭ নভেম্বর।
৬৪. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)
দ্বারকানাথের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্মণধর্মে দীক্ষিত। উপনিষদের সুমহান আদর্শে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর স্ত্রী সারদা দেবী ছিলেন পনেরোটি সন্তানের জননী। রবীন্দ্রনাথ তার চতুর্দশ সন্তান। তাঁর জন্ম হয় ঠাকুরবাড়িতে ২৫ বৈশাখ, ১২৬৮।
ঠাকুর বাড়ি ছিল সেই যুগে সাহিত্য, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, সংগীতের পীঠস্থান। দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ, মধ্যম সত্যেন্দ্রনাথ, পরবর্তী সন্তান হেমেন্দ্রনাথ, জ্যোতিন্দ্রনাথ, সকলেই ছিলেন প্রতিভাবনা। রবীন্দ্রনাথের জীবনে এই চার ভাইয়ের প্রভাব পড়েছিল খুব বেশি।
শিশু রবীন্দ্রনাথের জীবন কেটেছিল নিতান্তই সরল সাদাসিদেভাবে ঝি-চারকদের হেফাজতে।
একটু বড় হতেই প্রথমে ভর্তি হলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতে। অল্প কিছুদিন পর সেখান থেকে গেলেন নর্মাল স্কুলে। বাড়িতে ছেলেদের সর্ববিদ্যা পারদর্শী করবার জন্য বিচিত্র শিক্ষার আয়োজন করা হয়েছিল। ভোরবেলায় পালোয়ানের কাছে কুস্তি শেখা, তারপর গৃহশিক্ষকের কাছে বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস পড়া। তারপর স্কুল। ছুটির পর ইংরাজী পড়া, ছবি আঁকা, জিমনাস্টিক। রবিবার সকালে বিজ্ঞান পড়া। রুটির বাঁধা জীবনে শিশুমন হাঁপিয়ে ওঠে।
এগারো বছর বয়েসে প্রথম মুক্তির স্বাদ পেলেন রবীন্দ্রনাথ। পিতা দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গেলেন। ১৮৭৩ সাল। বোলপুর তখন নিতান্তই এক গ্রাম। সেই প্রথম প্রকৃতির সাথে পরিচয় হল। এখানেই বালক কবির কাব্য রচনায় সূত্রপাত্র। বোলপুর থেকে হিমালয়। চার মাস পশ্চিমের ভ্রমণ শেষ করে কলকাতায় ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ।
স্কুল ভাল লাগে না। বাড়িতেই শিক্ষক স্থির হল। পড়াশুনা আর কবিতা লেখা। তেরো বৎসর আট মাস বয়েসে অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রথম স্বনামে কবিতা ছাপা হল, “হিন্দুমেলার উপহার”।
১২৮৪ সালে দ্বিজেন্দ্রনাথের সম্পাদনায় ভারতী পত্রিকা বের হল। নিয়মিত লিখে চলেন রবীন্দ্রনাথ। ষোল বছর বয়েসে লিখলেন ভানুসিংহের পদাবলী।
ধীরে ধীরে কৈশোর উত্তীর্ণ হন রবীন্দ্রনাথ। অভিভাবকদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও স্কুলের গণ্ডি উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। স্থির হল বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার হবেন। মেজভাই সত্যেন্দ্রনাথের সাথে রওনা বিলাতের পথে। লণ্ডনে গিয়ে প্রথমে পাবলিক স্কুলে তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। কিন্তু পড়াশুনায় মন নেই, বেশির ভাগ সময় কাটে সাহিত্যচর্চা আর নাচ-গানে। দেড় বছর বিলেতে কাটালেন। যে উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন তার কিছুই হল না। দেবেন্দ্রনাথের নির্দেশে দেশে ফিরে এলেন। তখন তিনি উনিশ বছরের এক তরুণ যুবক।
কবির মন তখন নতুন কিছু সৃষ্টির জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। লিখলেন গীতিনাট্য “বাল্মীকি প্রতিভা”–কবি প্রতিভার প্রথম সার্থক প্রয়াস যা আজও সমান জনপ্রিয়।
তরুণ কবির হাতে ঝর্ণাধারার মত কবিতা রচিত হতে থাকে। প্রকাশিত হল ভগ্নহৃদয় ও রুদ্রচণ্ড। কবি প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ না ঘটলেও সেইসময় এই কাব্য দুটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও ভাবি কাদম্বরী দেবী তখন ছিলেন চন্দননগরে। কবি গেলেন তাঁদের কাছে, বাড়ি পাশেই গঙ্গা।
এখানে বসেই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন “বৌঠাকুরাণীর হাট” তাঁর প্রথম উপন্যাস, প্রতাপাদিত্যের জীবন অবলম্বনে এর কাহিনী গড়ে উঠেছে। বৌঠাকুরাণীর হাট ধারাবাহিকভাবে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় (১৮৮৩)।
চন্দননগর থেকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এসে বাসা বাঁধলেন সদর স্ট্রীটের বাসাবাড়িতে। এখানে কবির জীবনে ঘটল এক নতুন উপলব্ধি।
এই অপূর্ব অনুভূতির মধ্যে দিয়েই জন্ম হল কবির অন্তস্থিত কাব্যসত্তার। সেই দিনই কবি লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা বিঝরের স্বপ্নভঙ্গ।
১৮৮৩, ৯ই ডিসেম্বর, রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হল ঠাকুর বাড়িরই এক কর্মচারীর কন্যা। বারো বছর বয়স। বিয়ের আগে নাম ছিল ভবতারিণী। নতুন নাম হল মৃণালিনী।
ঠাকুরবাড়ি শুধু যে বাংলার সংস্কৃতির জগতের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিল তাই নয়, আর্থিক দিক থেকেও ছিল অন্যতম ধনী। পূর্ববঙ্গ উত্তরবঙ্গে ছিল বিস্তৃত জমিদারি। সব ভার এসে পড়ল রবীন্দ্রনাথের উপর। বাংলার গ্রামে-গঞ্জে নদীপথে ঘুরতে ঘুরতে রবীন্দ্রনাথ যে বিপুল অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন তা তার সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
