নিজের মতবাদকে আরো জোরালোভাবে যুগান্তকারী গ্রন্থ Interpretation of Dream। পৃথিবীর ইতিহাসে দেখা গিয়েছে মাঝে মাঝে এমন এক একটি বই প্রকাশিত হয়েছে যা মানুষের চিন্তা-ভাবনার জগৎকে ওলটপালট করে দিয়েছে। তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়েছে মানুষের যুগ যুগান্তরের ধ্যান-ধারণা। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন ইনটারপ্রিটিশন অব ড্রিমস (Interpretation of Dreams)। এই বইটিতে প্রকাশ পেয়েছে স্বপ্ন সম্বন্ধে তাঁর বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা, বৈজ্ঞানিক বিচার-বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণের সূত্রেই তিনি বলেছেন মানুষের মনের অবদমিত ও অপরিতৃপ্ত যৌন কামনার কথা।
এতদিন এই স্বপ্ন সম্বন্ধে চিকিৎকদের কোন ধারণাই ছিল না। স্বপ্ন তাদের কাছে ছিল অস্তিত্বহীন এক কল্পনা ফ্রয়েডই যে শুধু তার উপর গুরুত্ব আরোপ করলেন তাই নয়, তিনিই প্রথম মনোরোগের ক্ষেত্রে স্বপ্নের ব্যবহারের সুচিন্তত পথ দেখালেন।
ফ্রয়েডের খ্যাতি ভিয়েনা ছাড়িয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল। তার বিতর্কিত মতবাদ সম্বন্ধে পণ্ডিতেরা আলোচনা শুরু করলেন। নিজের মতবাদকে আরো সুপ্রতিষ্ঠিত করবার জন্য ফ্রয়েড লিখে চললেন একের পর এক বই–”The Psychopathology of ever day life (1904), Wit and its Relation to the Unconscious (1905), The three Contributions to the theory of sexuality (1905), Totem and tabu (1913)”
এই সমস্ত বইগুলোর মধ্যে ঘটেছে তার চিন্তা-ভাবনা মনীষীর পূর্ণ প্রকাশ। ১৯০৯ সালে আমেরিকার ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনঃসমীক্ষণ বিষয়ে বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রণ আসে। আমেরিকাই প্রথম দেশ যারা ধর্মীয় ও মানসিক গোঁড়ামি ত্যাগ করে ফ্রয়েডের মতবাদের সার্থকতা, গভীরতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল। ধীরে ধীরে ফ্রয়েডের মতবাদ বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতরা গ্রহণ করতে থাকেন। ধীরে ধীরে জার্মান ফরাসী চেক ইংরেজদের মধ্যে মুক্ত মনের গবেষকরা উপলব্ধি করতে আরম্ভ করে ফ্রয়েডের চিন্তা ভাবনা।
১৯৩০ সালে তাঁকে ল্যোটে পুরস্কার দেওয়া হয়। ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্রমশই উপলব্ধি করতে পারছিল ফ্রয়েডকে অস্বীকার করার অর্থ প্রকৃত জ্ঞান থেকে নিজেদের বঞ্চিত করা। তাই ১৯৩২ সালে তাঁকে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুরোগ বিদ্যার প্রধান অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত করা হল। ১৯৩৬ সালে ব্রিটেনের রয়াল সোসাইটি তাঁকে বিদেশী সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করল।
১৯৩৩ সালে তার উপর নেমে এল অপ্রত্যাশিত এক বিরাট আঘাত। জার্মানীতে তখন প্রভুত্ব করছেন হিটলার। ইহুদীদের প্রতি তাঁর তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ। ফ্রয়েড ছিলেন ইহুদী। হিটলারের অনুগত বাহিনীর মনে হল ফ্রয়েডের রচনা খ্রিস্টান ধ্যান ধারণার সম্পূর্ণ বিরোধী। তাঁর রচনা সম্বন্ধে বলা হয় “ইহুদী অশ্লীলতার চরম প্রকাশ”। নিষিদ্ধ করা হল তার সমস্ত রচনাবলী। নাৎসী অধিকৃত এলাকায় যেখানে তাঁর যত বই পাওয়া গেল সব দখল করে নেওয়া হল। তাঁর অনুগামীদের যে সব গবেষণাগার ছিল ছিল সব ভেঙে চুরমার করে ফেলা হল।
