প্রথম জীবনে সঙ্গীতের তালিম তিনি পেয়েছিলেন যোহান পাসলবেলের কাছে। চমৎকার সুরেলা কণ্ঠস্বর ছিল তার। সেই কণ্ঠস্বরের জন্যই মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তিনি চাকরি একটা পেয়ে যান। চাকরিটা নিতে বাধ্য হন সংসারিক কারণে। তবে সঙ্গীতে রচনার শুরু সেই পনেরো বছর বয়স থেকেই। যখন তার বয়স বছর বাইশ তখন বিয়ে করলেন, ১৭০৭ সালে পারিবারিক আত্মীয়া মেরিয়া বারবারাকে। দীর্ঘ তের বছর স্থায়ী হয়েছিল এই বিয়ে। কিন্তু ১৭২০ সালে মেরিয়া বারবারা হঠাৎ মারা যান। বড় অসহায় হয়ে পড়েন বাখ। তখন তার বয়স পঁয়ত্রিশ। শোকে তাপে, সঙ্গীত রচনার সৃষ্টি যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়লেন। মেরিয়া মারা যান ১৭২০ সালে ৭ই জুলাই। বছরখানেক পেরোতেই না পেরোতেই দ্বিতীয়বার বিয়ে না করে থাকতে পারলেন না বাখ। বিয়ে করলেন অ্যানা ম্যাগডালেনাকে ১৭২১ সালে। ইতিমধ্যে বহুবার কর্মক্ষেত্র বদল করতে হয়েছিল তাকে। নানান শহরে চাকরি করার পর অবশেষে লিপজিগে আসেন ১৭২৩ সালে। আর সেখানেই থেকে যান সাতাশ বছর আমৃত্য।
বাখ এমন একটা সময়ে জন্মেছিলেন যখন সঙ্গীতকে সমাজে তেমন সম্মানসূচক পেশা বলে ভাবতেই পারত না কেউ। তার ফলে একদিকে যেমন মানুষ হিসেবে নিজের সম্মান আর অর্থ উপার্জনের জন্য তাকে রুখে দাঁড়াতে হত, তেমনিই আবার সঙ্গীতের সম্মান রক্ষার জন্যও তাকে ক্রমাগত লড়াই চালিয়ে যেতে হত। এই দুটি কাজ একালেও যেমন যেখানে চাকরি কররেছেন, জার্মানির অনেক কটি শহরেই চাকরি করেছেন তিনি, কোথাও তাকে নিয়ে তেমন অসুবিধায় পড়তে হয়নি কর্তৃপক্ষকে। তার কারণ কাজের ব্যাপারে চিরকালই বাখ ছিলেন অত্যন্ত কর্তব্যনিষ্ঠ। খুবই বিনয়ী। আত্মসচেতন তিনি ছিলেন অবশ্যই।
স্পর্শকাতরও কম নন। কিন্তু বৃহত্তর আদর্শ, সৃষ্টিশীল রচনার প্রতি একান্ত আনুগত্য কূপমণ্ডুকতার বেড়াজাল থেকে মুক্ত করেছিল তাকে। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে তার যে অবিসংবাদী স্থান তার উপযুক্ত সবরকম গুণের কোনটারই কম ছিল না তার মধ্যে। হয়ত তার থেকেও বেশি কিছুটা ছিল। সেটা তা রোমান্টিসিজম। কিংবা দুর্দান্ত প্যাশন। জ্ঞানীর বিনয় আর অনুসন্ধান ছিল তার সহজাত। কিন্তু শত বৈরিতার মধ্যে, শত কষ্টের মধ্যেও আপোস করেছেন কদাচিত। আপনভোলা এই সম্মানিত শিল্পী উন্মাদের মতন সঙ্গীত রচনা করেছেন দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর অক্লান্তভাবে। কিন্তু তা নিয়ে প্রচার করার মতন মানসিকতা তার একবারেই ছিল না।
