তিনি পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়বার জন্য ভর্তি হলেন। কিছুদিন যেতেই সেখানকার জীবন ক্রমশই ক্লান্তিকর হয়ে উঠল তাঁর কাছে। ফিরে এলেন নিজের জমিদারিতে। সেখানেও ভাল লাগল না। গেলেন মস্কোতে।
বড় ভাই নিকোলাস বড়দিনের ছুটি কাটাতে বাড়িতে এলেন। ছোট ভাইয়ের আচার-আচরণ দেখে স্থির করলেন তাকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করে দেবেন। ভাই এর প্রস্তাবে রাজী হয়ে গেলেন তলস্তয়। সমস্ত জমিদারি দেখা শুনার ভার ভগ্নিপতির উপর দিয়ে ভাই এর সঙ্গে রওনা হলেন ককেসাসে।
তলস্তয় সেনাবাহিনীতে ভর্তি হলেন। এই সময়কার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তীকালে তিনি দুটি বিখ্যাত গল্প লিখেছিলেন “ককেসারে বন্দী” ও “কসাক”।
প্রথম কিছুদিন যুদ্ধের উন্মাদনায় মেতে উঠলেও ক্রমশই তার মনের মধ্যে যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটা ঘৃণা সৃষ্টি হতে আরম্ভ করল।
একদিকে সৈনিক জীবন, অন্যদিকে চলছিল সাহিত্য সাধনা। কয়েক মাস পরিশ্রম করবার পর শেষ করলেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের প্রথম পর্ব “শৈশব”। স্থানীয় একটি পত্রিকায় লেখাটি পাঠিয়ে দিলেন। দুই মাস পর পত্রিকার সম্পাদক নেক্রাসভের চিঠি এল। শৈশব পড়ে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন।
নেক্রাসভের এই প্রশংসায় উৎসাহিত হয়ে তলস্তয় শুরু করলেন উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব! “বাল্যকাল”। উপন্যাস রচনার সাথে সাথে তিনি লিখে চললেন ছোটগল্প, নকশা।
হঠাৎ ক্রিমিয়ায় যুদ্ধ শুরু হল। তলস্তয়কে যুদ্ধে যেতে হল। ১৮৫৪ সালে তিনি এলেন সেবাস্তপোলে। এখানে যুদ্ধ প্রবল আকার ধারণ করেছিল। যুদ্ধের বীভৎসতা দেখে তিনি এত বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, এই যুদ্ধের পরই তিনি সামরিক বিভাগ থেকে ইস্তফা দিলেন। ফিরে এলেন পিটার্সবার্গে। সেবাস্তপোলের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রচনা করলেন তিনটে গল্প।
ইতিমধ্যে তলস্তয়ের এক ভাই ক্ষয়রোগে মারা গিয়েছেন। জমিদারি দেখাশুনার জন্য পলিয়ানাতে ফিরে এলেন তলস্তয়। এর পর শুরু করলেন তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাসের তৃতীয় পর্ব “যৌবন”। তাঁর এই উপন্যাস শৈশব কৈশোর যৌবন (Childhood, Boyhood and Youth) তার জীবনের এক জীবন্ত চিত্র।
কিছুদিন জমিদারির কাজ দেখাশুনা করার পর তিনি দেশভ্রমণে বার হলেন। তখন ইউরোপের সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল ছিল প্যারিসে। তলস্তয় প্রথমে এলেন প্যারিসে। প্যরিস ছেড়ে গেলেন সুইজারল্যাণ্ডের রাজধানী জেনেভায়। কিছুদিন জেনেভায় থাকার পর ফিরে এলেন মস্কোতে।
তলস্তয়ের বড় ভাই নিকোলাস যক্ষ্মা রোগে মারা গেলেন। এই ভাইকে খুবই ভালবাসতেন তলস্তয়। তার মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেন তলস্তয়।
মানসিক অবসাদ ভুলতে নিজের জমিদারি ইয়াসনা পলিয়ানায় ফিরে এলেন।
১৮৫৫ সালে রাশিয়ার জার প্রথম নিকোলাসের মৃত্যু হল। তার পর সিংহাসনে বসলেন দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার। দ্বিতীয় আলেকজাণ্ডার কিছু সংস্কারমূলক নীতি প্রবর্তন করলেন। তলস্তয় একে স্বাগত জানালেন। এতে অন্য সব জমিদাররা তার উপর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠল এমনকি তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করা হল। এই সব ঘটনায় মানসিক অশান্তিতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন, ডাক্তার পরামর্শ দিলেন আবহাওয়া পরিবর্তন করতে।
তলস্তয় এলেন ককেসাসে। এখানে ছিলেন ডঃ বেহর্ম। পরিচয় হল তাঁর মেজ মেয়ে সোফিয়ার সাথে। দুজনেরই পরস্পরকে ভাল লেগে গেল। ১৮৬২ সালে তলস্তয় সোফিয়াকে বিয়ে করলেন, তখন তাঁর বয়স ৩৪, সোফিয়ার ১৮। স্ত্রীকে নিয়ে জমিদারিতে ফিরে এলেন তুলস্তয়। নতুন করে শুরু হল তাঁর সাহিত্য সাধনা।
ইতিমধ্যে তার যে সব রচনা শেষ করেছিলেন তার মধ্যে কসাক প্রকাশিত হল ১৮৬৩ সালে। সাথে সাথে অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করল। এই উপন্যাস প্রকাশের সাথে সাথে তলস্তয় রাশিয়ার একজন জনপ্রিয় লেখক হিসাবে খ্যাতি অর্জন করলেন। এই জনপ্রিয়তায় উৎসাহিত হয়ে তিনি শুরু করলেন তার ওয়ার এণ্ড পিস উপন্যাস (War and peace) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই উপন্যাসটি ১৮০৫ সাল থেকে ১৮১৩ সাল অবধি রাশিয়ার সমাজ জীবনের বিশাল পটভূমিতে লেখা। এটি রচনা করতে তাঁর দীর্ঘ পাঁচ বছর সময় লেগেছিল। ১৮৬৫ সালে রুশ দূত পত্রিকায় এই উপন্যাসের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। ১৮৬৯ সালে এর শেষ খণ্ড ছাপা হয়।
এই উপন্যাসকে মহাকাব্যর সঙ্গে তুলনা করা যায়। সমগ্র মানব জীবন এখানে তার সব বৈচিত্র্য ব্যাপ্তি নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। এর সাথে আছে মানব জীবনের বিশ্লেষণ, তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিবরণ। ১৮০৫ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যে রুশ সমাজ ব্যবস্থা, সেই সাথে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের রাশিয়া আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে তিনটি পরিবারের মধ্যে যে ভাঙাগড়ার খেলা চলেছে তারই কাহিনী ওয়ার এণ্ড পিস।
ইতিমধ্যে তিনি ছয়টি সন্তানের পিতা হয়েছেন। এছাড়া বাড়িতে আরো কয়েকটি ছোট ছেলেমেয়ে ছিল। এদের সঙ্গে মেলামেশা করতে করতে তিনি শিশু শিক্ষার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। গ্রামের শিশুদের জন্য কয়েকটি স্কুল খুললেন।
এই সময় একদিন তলস্তয় জানতে পারলেন একটি মেয়ে রেললাইনে আত্মহত্যা করেছে। এই ঘটনাটি তাঁর মনকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি এই ঘটনাটিকে অবলম্বন করে লিখলেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস আন্না ক্যারেনিনা। এই উপন্যাসটি লিখতেও তাঁর বেশ কয়েক বছর সময় লেগেছিল। ১৮৭৭ সালে রুশ দূত পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়।
