অস্ত্রোপচারে দিন ঠিক হল। আগের দিন রাতে বা ভয়ঙ্করভাবে কাকুতি মিনতি করতে লাগলেন যে তাকে একটু অর্গান বাজাতে দেওয়া হোক। বাখ-কে নিয়ে ইতিমধ্যেই চার্চের মধ্যে বেশ অশান্তি হচ্ছিল। কাজ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন, অথচ অন্য কোথাও যাওয়ার সংস্থান নেই। অগত্যা চার্চের দয়ায় থাকার জায়গাটুকু অন্তত রয়েছে। ফলে চার্চের হাতে তোলা হয়ে থাকার জন্য খুবই সাবধানে সবার মন জুগিয়েই থাকতে হচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে রাত্রিতে অর্গান বাজিয়ে অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালে যে বাসস্থানটুকু আছে তাও হয়ত চলে যাবে। বাখের কাকুতি মিনতিতে তাই অ্যানা খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেলেন। তাছাড়া পরের দিনই অপারেশন। কে জানে অপারেশনের পরে আবার পড়ে কোন নতুন বিপত্তির উদ্ভব হয়। হয়ত ক্ষতি হতে পারে। ডাক্তাররা সেইরকমই ভয় দেখিয়ে গেছে। অনেক ভেবে চিন্তে অ্যানা শেষমেষ মনস্থির করে ফেললেন। না, তার স্বামী জীবনের শেষ সায়াহ্নে কেবল শুধু একটু অর্গান বাজাতে চেয়েছেন মাত্র, আর কিছু নয়। সেটার ব্যবস্থা তাকে করতেই হবে।
রাত গম্ভীর হল। অ্যানা ধীরে ধীরে বাকে নিয়ে এলেন চার্চের বড় হলঘরে। বিশাল অর্গান সামনে। শিশুর মতন বাখ সেটাকে জড়িয়ে ধরলেন। চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ল। তারপর তিনি বাজাতে লাগলেন। অল্প সময়, খুব অল্পক্ষণ মাত্র। তারপর বাজনা শেষ করে, অ্যানাকে বললেন, ঠিক আছে অ্যানা, এবারে আমি প্রস্তুত।’
ততক্ষণে বাজনা শুনে ছুটতে ছুটতে ছলে এসেছেন চার্চের ডিরেক্টর, কিউরেটর উইনলিক ভয়ংকর চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকেন। এর আগেও অর্গান বাজানোর অপরাধে বারবার অপমানিত হয়েছেন বাখ। আজ যেন সেসবই চুড়ান্ত আকার ধারণ করে। রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে অ্যানা আজ চোরের মতন নিয়ে এসেছেন তার প্রিয় যোহানকে। কাল তার চোখের অপারেশন। কে জানে তার ফল কি হয়। তাই যোহানের শিশুর মতন শেষ আবদার তিনি উপেক্ষা করতে পারেন নি। কিন্তু উইনলিকের প্রত্যেকটি কথায় চার্চ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ধমক মুখ বুজে সহ্য করতে হয় তাকে। তবু তো যোহান একটুক্ষণ হলেও তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে পেরেছেন। শান্ত হয়েছে তার মন। এবারে অপারেশনের জন্য সে প্রস্তুত। চোরের মতন মুখ নীচ করে নিজের ঘরে ফিরে এলেন অ্যানা যোহানকে সঙ্গে নিয়ে। পরের দিন চোখের অপারেশন হল। কিন্তু অপারেশনের পরে সারা শরীরে প্যারালিসিস হয়ে গেল বাখ-এর। দুবছর অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে অবশেষে বাখ মারা গেলেন ২৮ জুলাই ১৭৫০ সালে। অ্যানা মারা গেলেন তারও দশ বছর পরে ২৭শে ফেব্রুয়ারি ১৭৬০ সালে।
বাখ মারা যাওয়ার পর অ্যানাকে চার্চের ঘর ছেড়ে দিতে হয়েছিল। যা কিছু জিনিসপত্র রইল সব বিক্রি করে দিলেন অ্যানা। শুধু বাখের অসংখ্য রচনার পাণ্ডুলিপির স্তূপ তিনি প্রাণে ধরে ফেলে দিতে পারেন নি। চেনা অচেনা, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ছেলেমেয়ে সকলের দরজায় দরজায় তিনি ধন্না দিলেন, নিজের আশ্রয়ের জন্য নয়, শুধু এই পাণ্ডুলিপিগুলো যত্ন করে রাখার জন্য। কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত জঞ্জাল ভেবে সেগুলো রাখতে রাজী হয় না। ততদিনে অ্যানার শেষ বাসস্থানটুকুও