১৯৩৭ সালে জার্মান বাহিনী অস্ট্রিয়া আক্রমণ করল। হিটলারের ইহুদী বিদ্বেষ তখন প্রবল আকার ধারণ করেছে। ফ্রয়েডের বন্ধুবান্ধব, তার অনুগামীরা তখন তাকে অস্ট্রিয়া ত্যাগ করবার জন্য বারংবার অনুরোধ করতে থাকে।
ফ্রয়েড বিরাশি বছরে পা দিয়েছেন। যে শহরে তিনি কাটিয়েছেন তাঁর শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব বার্ধক্য, সেই ভিয়েনা ত্যাগ করে যেতে মন চাইছিল না।
হিটলারের নাৎসী অস্ট্রিয়া দখল করল। বৃদ্ধ ফ্রয়েডকে গৃহবন্দী করা হল।
তাকে অস্ট্রিয়ার বাইরে নিয়ে আসার জন্য জোর প্রচেষ্টা শুরু হল। নাৎসী নাকয়দের কাছে বারংবার অনুরোধ জানানো হল তাকে মুক্ত করে দেওয়ার জন্য। তার মুক্তিপণ হিসাবে নাৎসী সরকার কুড়ি হাজার পাউন্ড অর্থ দাবী করল। দেশে দেশে আবেদন করা হল। ফ্রয়েডের সাহায্যে এগিয়ে এলেন গ্রীসের রাজকুমারী। তিনি এই অর্থ প্রদান করলেন। ফ্রয়েডকে নিয়ে যাওয়অ হল ইংল্যান্ডে।
বৃদ্ধ অসুস্থ এই জ্ঞানতাপসকে সাদরে বরণ করে নিল ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা। তাঁকে রয়াল সোসাইটির ফেলো হিসাবে নির্বাচিত করা হল। ইংল্যান্ডের সেরা চিকিৎসকরা তার চিকিৎসা আরম্ভ করলেন। কিন্তু পরবাসে এসে মনের সব শক্তিটুকু হারিয়ে ফেললেন ফ্রয়েড। তার দেহ ক্রমশই ভেঙে পড়ছিল। ইংলন্ডে আসবার পনেরো মাস পরে ১৯৩৯ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর লন্ডন শহরে মাহপ্রয়াণ ঘটল এই মহাজ্ঞানীর। তার কয়েকদিন আগে শুরু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
ফ্রয়েড-উদ্ভাসিত তত্ত্বের বাস্তব পরিমার্জনা করে তাকে ব্যাপকভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে প্রথম প্রয়োগ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানীরা। ফ্রয়েড মানুষের সকল কর্মের নিয়ামক হিসাবে যৌনতাবোধের উপর যে গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন তাকে উত্তরকালের বিজ্ঞানীরা পুরোপুরিভাবে স্বীকার করতে পারেননি।
মানব মনের জটিলতাকে পুরোপুরি উন্মাচন করতে না পারলেও তিনিই যে এই পথের অগ্রনায়ক সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাঁর প্রদর্শিত পথ ধরেই মানুষ একদিন হয়ত জটিল জীবন সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পাবে।
৫৭. আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল (১৮৪৭-১৯২২)
টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহামবেলের নাম বিজ্ঞান জগতে এক উজ্জ্বল জ্যোতি। টেলিফোনে প্রথম ধ্বনি ও প্রথম কথা ছিল “Mr. Watgon, come here please. I want you.” এই কথাগুলো বলেছিলেন টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল। আজতো সর্বত্র গ্রাহামবেল রয়েছে। পৃথিবীর সব যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে এই গ্রাহামবেলই। টেলিফোনের মাধ্যমেই মানুষ এক দেশ থেকে আর এক দেশে কথা বলছে।
