দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে তখন আরো কয়েকজন বিপ্লবী নতা এসে আশ্রয় নিয়েছিল প্যারিসে। তাদের সাথে যোগযোগ গড়ে তুললেন হো। ১৯২০ সাল প্যারিসে ফরাসী সোসালিস্ট পার্টির অধিবেশন বসল। এই অধিবেশনে যোগ দিতে এলেন দেশ-বিদেশ থেকে অনেক প্রতিনিধি। হো যোগ দিলেন ভিয়েনামের প্রতিনিধি হিসাবে। তখন তিনি ত্রিশ বছরের এক যুবক।
এই টাওয়ার্স কংগ্রেসে তিনি দিলেন তার ঐতিহাসিক বক্তৃতা। এই প্রথম কেউ বিশ্বের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরলেন ভিয়েত্নামের উপর শোষণ আর অত্যাচার করে চলেছে। যারা সামান্যতম প্রতিবাদ করছে তাদের উপর চালানো হচ্ছে অকথ্য নির্যাতন। ফরাসী সৈনিক রাজপুরুষদের লালসার বলি হচ্ছে সাধারণ ভিয়েনামী নারীরা। হাজার হাজার তরুণ যুবক কারাগারের অন্ধ কুঠুরির মধ্যে শেষ করছে তাদের জীবন। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্রমে গড়ে তোলা সম্পদে ধনী হচ্ছে সামান্য কিছু মানুষ আর দেশের মানুষ অনাহারে অশিক্ষায় চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পশুর মত জীবন যাপন করছে।
হোর উদাত্ত কণ্ঠের জ্বালাময়ী বক্তৃতায় স্তম্ভিত হয়ে গেল দেশে-বিদেশের প্রতিনিধিরা। হো শুধু তাদের কাছে দেশের সমস্যার কথা বললেন না। সকলের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন যাতে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারে ভিয়েত্নাম।
তখন রাশিয়া সবেমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠালাভ করছে। অন্য দেশে আন্তর্জার্তিক কমিউনিস্ট সংগঠনের শক্তি সীমাবদ্ধ। প্রত্যক্ষ সাহায্য না পেলেও নানা বিষয়ে পরামর্শ পেলেন। তিনি উপলব্ধি করলেন বাইরের কোন শক্তির সাহায্যে নয়, নিজের দেশের মানুষের সম্মিলিত ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমেই গড়ে তুলতে হবে বিপ্লব। আর জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক দলের। যে সমস্ত ভিয়েত্রমী রাজনৈতিক কর্মী গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে এসেছিল প্যারিসে, তাদের সাথে প্রতিষ্ঠা করলেন ভিয়েত্নাম কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯২০ সালে প্রবাসে সামান্য কয়েকজনের মিলিত চেষ্টায় যে পার্টির জন্ম হয়েছিল, উত্তরকালে তাই মহীরুহ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ভিয়েম।
প্যারিসে থাকার সময় প্রথম পরিচিত হলেন লেনিনের রচনাবলীর সাথে। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ, চিন্তাধারা বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার ক্রিয়াকৌশল থেকে অনুভব করলেন লেনিনের পথই প্রকৃত বিপ্লবের পথ-এই পথেই তাঁকে অগ্রসর হতে হবে। গভীর অধ্যয়নের সাথে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করতেন। এতে একদিকে যেমন কিছু অর্থ উপার্জন হয় অন্যদিকে তেমনি ভিয়েনামের প্রকৃত চিত্রকে তুলে ধরতেন ফরাসী জনগণের কাছে।
দীর্ঘ পাঁচ বছর প্যারিসে কাটাবার পর তিনি রওনা হলেন মস্কোতে। বিপ্লব-উত্তর মস্কোর জনজাগরণ দেখে মুগ্ধ হলেন। এক বছর মস্কোতে ছিলেন তিনি। এই এক বছর তিনি শুধু রুশ কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন না, তাঁদের কাছ থেকে সংগ্রহ করলেন রুশ বিপ্লবের পুঙ্খানুপুঙ্খ ইতিহাস। এখানে থাকাকালীন সময়ে প্রভা পত্রিকায় বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ রচনা করেন।
ভিয়েত্নামে প্রত্যাবর্তন করা বিপজ্জনক বিবেচনা করে ১৯২৫ সালে এসে পৌঁছলেন চীনের ক্যান্টন শহরে। এই সময় চীন সরকার কমিউনিস্টদের প্রতি যথেষ্ট উদার আর সহৃদয় মনোভাবাপন্ন ছিলেন।
ভিয়েনামে তখন গড়ে উঠেছিল একাধিক বিপ্লবী সংগঠন। প্রায় প্রতিটি সংগঠনই ছিল নিষিদ্ধ। এদের বেশিরভাগ সদস্যকেই বন্দী করা হয়েছিল। যারা পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল তাদের অধিকাংশই ক্যান্টনে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করল। এদের মধ্যে ফাঁই বই চাও সবচেয়ে বড় দল গঠন করেছিলেন। হাজার হাজার তরুণ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেবার জন্য এই দলে নাম লিখিয়েছিলেন। এই উদ্যমী তরুণ সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দেবার মত সাংগঠনিক দক্ষতা বা ব্যক্তিত্ব ছিল না ফাই বই চাও-এর। তাছাড়া দলের সুনির্দিষ্ট কোন কর্মসূচি ছিল না…অল্পদিনের মধ্যেই দলের অধিকাংশ সদস্যই নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল।
হো ক্যান্টন এসে প্রথমেই সব রাজনৈতিক দল, তাদের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। লক্ষ্য করলেন, তাদের মতাদর্শগত বিভেদ। তিনি সকলকে বিভেদ ভুলে এক ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হবার আহ্বান জানালেন। ফাঁই বই চাও-এর দলের সদস্যরা দলে দলে এসে যোগ দিল তার সাথে। এই সমস্ত তরুণ বিপ্লবীদের নিয়ে হো চি মিন গড়ে তুললেন ‘ভিয়েম বিপ্লবী তরুণ সংঘ’। এই দলই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে ভিয়েনামের প্রধান রাজনৈতিক দল ‘থান নিয়েন’। হে হলেন দলের সভাপতি। ক্যান্টনে খোলা হল দলের প্রধান কার্যালয়। স্থির হল এখান থেকেই পরিচালিত হবে বিপ্লবী কার্যকলাপ।
সেই সময়ে চীনের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন চিয়াং কাইশেক। তিনি ছিলেন আজন্ম কমিউনিস্ট বিদ্বেষী। শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য তাদের সাথে সম্পর্ক রেখেছিলেন। রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরিভাবে অধিকার করতেই চিয়াং কাইশেক অনুভব করলেন কমিউনিস্টদের নির্মূল করা প্রয়োজন না হলে উত্তরকালে তারাই তাঁর পক্ষে সবচেয়ে বিপদের কারণ হয়ে উঠবে। তাছাড়া রুশ বিপ্লবের পর পৃথিবীর সব দেশের শাসক সম্প্রদায় কমিউনিস্টদের সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতে আরম্ভ করেছিল। চীন দেশেও কমিউনিস্টদের আন্দোলন ক্রমশই বেড়ে চলছিল। ১৯২৭ সালে চিয়াং কাইশেক কমিউনিস্ট দলের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। শুরু হল তাদের উপর অত্যাচার আর নিপীড়ন। হাজার হাজার কমিউনিস্ট সমর্থককে বন্দী করা হল।
