কিন্তু এই খ্যাতির মধ্যে তলস্তয়ের জীবনে নেমে আসে আঘাত আর বেদনা। পর পর তার কয়েকটি সন্তান মারা গেল। মারা গেলেন তার ফুফু। একের পর এক মৃত্যু ভুলতে তলস্তয় আশ্রয় নিলেন ধর্মের জগতে। খ্যাতি অর্থ যশ নাম সব কিছুই তার কাজে মূল্যহীন মনে হয়।
তলস্তয় গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন ধর্ম সংক্রান্ত কাজে-কর্মে। নিয়মিত গীর্জায় যেতেন। যাজকদের সাথে ধর্ম বিষয়ে আলোচনা করতেন। নিয়মিত বাইবেল পড়াতেন। যীশুর জীবনকে উপলব্ধি করাবার চেষ্টা করতেন।
খ্রিষ্টান ধর্মজগতের মানুষদের পাপ অনাচার দেখে ক্রমশই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন। সরাসরি চার্চ ও খ্রিস্টান ধর্মজগতের মানুষদের সমালোচনা করে বেশ কয়েকটি রচনা প্রকাশ করলেন। এতে সমস্ত ধর্মজগতের মানুষেরা তার উপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল।
স্ত্রীর অনুরোধে সপরিবারে মস্কোতে এসে বাসা বাঁধলেন তলস্তয়।
এরপর থেকে ক্রমশই এক চিন্তা তার মনের মধ্যে পাক খেতে থাকে, ধনসম্পদ সঞ্চয় করা যদি পাপ হয় তবে তিনি তো সেই পাপে পাপী। তিনি স্থির করলেন তার সমস্ত ধনসম্পদ বিলিয়ে দেবেন সাধারণ চাষীদের মধ্যে।
কিন্তু প্রবল বাধা এল সোফিয়ার কাছ থেকে। নিজের সন্তানদের কথা ভেবে এই উচ্চ আদর্শকে কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। শুরু হল বিবাদ-বিসংবাদ, পরবর্তী জীবনে এই বিবাদ ক্রমশই তীব্রতর হয়ে ওঠে।
সাংসারিক বিবাদ ক্রমশই চরমে ওঠে। তলস্তয় তার সব সম্পত্তি, বইয়ের স্বত্ব স্ত্রীকে উইল করে দিয়ে গ্রামে ফিরে এলেন। তিনি স্থির করলেন এতদিন যে আদর্শের কথা বলেছেন, সেই আদর্শকে নিজের জীবনে পালন করবেন।
এই সময় তলস্তয় মাছ-মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলেন। মদ স্পর্শ করতেন না, এমনকি ধূমপানও ছেড়ে দিলেন।
আবার নতুন করে সৃষ্টির কাজে হাত দিলেন তলস্তয়। এই পর্যায়ে তিনি লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কিছু ছোট গল্প। মানুষ কি নিয়ে বাঁচে, দুজন বৃদ্ধ মানুষ যেখানে ভালবাসা সেখানেই ঈশ্বর, বোকার ইভানের গল্প, তিনজন সন্ন্যাসী, মানুষের কতটা জমি প্রয়োজন, ধর্মপুত্র–এই গল্পগুলোর মধ্যে একদিকে রয়েছে নৈতিক শিক্ষা অন্যদিকে সৎ সরল জীবন পথের নির্দেশ। এক অসাধারণ সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে প্রতিটি গল্পে। পাঠকের হৃদয়ের অন্তঃস্থলকে তা স্পর্শ করে। পরবর্তীকারে এই গল্পগুলো সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয় ২৩টি গল্প (১৯০৬)।
১৮৮৯ সালে প্রকাশিত হল তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত উপন্যাস ক্রয়োজার সোনেটা। তখন তলস্তয়ের বয়স ৬১ বছর। এতে লিখলেন এক বৃদ্ধ কি প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় ঈর্ষাপ্রণোদিত দ্বিচারিণী স্ত্রীকে হত্যা করেছিল। এই রচনা প্রকাশের সাথে সাথে চারিদিকে বিতর্কের ঝড় বয়ে গেল। নিন্দা বিদ্রূপ আর কটুক্তিতে ছেয়ে গেল চারদিক-সমালোচনা করা হল এক বিকৃত যৌনতা ফুটে উঠেছে এর মধ্যে। লেখক সমস্ত সমাজ সংসারক ধ্বংস করবার কাজে নেমেছেন। নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল এই বই। কিন্তু তার আগেই হাজার হাজার কপি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সর্বত্র।
সোভিয়েত রাশিয়ায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। হাজার হাজার মানুষ অনাহারক্লিষ্ট দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাতে লাগল। দেশের সরকার এই ঘটনায় সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে রইলেন। কিন্তু তলস্তয় গভীরভাবে বিচলিত হয়ে পড়লেন। লণ্ডনের ডেলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের সরকার তার আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে বললেন, দেশের দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী বর্তমান প্রশাসন, তাঁর এই সমালোচনার ফলে রুশ দেশের প্রকৃত ছবি পৃথিবীর সামনে প্রকাশিত হয়ে পড়ল।
ক্ষোভে ফেটে পড়ল জারের মন্ত্রিসভার সদস্যরা। সকলে বুঝতে পারল রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে এই বার তলস্তয়কে বন্দী করা হবে।
কিন্তু জার গ্রেফতারের অনুমতি দিলেন না।
দুর্ভিক্ষের বিবাদ মিটতে না মিটতেই তলস্তয়ের জীবনে নেমে এল বিরাট এক আঘাত। তাঁর প্রিয় পুত্রের মৃত্যু হল। এই মৃত্যুতে সাময়িকভাবে ভেঙে পড়লেন তলস্তয়।
ইতিমধ্যে তার আরো কিছু রচনা প্রকাশিত হল। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসেও তাঁর সৃজনশক্তি এতটুকু হ্রাস পায়নি। এই সময় তিনি লিখতে আরম্ভ করলেন তাঁর একটি বড় গল্প.”হাজি মুরাদ” (Hadji Murad)। এই গল্পটি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পর। এটি তার একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা।
হাজি মুরাদ রচনার সাথে সাথে তিনি তাঁর আর একটি বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস। “নবজন্ম” (Resurrection)।
রাশিয়ার জার তৃতীয় আলেকজান্ডার মারা গেলেন। নতুন জার হলেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় নিকোলাস। তৃতীয় আলেকজান্ডার ছিলেন অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী। কিন্তু তাঁর পুত্র ছিলেন যেমন অত্যাচারী তেমনি নিষ্ঠুর। সমস্ত দেশ জুড়ে শুরু হল ধরপাকড় আর নির্যাতন। তলস্তয়ের বিরুদ্ধে কোন কিছু না করলেও তার অনুগামীদের কারাগারে পাঠানো হল। শুরু হল তাদের উপর নির্যাতন। সরকারের অনুগত ধর্মপ্রতিষ্ঠানের তরফে বলা হল কোন যাজক তার সকারে যেন অংশ না নেয়।
এদিকে দেশ জুড়ে লেলিনের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল বিপ্লবী আন্দোলন। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত হল তাঁর আবেগময় প্রবন্ধ, “আমি নীরব থাকতে পারি না।” এতে তিনি বিপ্লবীদের উপর অত্যাচারের তীব্র ভাষায় নিন্দা করলেন সাথে সাথে এই রচনা নিষিদ্ধ করা হল।
