কিন্তু আকস্মিকভাবে হোর জীবনে নেমে এল বিপর্যয়। চিয়াং কাইশকের হাতে বন্দী হলেন তিনি। এইবারও ঘোষণা করা হল তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তিনি জেলে ছিলেন, জেলে তার উপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়। কিন্তু অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে ভরপুর হো সব অত্যাচার নিপীড়ন সহ্য করেও প্রাণে বেঁচে গেলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে মুক্তি দেওয়া হল।
ইতিমধ্যে গিয়াপ পার্টির সংগঠনকে মজবুত করেছেন, তৈরি করেছেন ভিয়েত্রম গেরিলা বাহিনী। দলে দলে যুবকরা যোগ দেয় এই বাহিনীতে। নির্জন পার্বত্য প্রদেশে তাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষা সমাপ্ত হতেই গেরিলা বাহিনী ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফরাসী বাহিনীর উপর।
অন্যদিকে জাপানের সৈন্যবাহিনী ভিয়েত্রাম আক্রমণ করে। জাপানী সৈন্যের হাতেও মারা পড়ল বহু ফরাসী সৈন্য। গিয়াপ ও চু মান তার বিপ্লবী সেনাবাহিনীর সাহায্যে অধিকার করলেন সমগ্র দক্ষিণাঞ্চল।
ফরাসীরা উপলব্ধি করল তাদের শাসনের দিন শেষ হয়েছে। ভিয়েত্রামী জনগণের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবার পরিবর্তে তারা ম্রাট বাওদাই-এর হাতে তুলে দিল দেশের শাসন। সম্রাট বাওদাই ছিলেন এক অপদার্থ শাসক যিনি ফসারীদের অনুগ্রহে এতদিন। ভোগবিলাসে মত্ত ছিলেন।
এর বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ল সমস্ত ভিয়েত্রামী জনগণ। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব ভার ভিয়েনাম মুক্তি কমিটির হাতে। এই কমিটির প্রধান ছিলেন হো। তিনি ডাক দিলেন গণ অভ্যুত্থানের। দিনটি ছিল ২০শে আগস্ট ১৯৪৫।
যে ভিয়েত্নামীরা যুগ যুগ ধরে লাঞ্ছিত হয়েছে, অত্যাচারিত হয়েছে, নির্যাতন সহ্য করেছে ফরাসীদের হাতে, তাদের বুকে জ্বলে উঠল প্রতিশোধের আগুন। হাজার হাজার ফরাসী মারা পড়ল ভিয়েত্রমীদের হাতে।
স্বদেশবাসীর উপর এই অত্যাচার দেখে সসৈন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফরাসী বাহিনী। তাদের সাহায্যে সেই সাথে কমিউনিস্টদের নিশ্চিহ্ন করতে এগিয়ে এল ব্রিটিশ সেনাবাহিনী। শুরু হল ভিয়োমী মুক্তি বাহিনীর সাথে সম্মিলিত বাহিনীর মরণপণ সংগ্রাম।
হো ছিলেন সমস্ত বিপ্লবীদের কাছে এক জীবন্ত প্রেরণা। তিনি নিজে গেরিলা যোদ্ধাদের মধ্যে ঘুরে বেড়াতেন। দিনের পর দিন রাতের পর রাত তাদের সাথে কাটিয়েছেন পাহাড়ে জঙ্গলে, খোলা আকাশের নিচে। একই খাবার ভাগাভাগি করে খেয়েছেন যখন বিপ্লবী বাহিনী জয়ী হয়েছে, তিনি তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। যখন তারা পরাজিত হয়েছে, হতদ্যম হয়ে পড়েছে, তাদের উৎসাহ দিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন।
ফরাসী আর ইংরেজ সেনাদের প্রবল অত্যাচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও ভেঙে পড়েনি ভিয়েনামবাসীরা। কখনো আড়াল থেকে দেশবাসীকে শক্তি, প্রেরণা দিয়েছেন হো। দীর্ঘ চার বছর রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলবার পর ভিয়েত্সামের সাহায্যে এগিয়ে এল চীন, রাশিয়া, ফরাসীরা বুঝতে পেরেছিল তাদের একার শক্তিতে আর ভিয়েনামীদের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এল আমেরিকা। তবুও তাদের পরাজয় বরণ করতে হল। দিয়েন বিয়েন ফুতে রচিত হল ফরাসীদের শেষশয্যা। শেষ হল ভিয়েত্রামে ৮০ বছরের ফরাসী শাসন। এবার এগিয়ে এল আমেরিকা।
