১৮৪৭ সালের ৩রা মার্চ গ্রাহামবেল জন্মগ্রহণ করেন এডিনবরায়। তিনি জাতিতে স্কট ছিলেন। তার বাবা মেলভিলেবেলও ছিলেন প্রতিভাবান মানুষ। মেলভিলে ফোনেটিক্সে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি এডিনবরা স্কুলে পড়াশুনা করেন ও পরে লন্ডনের ইউনিভারসিটি কলেজে যান। তিনি পরে তাঁর বাবার সঙ্গে কানাডায় যান, যেখানে তিনি মুক ও বধিরদের বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ করেন। পি, এইচ, ডি ডিগ্রী পান জার্মানির উর্জবাগ থেকে।
ছোটবেলায় একটা গল্প তিনি সবাইকেই শোনাতেন। তিনি এডিনবরার এক করাখানায় তার সহপাঠীদের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ছেলেগুলোকে কিছু গমের দানা দিয়ে কারখানার অফিসার বললেন এগুলোর খোসা কালকে ছাড়িয়ে আনবি। বেল বাড়িতে এসে নখ পরিষ্কার করার ব্রাশ দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি খোসা ছাড়িয়ে নিলেন। পরের দিন কারখানার মালিককে এই কথাটা বললেন। মালিক এই কথা শুনে ব্রাশের নীতি অনুসারে এক মেশিন বসালেন। দেখা গেল খুব সহজেই খোসা ছাড়ানো যায়।
মুক ও বধিরদের শিক্ষা দেবার জন্য তিনি একটা বিশেষ ধরনের যন্ত্র তৈরি করেন। যে যন্ত্রটি একই কথা বার বার বলে যাবে, তিনি বধিরদের শিক্ষা দেবার জন্য একটা প্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেছিলেন। বধিরদের শ্রবণশক্তি দান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়েই তিনি টেলিফোন আবিষ্কার করেন। তাছাড়া তিনি ম্যাবেল হাবার্ড নামে একটি বধির মেয়েকে বিয়ে করেন।
১৮৭৫ সালের একটি ঘটনা যা গ্রাহামবেলকে সজাগ করে তোলে। টেলিগ্রাফে অনেকগুলো বার্তা পাঠানো নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এই কাজ করার সাথে বিদ্যুতের সাহায্যে শব্দ পাঠানো নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন, হঠাৎ তারের ভিতর দিয়ে এক স্প্রিংয়ের টংকার ধ্বনি তাকে সচকিত করে তোলে। সেই তখন থেকেই তিনি এই কাজে মেতে উঠেন, বিজ্ঞানে এই বিষয় নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে কিন্তু গ্রাহামবেলই প্রথম টেলিফোনীয় সঠিক নীতি ধরতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন বায়ুর যেমন ঘরত্বের তারতম্য হয়; তেমনি শব্দ উৎপাদনে যদি বিদ্যুৎ প্রবাহের তীব্রতার তারতম্য ঘটাতে পারি তাহলে টেলিগ্রাফে বার্তা পাঠানোর বদলে আমি শব্দধ্বনি পাঠাতে পারি। অনেক চেষ্টা করে তিনি একটা যন্ত্র তৈরি করলেন, যা আজ টেলিফোন নামে খ্যাত হয়েছে।
কিন্তু টেলিফোন আবিষ্কারক কে এই নিয়ে তুমুল হৈ চৈ বাঁধে। কারণ একই আবিষ্কারের জন্য কাজ করছেন তিনজন তাতেই এত গোলমাল, যখন আবিষ্কর্তা নিয়ে এত হৈ চৈ তখন বেল ও তাঁর এক সহকর্মী ওয়াটসন দুইজনে মিলে টেলিফোন যন্ত্র আবিষ্কার নিয়ে ব্যস্ত। ১৮৭৬ সালে ১০ই মার্চ বিকালে রিসিভার লাগানো তারের এক প্রান্ত কানে লাগিয়ে ওয়াটসন ঘরে বসে কাজ করছিলেন। হঠাৎ শুনতে পেলেন গ্রাহামবেলের কণ্ঠস্বর, তিনি আনন্দে ছুটে গেলেন গ্রাহামবেলের কাছে। তাকে জড়িয়ে ধরলেন, একদিন ব্রাজিলের সম্রাট ডন পেদ্রো কানে রিসিভার লাগিয়ে বসে আছেন। অন্য প্রান্ত থেকে গ্রাহামবেল হ্যামলেট থেকে দুটো বিখ্যাত লাইন টেলিফোন আবৃত্তি করলেন–”To be or not to be”…..ম্রাট চেঁচিয়ে বললেন–My God! It speaks! তারপর এর প্রদর্শনীতে এই টেলিফোন দেখানো হল। এই টেলিফোন দেখার ও কথা বলার ভিড় উপচে পড়ল, মানুষের চোখে ও মনে বিস্ময়। এই যন্ত্রে কথা বলা ও শোনা।
