এইবার শুধু সম্রাট নন, স্থানীয় মানুষরাও খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে রাগে ফেটে পড়ল। উন্মত্ত মানুষের আক্রমণে মারা পড়ল অনেক ধর্মযাজক। অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল ফ্রান্সে।
নিজের দেশের ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে এই অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ জানাতে ক্রুদ্ধ ফরাসী সম্রাট বিরাট এক সৈন্যবাহিনী পাঠালেন ভিয়েত্রামে। ১৮৬০ সাল নাগদ তারা অধিকার করল সায়গন। ভিয়েম সরকার বাধা দিয়েও পরাজিত হল। সায়গনেই ফরাসী সৈন্যরা স্থায়ী আস্তানা গাড়ল। সেখানে তৈরি হল দূর্গ। দীর্ঘ কুড়ি বছর তারা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে ১৮৮৩ সালে দখল করল হ্যাঁনয় আর হাইফা। এরই সাথে সমগ্র ভিয়েনামের উপর নিজেদের প্রভুত্ব কাযেম করল ফরাসীরা।
স্বাধীনতা হারিয়ে যারাই প্রতিবাদ করল তাদের উপর শুরু হল নির্মম অত্যাচার। দেশের সমস্ত উচ্চ পদে বসানো হল ফরাসীদের। আর কিছু মানুষ হয়ে পড়ল ফরাসীদের অনুগত তাঁবেদার। নির্বিবাদে ফরাসীরা তাদের শাসন শোসণ চালিয়ে যেতে সক্ষম হল।
বিংশ শতকের প্রথম থেকে ভিয়েত্নামের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আন্দোলন হলেও সুসংহত কোন আন্দোলন গড়ে ওঠেনি।
এ সময়ে হুয়ে শহরে গড়ে উঠেছিল এক গোপন বিপ্লবী সংগঠন। হো চি মিন এই সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে পড়লেন। তখন তার বয়স মাত্র ১৮। এই সংগঠন গোপনে জনগণের মধ্যে প্রচার চালাত।
হো ঘুরে ঘুরে প্রচারপত্র বিলি করতেন। জনগণকে বোঝাতেন অত্যাচারী ফরাসীদের দেশ থেকে বিতাড়িত করতে না পারলে মানুষের মুক্তি নেই।
একদিন ধরা পড়ে গেলেন হো। পুলিশের হাতে প্রচণ্ড মার খেয়ে আধমরা অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন। সুস্থ হয়ে উঠতে বেশ কিছুদিন কেটে গেল। সকলে ভেবেছিল হোর বিপ্লবী আন্দোলনের মোহ এইবার চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু হো ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। এই অত্যাচার তার বুকের মধ্যে জাড়িয়ে তুলল তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ।
পুরোপুরিভাবে তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। অল্পদিনেই হয়ে উঠলেন বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। ফরাসী শাসকরা নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকে না। তাদের গুপ্তচর বাহিনীর সজাগ দৃষ্টি থাকে সকলের উপর। একটা ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় ধরপাকড়। বেশির ভাগ নেতাই ধরা পড়ে যায়। আত্মগোপন করেন হো চি মিন। কিন্তু তার গোপন আস্তানার কথা অজানা থাকে না। গভীর রাতে বেরিয়ে পড়েন এক আস্তানা থেকে আরেক আস্তানায়। ক্রমশই বুঝতে পারছিলেন এইভাবে বেশি দিন আত্মগোপন করে থাকা সম্ভব নয়।
