প্রথমে কিছুদিন আত্মগোপন করে রইলেন হো। শেষে বুঝতে পারলেন এভাবে বেশিদিন থাকা সম্ভব নয়। পালিয়ে গেলেন মস্কোতে। উদ্দেশ্য ছিল ভিয়েনামের বিপ্লবী আন্দোলনে রাশিয়ার সাহায্য, সমর্থন লাভ করা। অল্প কিছুদিন মস্কোতে থাকার পর নানান দেশ ঘুরে এলেন শ্যাম দেশে। সর্বত্রই কমিউনিস্ট বিরোধী মনোভাব। হো স্থির করলেন এখান থেকেই দলের কার্যকলাপ পরিচালনা করবেন। তিনি এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশ ধারণ করলেন। শ্যাম দেশে তখন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাদের ভিড়ে সহজেই মিশে গেলেন হো। সেখান থেকেই দলের কর্মীদের উদ্দেশ্যে নিয়মিত নির্দেশ পাঠাতেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে তুললেন ছোট ছোট সংগঠন।
১৯২৮ সালে ফরাসী শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হল। এই ধর্মঘটে যোগ দিল দেশের প্রায় প্রতিটি কলকারখানা শ্রমিক, রিক্সাচালক, রেলকর্মচারীরা। বন্ধ হল উৎপাদন, বিচ্ছিন্ন হল যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভিয়েনামের ইতিহাসে সেই প্রথম সর্বাত্মক ধর্মঘট। সরকারী কর্তৃপক্ষের অমানবিক অত্যাচারে ধর্মঘট ভেঙে গেলেও দেশের মানুষ উপলব্ধি করতে পারল দেশের মানুষে সম্মিলিত শক্তি।
ভিয়েনামের বুকে ক্রমশই কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রসার ঘটছিল। তাদের সমূলে উপাটিত করবার জন্য বহু নেতৃস্থানীয় বিপ্লবীকে হত্যা করল ফরাসী শাসকরা। হো চি মিন তখন ছিলেন হংকং-এ। তার অবর্তমানেই তাঁর বিচার হল বিচারে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হল। হংকং কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানান হল তাঁকে বন্দী করে ফরাসী কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিতে।
এই সংবাদ পেলে গোপনে হংকং ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। কিন্তু দেশত্যাগের আগেই পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হল কারাগারে। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন হো। তাকে পাঠানো হল হাসপাতালে। এই সময় চারদিকে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল জেলের মধ্যেই অসুস্থ অবস্থায় হো মারা গিয়েছেন। প্রিয় নেতার এই অকাল মৃত্যুর সংবাদে সমস্ত দেশ শোকে বিহ্বল হয়ে পড়ল।
হো অসুস্থ অবস্থাতেই জেল হাসপাতাল থেকে পালিয়ে সম্পূর্ণ গোপনে গিয়ে পৌঁছলেন মস্কোতে। এখান থেকেই দলের নেতাদের কাছে সংবাদ পাঠালেন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ এই চার বছর তিনি মস্কোতে ছিলেন। এখানে তিনি গভীরভাবে পড়াশুনা করেছেন মার্কসবাদ, সমাজতত্ত্ব, অর্থনীতি, বিজ্ঞান। তারই সাথে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কমিউনিস্ট সংগঠনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন, দেশের বিপ্লবীদের সাথে নিয়মিতভাবে সংবাদ আদায়-প্রদান করেছেন।
ইতিমধ্যে গড়ে উঠেছে ভিয়েত্রাম কমিউনিস্ট পার্টি। দেশে ফিরে আসবার জন্য সমস্ত মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল হোর। হঠাৎ সে সুযোগ এসে গেল। জাপান চীন আক্রমণ করল। চীনে তখন কমিউনিস্ট পার্টি এক বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়েছে। চিয়াং কাইশেক অনুভব করলেন তাঁর একার শক্তিতে জাপানী আক্রমণ প্রতিহত করা সম্ভব নয়। তাই কমিউনিস্টদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। তাদের উপর থেকে তুলে নেওয়া হল সব বিধিনিষেধ। নতুন গেরিলা বাহিনী তৈরি করার জন্য কুয়োমিংটং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে কয়েকজন শিক্ষক চাওয়া হল।
হো এই সংবাদ পেয়ে মস্কো থেকে ফিরে এলেন চীনে। যোগ দিলেন গেরিলা বাহিনীতে। এখানেই দেখা হল ফান ভান ডং এবং নুয়েন গিয়াপের সাথে। ফান সুদীর্ঘ কাল বিপ্লবী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত ছিলেন। ছিলেন ইতিহাসের শিক্ষক। হোর অবর্তমানে তাঁরাই দলকে সংগঠিত করেছিলেন, পরিচালনা করেছিলেন। বিপ্লবী কাজকর্ম ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছে। জার্মানি বাহিনী একের পর একদেশ অধিকার করতে থাকে। ফরাসীরা ছিল মিত্রপক্ষে। যুদ্ধে পরাজিত হল ফ্রান্স। ফ্রান্সের এই পরাজয়ে উল্লসিত হয়ে উঠলেন হো…তিনি উপলব্ধি করলেন আঘাত হানার এই উপযুক্ত সময়। তাছাড়া দেশের মানুষও বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত। সঙ্গীদের সালে পরামর্শ করে ১৯৪১ সালে দেশের ফিরে এলেন হো। তার মাথার উপর ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা, তাই ছদ্মনামে ছদ্মবেশে এক চাষীর বাড়িতে এসে আশ্রয় নিলেন। তার কয়েক মাস পরেই ১৯৪১ সালের মে মাসে ইন্দোচীন কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টম প্লেনাম ডাকা হল।
শহর থেকে বহুদূরে এক নির্জন নদীর ছোট একটা কুটিরে বসল পার্টির অধিবেশন। পাছে ফরাসী কর্তৃপক্ষ কিছু জানতে পারে তাই প্রতিনিধিরা প্রায় সকলেই ছদ্মবেশে সেখানে এসে পৌঁছলেন। এই কুঁড়েঘরেই সর্বসম্মতভাবে স্থির হল নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রের ঘোষণা করা হবে। রাষ্ট্রের নাম দেওয়া হল ভিয়েত্ৰাম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। ১৯৪১ সালের ৬ই জুন চীনের এক বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করা হল নতুন রাষ্ট্রের জন্মের কথা। ডাক দেওয়া হল সর্বাত্মক বিপ্লবের।
এতদিন হো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছদ্মনামে নিজের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর প্রকৃত নাম ঢাকা পড়ে গিয়েছিল ছদ্মনামের আড়ালে। এইবার তিনি নতুন নাম নিলেন হো চি মিন যার অর্থ যিনি আলোকিত করেন। তিনি যথার্থই ভিয়েত্নামের আলোর দিশারী। তাই এই নামেই জগত্বরেণ্য হয়ে আছেন।
