সমস্ত বিশ্বের কাছে তিনি বিপ্লবের প্রতীক, আলোকের দূত, ভিয়েত্নামের প্রাণপুরুষ হো চি মিন।
কোন কোন মানুষ জীবনে সংগ্রাম করেন। আবার কারোর গোটা জীবনটাই সগ্রাম। হো চি মিন ছিলেন চিরসংগ্রামী সৈনিক। ১৮ বছর বয়সে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য শুরু হয় তাঁর সংগ্রাম। ৭৯ বছর বয়সে যখন তাঁর জীবন শেষ হল তার প্রাক মুহূর্ত পর্যন্ত সংগ্রাম করে গিয়েছেন আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। যেদিন সেই সংগ্রাম শেষ হল জয়ী হল তার স্বদেশভূমি, সে দিন তিনি তা প্রত্যক্ষ করবার জন্য পৃথিবীতে না থাকলেও, পৃথিবীর মানুষের অন্তরে ধ্রুবতারার মত চিরজীবী হয়ে রইলেন।
১৮৯০ সালের ১৯ মে উত্তর ভিয়েত্নামের নখেআন প্রদেশের এক গ্রামে হো চি মিনের জন্ম। তাঁর পিতৃদত্ত নাম নগুয়েন থান থাট। বাবার নাম নগুয়েন মিন হুয়ে। তাঁরা ছিলেন তিন ভাইবোন। হো ছিলেন সকলের চেয়ে বড়। বাবা ছিলেন এক দরিদ্র চাষী। যখন চাষের কাজ থাকত না, অন্যের জমিতে খেতমজুরের কাজ করতেন। ছেলেবেলা থেকেই দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। শিশু বয়েস থেকেই হো ছিলেন গ্রামের সমবয়সীদের চেয়ে আলাদা। শান্ত ধীর। অন্যেরা যখন খেলা করত, তিনি বাবাকে কাজে সাহায্য করতেন। সারা দিন নানান কাজকর্মে কেটে যেত। রাতের বেলায় মায়ের কাছে শুয়ে গল্প শুনতেন। ছেলেবেলা থেকেই হো-কে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করত বীর মানুষদের গল্পগাথা। হোয়ের শৈশবে মায়ের সান্নিধ্য ছিল সবচেয়ে প্রিয়। সেই সান্নিধ্য বেশিদিন ভোগ করতে পারলেন না হো হো তখন এগারো বছরের বালক।
ছেলের বিমর্ষতা দেখে গ্রামের পাঠশালায় তাঁকে ভর্তি করে দিলেন নগুয়েন। অল্পদিনেই পড়াশুনায় আগ্রহ জন্মে গেল হোয়ের। পাঠশালার প্রাথমিক পাঠ শেষ করলেন।
হো ছিলেন পাঠশালার সেরা ছাত্র। ছেলের এই আগ্রহ দেখে নগুয়েন স্থির করলেন, তাঁকে বড় স্কুলে ভর্তি করে দেবেন।
গ্রামে বড় স্কুল ছিল না। হো ভর্তি হলেন হুয়ে শহরের হাই স্কুলে। এই প্রথম গ্রামের বাইরে এলেন হো। এ তাঁর চেনাজানা পরিবেশ নয়, অন্য জগৎ। এতদিন ছিলেন স্বাধীন। শহরে এসে হো প্রথম উপলব্ধি করলেন তাঁরা পরাধীন। তাদের দেশ শাসন : করছে বিদেশী ফরাসীরা। নিজেদের মাতৃভূমিতেও নিজেদের কোন অধিকার নেই।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরাসী। অন্য শিক্ষকরা ভিয়েন্নামী হলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কিছু বলার অধিকার নেই। স্বেচ্ছাচারীর মত স্কুল চালান প্রধান শিক্ষক। একদিন উঁচু ক্লাসের ছেলেরা স্থির করে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে হবে।
স্কুলে নিয়ম ছিল ক্লাসে প্রধান শিক্ষক ঢুকলেই সকলে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাবে। কিন্তু সেদিন ক্লাসে ঢুকলেন প্রধান শিক্ষক। শুধু ফরাসী ছাত্ররা উঠে দাঁড়াল, একটি ভিয়েনামী ছাত্র ও উঠে দাঁড়াল না। রাগে ফেটে পড়লেন প্রধান শিক্ষক। ভিয়েৎনামীদের এত সাহস তাকে অপমান করে! ক’টাকে স্কুল থেকে বের করে দেবেন। তার আগে জানতে হবে ছাত্ররা কেন তাকে অপমান করল।