টেলিফোন আবিষ্কর্তা কে এ নিয়ে অনেক মামলা চলে। শেষে গ্রাহামবেলই টেলিফোন আবিষ্কারক হিসাবে গণ্য হন। জীবনে অনেক সম্মান পান, তবে তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সুখী ছিলেন না। নিঃসঙ্গ জীবনে খুব কষ্ট পেতেন, নিজের আবিষ্কৃত টেলিফোনটাকে তিনি একসময় ঘৃণা করতেন। বললেন এই জানোয়ারটাকে আমি কখনও ব্যবহার করি না। তাঁর মানসিক যন্ত্রণাই তাঁকে খুব কষ্ট দিত।
১৯২২ সালের ২রা আগস্ট নিজের বাড়িতেই তিনি মারা যান। তাঁর আবিষ্কার টেলিফোন আমাদের প্রতি মুহূর্তেই মনে করিয়ে দেয় বৈজ্ঞানিক গ্রাহামবেলকে।
৫৮. যোহান সেবাস্তিয়ান বাখ (১৬৮৫–১৭৫০)
১৭৬০ সালের লিজিগ শহর। সবার অলক্ষ্যে ফুটপাথের এক ভিখারিনী মারা যাচ্ছেন। ভিখারিনীর মৃত্যু তেমন নতুন কিছু নয়। তাই কারোই দরকার নেই সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার। তবু সেখানে উপস্থিত রয়েছেন দু-একজন। তাদের মধ্যে একজন একসময়ে এই ভিখারিনীর পারিবারিক বন্ধু ছিলেন। পেশায় মাংসবিক্রেতা। এই ভিখারিনী ওর মাংসের দোকানের পাশের ফুটপাথেই বাস করেছেন গত দশ বছর। এই বন্ধুটির দাক্ষিণ্যেই ফুটপাথে আশ্রয় পেয়েছিলেন ভিখারিনীটি। ভিখারিনীটির নাম অ্যানা ম্যাগডালানা বাখ। যোহান সেবাস্তিয়ান বাখ-এর দ্বিতীয় স্ত্রী, তার প্রিয়তমা অ্যানা। ১৭৫০ সালে, ওপরের ঘটনার বছর আরও করুণ। বাহ্ ছিলেন লিপজিগের সেন্ট টমাস চার্চের সংলগ্ন সেন্ট টমাস স্কুলের কয়ার মাস্টার। দীর্ঘকাল সারাদিন পরিশ্রমে করার পর বাতি জ্বালিয়ে রাত্রিবেলায় গান আর স্বরলিপি রচনা করার অভ্যাসের ফলে একটা সময়ে তার চোখের অসুখ হয়েছিল। ডাক্তারদের নিদান ছিল অস্ত্রোপচার করতে হবে চোখে। সেটা ১৭৪৮ সাল, শীতকাল।
চোখের অসুখ হওয়ার পরে লিপজিন শহরের অনামী এই কয়ার মাস্টারটিকে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল। একজন কয়ার মাস্টারের অর্গান বাজানোতে অধিকার নেই। দিনের বেলায় তাই সেই সুযোগ নেই। আবার রাতের বেলাতে অর্গান বাজালে অনেকেরই ঘুমের অসুবিধা হয়। অথচ বাখ-এর জীবনে সুরই ছিল একমাত্র জীবনীশক্তি। ফলে অকল্পনীয় মানসিক কষ্টে তাকে দিন যাপন করতে হচ্ছিল। তখন তার বয়স ৬৫। প্রথমা স্ত্রী নেই। দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যানাই শুধু সর্বক্ষণের সঙ্গিনী। অথচ তার সন্তান সন্ততির সংখ্যা কুড়ি। অবশ্য তাদের মধ্যে দশজন আগেই মারা গেছে। তবু বেঁচে আছে। বাকি দশজন এবং তাদের প্রায় প্রত্যেককে না হলেও কেউ কেউ তো খুবই প্রতিষ্ঠিত। এইরকম এক মানসিক এবং শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যে বাম্ চোখে অস্ত্রোপচার করতে রাজী হতে বাধ্য হলেন তিনি।