চলে গেছে। এখন তিনি ফুটপাথের বাসিন্দা। সেই সময় লিপজিগের এই মাংসের দোকানদারটি, যে বাখ কে এক সময় চিনত গান ভালবাসত একটু আধটু, সে দয়াপরায়ণ হয়ে অ্যানার এই পাণ্ডুলিপির স্তূপ নিজের সেলারে রেখে দিতে সম্মত হল। সেই মাংসের ব্যবসায়ীর দয়াতে, তারই দোকানের পাশের ফুটপাথে কেটে যায় অ্যানার আরও দশ বছর। মাংসের ব্যবসায়ীটিই তাকে যতটুকু সম্ভব খাবার দাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। অবশেষে একদিন অ্যানা ম্যাগডালানা বা–এরও মৃত্যু হয়, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৭৬০ সালে। অ্যানার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাগ্-এর যাবতীয় সঙ্গীত রচনার ওপরেও যাবনিকাপাত ঘটল। সেই যবনিকা আবার উত্তোলিত হয়েছিল তারও প্রায় একশো বছর পরে। ততদিনের লিপজিগের সেই মহান মাংসবিক্রেতা কোয়েলারের মৃত্যু হয়েছে।
কলিপজিগের জিওয়ানড়হাউস অর্কেস্ট্রার কনডাকটার ফেলিক্স মেনডেলেসনের ঠিক ইচ্ছে ছিল না লিপজিগ শহরে আসতে। ইচ্ছে ছিল তার স্বপ্নের শহর বার্লিনের অর্কেস্ট্রাতে কাজ করা। কিন্তু স্যাক্সানির রাজা স্বয়ং তার নাম প্রস্তাব করে পাঠিয়েছেন। যত্ন করে ডেকেছে লিপজিগ অর্কেস্ট্রার বোর্ড অব ট্রাষ্টি। নিয়োগপত্র পেয়ে ফেলিক্স খুব একটা খুশি হয়নি। কোথায় বার্লিন, আর কোথায় লিপজিগ। কিন্তু বউ সিসেল শুনেই কেন যেন মন্তব্য করে বলেছিল যে হয়ত স্বয়ং ঈশ্বরের ইচ্ছে যে ফেলিক্স লিপজিগেই যাক। অগত্যা ফেলিক্স কিছুদিন লিপজিগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তারপর একটা সময়ে সিসেলির কাছে স্বীকার করে, তার নিজেরও মনে হয়েছিল যে ঈশ্বরই হয়ত তাকে জোর করে লিপজিগের দিকে ডেকে নিচ্ছেন। এবং সেটা প্রমাণিতও হল। সেদিন ওরা একসঙ্গে ফিরছিল বাড়িতে, ধূসর সন্ধ্যা নেমে আসছে। ফেলিক্স ক্লান্ত বোধ করছিল। কিন্তু সিসেলের মাংসের দোকানটা ঘুরে যাওয়া দরকার। কয়েকমিনিটের ব্যাপার তাই ফেলিক্স আপত্তি করে না। মাংসের দোকানে তখন ভিড়। কেয়েলারের মাংস লিপজিগে খুবই বিখ্যাত। মুহূর্তের মধ্যে নিঃশব্দে মাংস কাটা হচ্ছে। কাগজ জড়িয়ে খরিদ্দারকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একটা আগে বুঝি মাংস মোড়ানোর কাগজ ফুরিয়ে গেছে। মার্টিন কোয়েলারের বউ ছুটে গেছে বাড়ির ভেতরের চিলে কোঠায় রাখা কাগজের স্তূপ থেকে কিছু কাগজ নিয়ে আসতে। সিসেল দোকানে ঘুরে ঘুরে মাংস পছন্দ করছে। আর ফেলিক্স অলসমনে লক্ষ্য করছিল মার্টিন এর বউয়ের কাণ্ডকারখানা। হঠাৎ যেন ভুত দেখার মতন চমকে উঠল ফেলিক্স মেনডেলেসন। সারা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল ওর। সব রোমকূপগুলো যেন বিস্ফোরিত হয়ে উঠল। বিস্ফোরিত চোখে ফেলিক্সের নজর পড়ল, মার্টিন কোয়েলায়ের বউয়ের নিয়ে আসা নতুন কাগজের পাঁজাটার ওপরে। এমন হলদে হয়ে যাওয়া কাগজের পাজাটার একদম ওপরের কাগজটাতে লেখা রয়েছে “দি প্যাশন অফ আওয়ার লর্ড, অ্যাকর্ডিং টু সেন্ট ম্যাসু–বাই যোহান সেবাস্তিয়ান বাখ।” সময়টা হল ১৮৬০ সাল। বাখ জন্মেছিলেন জার্মানির স্যাক্সনির অঞ্চলের আইসনাখ-এর ১৬৮৫ সালের ২১শে মার্চ। যোহান অ্যারোনিয়াস বাখ আর এলিজাবেথ লামারাহার্ট-এর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তিনি। বাবা ছিলেন আইস বাখ–এর টাউন কনসার্ট-এর যন্ত্রবাদক। বাখের বয়স যখন দশ, তখনই তার মায়ের মৃত্যু হয়, অল্প কিছুদিনের মধ্যে বাবাকেও। সংসারের সব দায়িত্ব পড়ল বড়ভাই যোহান ক্রিস্টোফারের ওপর।