একেবারে পেছনে বসেছিলেন হো চি মিন। গাঁয়ের শান্ত শিষ্ট মুখচোরা লাজুক ছেলে। পড়াশুনায় ক্লাসের সেরা। প্রধান শিক্ষকের মনে হল হোর কাছ থেকে আদায় করতে পারবেন আসল সত্য। নিজের ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন কাদের প্ররোচনায় ছাত্ররা তাঁকে অপমান করল।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রাইলেন হো। প্রাণ গেলেও নিজের সহপাঠীদের নাম বলবেন না।
তার নীরবতা দেখে রেগে উঠলেন প্রধান শিক্ষক। আবার জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু আগের মতই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন হো। চিৎকার করে উঠলেন প্রধান শিক্ষক, কেন তোমরা আমাকে অপমান করলে?
এইবার মুখ তুলে তাকালেন হো। অকম্পিতভাবে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, আমরা প্রতিবাদ করেছি কারণ আপনি প্রধান শিক্ষক হয়েও ছাত্রদের মধ্যে বিভেদ করেন। ভিয়েনামী ছাত্রদের সাথে অন্যায় ব্যবহার করেন…।।
হো চি মিন জানতেন এর পরিণাম কি। কিন্তু প্রতিবাদে মুখর হতে তার বুক এতটুকু কাঁপেনি। বেতের ঘায়ে রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত হয়ে প্রথম অনুভব করলেন পরাধীনতার যন্ত্রণা। সেই কিশোর বয়েসেই মনস্থির করলেন পরাধীনতার গ্লানি থেকে দেশকে মুক্ত করার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। কিন্তু তার আগে জানতে হবে দেশের ইতিহাস, বিশ্বের ইতিহাস, মানুষ কেমন করে সংগ্রামের পথে গর্জন করেছে স্বাধীনতা।
ভিয়েনামের ইতিহাস সুপ্রাচীন কালের নয়। ইন্দোচীনের টংকিন, আনাম কোচিন চায়না–এই নিয়ে আজকের উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েত্রাম। গত শতাব্দীর প্রথম দিকে ফরাসী খ্রিস্টান মিশনারীরা ভিয়েত্রামে আসে ধর্মপ্রচারের উদ্দেশে। তখন ম্রাট ছিলেন মিং মাং। সম্রাট ধর্মযাজকদের ভালভাবে গ্রহণ করতে পারেন নি। প্রথমে তিনি তাদের ভিয়েনামে বসবাসের অনুমতি দেননি। কিন্তু যাজকদের আন্তরিক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত বসবাসের অনুমতি দেননি। কিন্তু যাজকদের আন্তরিক অনুরোধে শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট স্থানে বসবাসের অনুমতি দিলেন।
কয়েক বছর নিজেদের মধ্যেই ধর্মচর্চা করে কাটিয়ে দিলেন ফরাসী মিশনারীরা। তারপর ধীরে ধীরে নিজেদের স্বরূপ প্রকাশ পেতে লাগল। শুরু হল সাধারণ ভিয়েত্নামীদের মধ্যে ধর্মপ্রচার। দারিদ্র অনাহারক্লিষ্ট শোষিত বঞ্চিত কিছু পাওয়ার আশায় দলে দলে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করতে আরম্ভ করল। ক্রুদ্ধ হলেন সম্রাট মিংমাং। তাঁর আদেশে সাময়িক ধর্মপ্রচার বন্ধ রাখলেও অল্পদিনের মধ্যেই স্বমূর্তি ধারণ করল তারা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হল উপাসনালয়। নতুন নতুন ধর্মপ্রচারকের দল এসে ভিড় করতে লাগল ভিয়েনামে।
