৯ই আগস্ট ১৯৪২ সালে বোম্বাইতে নিখিল ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির সভায় ভারত ছাড়ো প্রস্তাব গৃহীত হল। সাথে সাথে কংগ্রেসের সমস্ত নেতাকে গ্রেফতার করা হল। গান্ধী, সরোজিনী নাইডু, মহাদেব দেশাই, মীরাবেনকে বন্দী করে আগা খা প্রাসাদে রাখা হল।
সমস্ত ভারতবর্ষ উত্তাল হয়ে উঠল। শুরু হল গণবিক্ষোভ। পুলিশের হাতে প্রায় ১০০০ লোক মারা পড়ল।
গান্ধীর শরীরের অবস্থাও ক্রমশই খারাপের দিকে যেতে থাকে। ইংরেজ সরকার অনুভব করতে পারল কারাগারের গান্ধীর কোন ক্ষতি হলে সমস্ত বিশ্বের কাছে তাদের কৈফিয়ৎ দিতে হবে তাই বিনা শর্তে গান্ধীকে মুক্তি দেওয়া হল।
১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল ইংল্যান্ডে সাধারণ নির্বাচনে শ্রমিকদল জয়ী হল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইংল্যান্ডকে এতখানি বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল তারা উপলব্ধি করতে পারছিল ভারতের স্বাধীনতার দাবিকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভবপর নয়।
এদিকে দেশের মধ্যে হিন্দু-মুসলমানদের বিভেদ ক্রমশই প্রবল আকার ধারণ করতে থাকে। শুরু হল ভয়াবহ দাঙ্গা।
পরস্পরিক এই দাঙ্গাবিভেদে গান্ধী গভীর দুঃখিত হয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য, পরস্পরের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ নয়। কিন্তু তিনি বেদনাহত হলেন। দেশ বিভাগের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করল।
দিল্লীতেও তখন নানান সমস্যা। একদিকে দাঙ্গাপীড়িত মানুষ, মন্ত্রিসভায় মতানৈক্য, খাদ্য-বস্ত্রের সমস্যা। দিল্লীতে মুসলমানদের নিরাপত্তার জন্য তিনি অনশন করলেন এবং এই তাঁর শেষ অনশন। সম্মিলিত সকলের অনুরোধে ১৮ই জানুয়ারি অনশন ভঙ্গ করলেন।
এই সময় গান্ধী নিয়মিত প্রার্থনাসভায় যোগ দিতেন। ৩০শে জানুয়ারি তিনি প্রার্থনাসভায় যোগ দিতে চলেছেন এমন সময় ভিড় ঠেলে তার সামনে এগিয়ে এল এক যুবক। সকলের মনে হল সে বোধ হয় গান্ধীকে প্রণাম করবে। কিন্তু কাছে এসেই সে সামনে ঝুঁকে পড়ে পর পর তিনবার পিস্তলের গুলি চালাল। দুটি গুলি পেটে, একটি বুকে বিধল। সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন গান্ধী। তার মুখ থেকে শুধু দুটি শব্দ বার হল “হে রাম”। তারপরই সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
সমস্ত দেশ শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। পরদিন যমুনার তীরে চিতার আগুনে তার পার্থিব দেহ ভস্মীভূত হয়ে গেল। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষেরা শ্রদ্ধঞ্জলী পাঠালেন। তাদের মধ্যে ছিলেন দেশবরেণ্য মানুষেরা। তাদের সকলের কাছে গান্ধী ছিলেন বিপন্ন মানব সভ্যতার সামনের একমাত্র আশার আলো।
৬৩. লেভ তলস্তয় (১৮২৮–১৯১০)
এ মহান রুশ মনীষী, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, মানবতাবাদী তলস্তয়ের জন্ম হয় ১৮২৮ সালের ২৮ আগস্ট (৯ সেপ্টেম্বর) রাশিয়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। বাবা-মা দুই দিক থেকেই তলস্তয় ছিলেন খাঁটি অভিজাত। তলস্তয়ের বাবা নিকোলাস ছিলেন বিশাল জমিদারির মালিক।
লিও তলস্তয় ছিলেন তাঁর পিতামাতার চতুর্থ পুত্র। তার জন্মের এক বছর পরেই তার মা মারা গেলেন। তার দেখাশুনার ভার ছিল এক ফুফুর উপর। পাঁচ বছর বয়সে বাড়িতেই শুরু হল তাঁর পড়াশুনা, একজন জার্মান শিক্ষক তাঁকে পড়াতেন।
যখন তাঁর আট বছর বয়স, ভাইদের সাথে তাকে পলিয়ানার গ্রাম্য পরিবেশ ছেড়ে যেতে হল মস্কোতে।
বেশিদিন তাঁকে মস্কোতে থাকতে হল না। এক বছর পর হঠাৎ নিকোলাস মারা গেলেন। তাদের অভিভাবিকা হলেন ফুফু। বড় দুই ভাই মস্কোতে রয়ে গেল, তলস্তয় ফিরে গেলেন ফুফুর কাছে পলিয়ানায়। বাড়িতে শিক্ষক ঠিক করা হল। তার কাছেই শিখতে আরম্ভ করলেন জার্মান আর রুশ ভাষা।
তিন বছর যেতে না যেতেই ফুফু মারা গেলেন, এবার নাবালকদের অভিভাবক হলেন আরেক ফুফু, তিনি থাকতেন কাজানে। ফুফু তলস্তয়কে নিয়ে গেলেন কাজানে।
এভাবে অলস আমোদ আহ্লাদে দিন কাটতে দেখে ভাই ঠিক করলেন তলস্তয়কে খাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির পরীক্ষায় প্রথমবার পাশ করতে পারলেন না। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন।
পড়াশুনার প্রতি কোনদিনই মনোযোগী ছিলেন না তলস্তয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এতদিনের সব বাধা বন্ধন মুক্ত হয়ে গেলেন তলস্তয়। দিন-রাতের বেশির ভাগ সময়েই আচ্ছা আমোদ আর ফুর্তিতেই কেটে যেত।
পরিণতিতে পরীক্ষায় ফেল করলেন। দেখতে দেখতে ১৮ বছরে পা দিলেন তলস্তয়। ভাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে সৈন্যদলের অফিসার হিসাবে যোগ দিয়েছে। সাবালক হওয়ার জন্যে তলস্তয় পৈতৃক সম্পত্তির মালিকানা পেলেন। ইয়াসনা পলিয়ানার বিশাল জমিদারি, সেই সাথে প্রায় ৩৫০ জন ভূমিদাসের মালিক হলেন তিনি।
খাজানের উচ্ছখল অনিয়ম জীবন যাপনের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হল।
হাসপাতাল থেকে ফিরে তিনি সোজা চলে এলেন নিজের জমিদারিতে। তলস্তয় ছিলেন রুশোর আদর্শে অনুপ্রাণিত, তিনি স্থির করলেন নিজের জমিদারির মধ্যে ভূমিদাসদের উন্নতি করবেন।
তারা তলস্তয়ের এই কাজকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে আরম্ভ করল। তাদের মনে হল এর পেছনে অবশ্যই কোন খারাপ উদ্দেশ্য আছে। তাদের এই আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন তলস্তয়। তিনি ঠিক করলেন কৃষকদের মধ্যে সময়ের অপচয় না করে পড়াশুনা আরম্ভ করবেন।