১৯৫৬ সালের ৮ই মে জেনেভায় বসল আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলন। পশ্চিমি দেশগুলো শান্তির শর্ত হিসাবে ভিয়েৎনামকে বিভক্ত করতে চাইল। যুদ্ধক্লান্ত ক্ষতবিক্ষত ভিয়েজ্ঞামের মানুষের কথা চিন্তা করে এই প্রস্তাব মেনে নিলেন হো। যদিও তিনি অন্তর থেকে চেয়েছিলেন ভিয়েত্সাম এক ও অবিভক্ত থাকুক।
উত্তরের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন হো চি মিন। আর দক্ষিণের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন নো দিন জিয়েস। মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি তাঁকে এই আসনে বসিয়েছিলেন পুতুল সরকার হিসাবে দেশ শাসন করবার জন্য।
স্থির হয়েছিল সেই বছরই দেশের দুই অংশে নির্বাচন হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছিল এই নির্বাচন হলে হো হবেন সমগ্র ভিয়েনামের রাষ্ট্রপ্রধান। তাই আমেরিকার প্ররোচনায় নির্বাচন করা সম্ভব হল না।
হো ছিল ছিলেন অত্যাচারী শাসক। অল্পদিনেই তাঁর শোষণ অত্যাচারে সমস্ত দক্ষিণের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। দাবি উঠল অখণ্ড ভিয়েনামের। তাদের সাহায্যে এবার এগিয়ে এল উত্তরের মানুষ। হো সমর্থন জানালেন দক্ষিণের মানুষের গণ আন্দোলনকে।
হো সে দিন সরকার বিপদ আসন্ন বুঝতে পেরে এবার সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমেরিকা। শুরু হল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এক নারকীয় অত্যাচার। একদিকে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী দেশ আমেরিকা, অন্যদিকে এক ক্ষুদ্র সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশ ভিয়েৎনাম।
সেই অজেয় শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সামান্যতম বিচলিত হয়নি ভিয়েত্রামের সাধারণ মানুষ কারণ তাহাদের সাথে ছিলেন তাদের প্রিয় নেতা হো চি মিন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েত্নামের বুকে যে পরিমাণ নাপাম বোমা ফেলেছিল পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল। ভিয়েত্রামের মানুষ, হোর নেতৃত্ব সেদিন প্রমাণ করেছিল কোন অস্ত্র দিয়েই মানুষের অদম্য মনোবলকে ধ্বংস করা যায় না। হো দেশের মানুষকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন, তোমরা ইস্পাতের মত কঠিন, বজ্রের মত মহাতেজী হও।
১৯৬৯ সালের ১০ই মে অসুস্থ হয়ে পড়লেন হো। বুঝতে পারলেন তাঁর মৃত্যু আসন্ন। তিনি জনগণের উদ্দেশ্যে তার শেষ বার্তা রচনা করলেন। যখন আমার জীবনের শেষ ক্ষণ আসবে তখন আমার সমস্ত মন ভারাক্রান্ত হবে আরো দীর্ঘদিন তোমাদের সেবা করতে পারলাম না বলে। আমার মৃত্যুর পর কোন শোক অনুষ্ঠান করে যেন জনগনের অর্থ আর সময়ের অর্থ আর সময়ের অপচয় না করা হয় সবশেষে আমি রেখে গেলাম পার্টির সকল সদস্য, সেনাবহিনী আর প্রতিটি স্বদেশবাসীর জন্য আমার গভীর ভালবাসা।” এর পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।
