সে সময় ভারত থেকে প্রচুর পরিমাণে শ্রমিক দক্ষিণ আফ্রিকায় পাঠানো হত। এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবারে সোচ্চার হয়ে উঠলেন গান্ধী। কিছুদিনের মধ্যেই এই আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করল। এর ফলশ্রুতিতে ১৯১৭ সালের ৩১শে জুলাই ভারত থেকে শ্রমিক পাঠানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল।
১৯১৮ সাল, ইউরোপের বুকে তখন চলেছে বিশ্বযুদ্ধ। ইংরেজরাও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বড়লাট লর্ড চেমসফোর্ড দিল্লীতে গান্ধীকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এই যুদ্ধে ভারতীয়দের ইংরেজ পক্ষ সমর্থনের জন্য অনুরোধ করলেন।
গান্ধীর ধারণা হয়েছিল ভারতবাসী যদি ইংরেজদের সাহায্য করে। অচিরে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। ইংরেজদের প্রতি তাঁর এক মোহ ছিল যা থেকে তিনি কোনদিনই মুক্ত হতে পরেননি।
যুদ্ধের পর সকলেই আশা করেছিল ভারতবাসী স্বায়ত্তশাসন পাবে। কিন্তু তার পরিবর্তে বড়লাট রাউলাট আইন নামে এক দমনমূলক আইন পাস করলেন। এতে বলা হল কেউ সামান্যতম সরকারি-বিরোধী কাজকর্ম করলে তাকে বিনা বিচারের বন্দী করা হবে।
১৩ এপ্রিল রামনবমীর মেলা উপলক্ষে জালিয়ানওয়ালাবাগ নামে এক জায়গায় কয়েক হাজার মানুষ জড় হল। জায়গাটার চারদিকে উঁচু পাঁচিল বার হবার একটি মাত্র পথ। ডায়ারের নির্দেশ সেই নিরীহ জনগণের উপর নির্মম ভাবে গুলি চালান হল। কয়েক হাজার মানুষ হতাহত হল।
এই ঘটনায় সমস্ত দেশ ক্ষোভে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। বহু জায়গায় হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু হল। গান্ধীর সত্যাগ্রহ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হল। তিনি নিজেই তার ভুল স্বীকার করলেন।
নাগপুরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে (১৯২০) গান্ধীজির অসহযোগ আন্দেলনের প্রস্তাব সমর্থিত হল।
গান্ধী ইংরেজ সরকারের সাথে সহযোগিতা করতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, সব সরকারী স্কুল-কলেজ, আইন-আদালতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। ব্যবস্থাপক সভা বর্জন করতে হবে। বিদেশী দ্রব্য বর্জন করতে হবে। স্বাবলম্বী হওয়ার জন্যে চরকা ও তাত প্রচলন করতে হবে।
গান্ধীর এই ডাকে দেশ জুড়ে অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেল। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিদেশী বস্ত্র পোড়ানো শুরু হল। লোকে চরকায় বোনা কাপড় পরতে আরম্ভ করল।
১৯২২ সালের ৮ই ফেব্রুয়ারি উত্তর প্রদেশের চৌরিচৌরা নামক স্থানে উত্তেজিত জনতা কিছু পুলিশকে হত্যা করল। এর প্রতিবাদে তিনি আন্দোলন বন্ধ করে দিলেন। গান্ধীকে গ্রেফতার করা হল। দেশব্যাপী আন্দোলনের দায় গান্ধীজি নিজেই স্বীকার করে নিলেন। বিচারে তার ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হল।
জেলে তিনি চরকা কাটতে চাইলেন। কিন্তু তাকে সে অনুমতি দেওয়া হল না। তিনি উপবাস শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর সব দাবি মেনে নেওয়া হল। কিন্তু কিছুদিন পূর্বেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এই অসুস্থতার জন্যেই তাকে ১৯২৪ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি দেওয়া হল।
১৯২৫, ২৬,২৭ সালে গান্ধীজি কংগ্রেসের অধিবেশনে উপস্থিত থাকলেও তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেননি। সুভাষচন্দ্র ও জহরলাল পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তুলে একটি প্রস্তাব আনতে চান। এতে গান্ধীজি ক্ষুব্ধ হন। তিনি চেয়েছিলেন আপোষ আলোচনায় মাধ্যমে স্বায়ত্ত শাসন।
তখন নিয়ম ছিল ভারতবাসী লবণ তৈরি করতে পারবে না। এমনকি যারা সমুদ্রের ধারে থাকে তারাও লবণ প্রস্তুত করতে পারবে না। সকলকেই ব্রিটিশ সরকারের লবণ কিনতে হবে।
অল্পদিনের মধ্যেই সমগ্র ভারত জুড়ে শুরু হল লবণ আইন অমান্য আন্দোলন। গ্রাম-শহরে মানুষ লবণ তৈরি করতে আরম্ভ করল। হাজার হাজার মানুষকে বন্দী করা হল। দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের উপর শুরু হল অকথ্য অত্যাচার। সেই সময় কম বেশি প্রায় এক লক্ষ সত্যাগ্রহী কারারুদ্ধ হল। বাধ্য হয়ে লর্ড ডারউইন গান্ধীর সাথে বৈঠকে বসলেন এবং তাদের মধ্যে চুক্তি হল সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ লবণ তৈরি করতে এবং বিক্রি করতে পারবে এবং দেশের সমস্ত রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার জন্যে গান্ধীকে আমন্ত্রণ জানানো হল।
১৯৩১ সালের ১৫ই আগস্ট তিনি বিলাতযাত্রা করলেন। ইংল্যান্ডে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী, সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও সম্রাজ্ঞীর সাথে আলোচনা করলেন। পরনে অর্ধনগ ফকিরের পোশাক। সেই সময় ইংল্যান্ডের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসতেন এদের মধ্যে ছিলেন জর্জনার্ড শ, চার্লি চ্যাপলিন, হারল্ড ল্যাস্কি। কিন্তু সমস্ত আলাপ আলোচনা ব্যর্থ হল।
গান্ধী যখন দেশে ফিরলেন, দেশ জুড়ে তখন চলেছে নির্যাতন আর নিপীড়ন। নেতৃস্থানীয় সকলেই বন্দী। গান্ধীকেও বন্দী করা হল।
গান্ধী বুঝতে পারছিলেন কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য তাকে শ্রদ্ধা করলেও তার নীতি আদর্শ মেনে চলে না, সূতা কাটে না, সত্যাগ্রহের আদর্শ অনুসরণ করে চলে না। তাই তিনি কংগ্রেস থেকে পদত্যাগ করলেন।
১৯৪০ সালে গান্ধীজি শান্তিনিতনের এলেন। কবিগুরুর সাথে ছিল তার মধুর এবং আন্তরিক সম্পর্ক। শান্তিনিকেতনের কাজে গান্ধী নানাভাবে রবীন্দ্রনাথকে সাহায্য করেছেন।
এই বছরেই রামগড়ে কংগ্রেস অধিবেশন বসল। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হলেন। এই অধিবেশনে ঘোষণা কর হল একমাত্র পূর্ণ স্বাধীনতাই ভারতের কাম্য। গান্ধীকে পুনরায় দলের নেতা হিসাবে নির্বাচিত করা হল। শুরু হল সত্যাগ্রহ আন্দোলন।