জীবনের সায়াহ্নে অন্ধত্ব ছিল তার অভিশাপ। চার্চ কর্তৃপক্ষ প্রথমেই তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চেয়েছিল তার সঙ্গীত। অর্গান বাজানো তার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার অর্গান। কিন্তু সেই অর্গান থেকে বিছিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি। একথা ঠিকই যে বাখ যখন বেঁচেছিলেন তখন অর্থ এবং ক্ষমতার চূড়ায় আসীন না হলেও তাকে অশ্রদ্ধা করার মতন সাহস এবং ক্ষমতা শুধু অসামাজিক বা সমাজবিরোধী যারা শিল্পরবিরোধী যারা তাদেরই ছিল। অন্য কারও নয়। তবে এক্ষেত্রে ঠিক একজন ধ্রুপদী শিল্পীকে রক্ষা করার যে গুরু দায়িত্ব সমাজের থাকে সেই কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হয়নি। বাখকে অখ্যাত অজ্ঞাত অসুস্থ দরিদ্র হিসেবেই মারা যেতে হয়েছিল। তার স্ত্রীকে ফুটপাথে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। তার সারাজীবনের আমানুষিক পরিশ্রম করে রচিত সঙ্গীতের পাণ্ডুলিপি একজনও নিজের কাছে অন্তত রেখে দিতেও রাজী হয়নি।
যাহোক, তিনশো বছর পরে ভূগোল আর ইতিহাস আর দেশকালের সীমানা পেরিয়ে সারা পৃথিবীতে বাখ যেভাবে গৃহীত হয়েছে, যেভাবে সমাদৃত হয়েছে, সত্যিকথা যে তার এক শতাংশও তিনি তার জীবদ্দশায় পাননি। এখন তাকে সর্বসময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতশিল্পীর মর্যাদা দিতে দ্বিধা করবেন এমন মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। এক গতানুগতিক সঙ্গীতের পরিবেশে বাখ জন্মেছিলেন। সঙ্গীতের ইতিহাস বাখের আগে ছিল এক একঘেঁয়ে ঐতিহ্য। বাখ, সম্যক বিবেচনার, অক্লান্ত পরিশ্রমের সেই স্থিতাবস্থায় বিল্পব এনেছিলেন, ভেঙে দিয়েছিলেন নিয়মের নিগঢ়। পাশ্চাত্য সঙ্গীতে গতি এসেছিল তার পরই। প্রিন্সিপল স্বহন্সি ‘ আর ‘ফর্ম’-এর প্রাচীন ঐতিহ্যের এক অপূর্ব সমন্বয় সাধনের কৃতিত্বে তিনি ছিলেন অসাধারণ।
আর সেই যে তিনশো বছর আগে পরীক্ষা নিরীক্ষার উত্তরের জানলা খুলে দিলেন, সেই পর্ব অনুসৃত হচ্ছে অদ্যাবিধি। নতুন ভাবনাচিন্তাও মিশে যাচ্ছে সেখানে প্রত্যেকদিন।
গান ভালবাসে এমন পরিবারেই জন্মেছিল বাখ। ১৭৩৫ সালে বাখ তার পরিবারের ইতিহাস সংগ্রহ করে একটা খসড়া তৈরি করেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন ‘অরিজিন অফ দি মিউজিক্যাল ফ্যামিলি’। তবে তার পূর্বপুরুষরা সঙ্গীতের জগতে খ্যাতিমান হলেও সঙ্গীত রচনার জগতে পা বাড়াননি কখনও। বাখই প্রথম যিনি সঙ্গীত রচনা করতে অগ্রসর হন। তবে বাখের পূর্বে তার সন্তানদের মধ্যে যেমন উইনহেলস ক্রেডিম্যান, কার্ট ফিলিপ ইম্যান্নায়ন বা যোহান ক্রিষ্টিয়ান সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন তেমনিই তার আগেও তার পূর্বপুরুষদের মধ্যে যোহান ক্রিস্টোফার যোহান মাইকেল আর যোহান লাউইসও খ্যাতি কম পাননি।