এই সময় সংবাদ পেলেন একটি বিদেশগামী জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে। জাহাজে কিছু নাবিকের প্রয়োজন। হো স্থির করলেন তিনি ঐ জাহাজে করে পশ্চিমের দেশে পাড়ি দেবেন। এর পেছনে দুটি উদ্দেশ্য ছিল, প্রথমত ফরাসী কর্তৃপক্ষের চোখে ধূলো দেওয়া, দ্বিতীয়ত বিদেশে গিয়ে নিজেকে উন্নত করা। সেই সমস্ত দেশের শিক্ষা সংস্কৃতি শাসন ব্যবস্থা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান লাভ করা।
কয়েকজন বন্ধুর চেষ্টায় নাবিকের চাকরি পেয়ে গেলেন হো। যথাসময়ে জাহাজ ভিয়েনামের বন্দর ছেড়ে রওনা হল ইউরোপের পথে। জীবনে এই প্রথম সংকীর্ণ গণ্ডির সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর জগতের মুখোমুখি হলেন হো।
নাবিকের কঠোর পরিশ্রমসাধ্য জীবনে নিজেকে অভ্যস্ত করে নিলেন। কাজের অবসরে তিনি জাহাজের বিভিন্ন দেশের মানুষের সাথে আরাপ করতেন। তাদের কাছ থেকে শুনতেন তাদের দেশের কথা, সংস্কৃতির কথা, জানতেন তাদের আচার ব্যবহার। জানবার শেখবার একটা তীব্র কৌতূহল ছিল তাঁর।
জাহাজ যখন যে বন্দরে ভিড়ত তিনি সেখানে গিয়ে সব কিছু দেখতেন। অনুভব করতেন স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকবার আনন্দ। নিজের দেশের মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখকষ্টের কথা ভাবতে ভাবতে তার সমস্ত মন বেদনায় ভরে উঠত। ভুলে যেতেন নিজের দুঃখ-কষ্টের কথা।
এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে হো এসে পৌঁছলেন ফ্রান্সে। যে ফরাসীদের প্রতি ছিল তার অন্তরের তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ, ভাগ্যের ফেরে তাঁকে ফ্রান্সে এসেই আশ্রয় নিতে হল।
প্যারিসে এসে প্রত্যক্ষ করলেন এ যেন এক অন্য জাতির দেশে এসেছেন। ভিয়েনামের বুক উপনিবেশ গড়ে তোলা ফরাসীদের সাথে সামান্যতম মিলনেই। সভ্য ভদ্র মার্জিত রুচি সুস্থ সাংস্কৃতির চেতনায় উদ্বুদ্ধ। রুশো, ভলতেয়ারের দেশের মানুষদের দেখে মুগ্ধ হলেন হো।
স্থির করলেন বিপ্লবের জন্মভূমি ফ্রান্সে থেকেই অর্জন করবেন বিপ্লবের মন্ত্র। অজানা অপরিচিত শহর। দুবেলা দুমুঠো খাবার মত সামান্য সংস্থান নেই। মাথা গোঁজবার মত আশ্রয় নেই। ছোট একটা দোকানে কাজ জুটিয়ে নিলেন। কোন দিন খাবার জোটে কোনদিন জোটে না। পাশে ফরাসী পুলিশের নজরে পড়েন তাই কোথাও বেশি দিন থাকেন না। যখন যেখানেই থাকেন সর্বক্ষণ মনে হয় নিপীড়ত স্বদেশবাসীর কথা। কেমন করে পরাধীনতার পাগপাশ ছিন্ন করে জেগে উঠবে স্বাধীন ভিয়েত্নাম, তারই ভাবনায় ব্যাকুল হয়ে থাকে সমস্ত মন।
সেই সময় পরিচয় হল কয়েকজন ফরাসী সমাজতান্ত্রিক নেতার সাথে। ফ্রান্সে তাঁরা সদ্য গড়ে তুলেছিলেন সমাজতান্ত্রিক দল। ইতিমধ্যেই মাকর্সবাদের সাথে পরিচয় ঘটেছিল হো চি মিনের। মার্কসবাদের মহান আদর্শ তাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ফরাসী সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সাথে পরিচিত হয়ে আরো গভীরভাবে পড়াশুনা করতে আরম্ভ করলেন। তাঁদের সকলেরই লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর প্রতিটি দেশ থেকে উপনিবেশবাদ শোষণ বঞ্চনা দূর করা। মানুষে মানুষে সাম্য মৈত্রী গড়ে তোলা।
