আট বছর বয়স পর্যন্ত সিগমুন্ডের বাবাই ছিলেন তাঁর শিক্ষক। যখন তার আট বছর বয়েস, ভিয়েনার স্পার্ল স্কুলে ভর্তি হলেন। প্রথম বছরের পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম হলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা অবধি তিনি কোনদিন দ্বিতীয় হননি। নানান বিষয়ে ছিল তার আগ্রহ- সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, বিজ্ঞান। চোদ্দ বছর বয়সে দার্শনিক জন স্টুয়ার্ড মিলের রচনাবলীর বেশ কিছু অংশ জার্মান ভাষা থেকে অনুবাদ করেন। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে স্কুলের পাঠ শেষ হবার আগেই মনস্থির করলেন। ডাক্তারি পড়বেন। ছেলের এই উচ্চাশা দেখে নিজের প্রতিকূল আর্থিক অবস্থা সত্ত্বেও সিগমুন্ডকে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করে দিলেন জ্যাকব। ১৭ বছর বয়সে ভিয়েনা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হলেন সিগমুন্ড। প্রথম দু বছর চিকিৎসা বিজ্ঞানের কোন শাখা নিয়ে পড়াশুনা করবেন মনস্থির করতে পারেননি সিগমুন্ড। এই সময় সিগমুন্ডের সৎ ভাই ছিলেন ইংল্যাণ্ডে। জ্যাকব তাকে ইংল্যাণ্ড ভ্রমণের জন্য পাঠালেন। ১৮৭৬ সালে ফিরে এলেন ভিয়েনাতে। সেই সময় মেডিকেল শরীরতত্ত্বের অধ্যাপক ছিলেন ব্রুকে। শিক্ষক হিসাবে ব্রুকে ছিলেন খুবই খ্যাতিমান। ব্রুকের শিক্ষক রর্বাট মেয়র ছিলেন ভিয়েনার সর্বশ্রেষ্ঠ শরীরত্ত্ববিদ। তাঁর কিছু মৌলিক আবিষ্কার চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে সাড়া জাগিয়েছিল। সিগমুন্ডেরও ইচ্ছা ছিল শুধুমাত্র একজন চিকিৎসক হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা নয়, রবার্ট মেয়রের মত নতুন কিছু উদ্ভাবন করা।
অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন ব্রুকের সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র। তাঁর গবেষণাগারেই কাটত দিনের বেশিরভাগ সময়। শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে এতখানি মনোযোগী হয়ে উঠেছিলেন, চিকিৎসা শাস্ত্রের অন্য বিষয়ের প্রতি তেমন সময় দিতে পারতেন না। সেই কারণে অন্য সব ছাত্ররা পাঁচ বছরে যে পাঠ্যসূচি শেষ করত, সিগমুন্ডের সেখানে সময় লাগল আট বছর। এই সময়ের মধ্যেই তিনি স্নায়ুতন্ত্রের উপর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লেখেন। এই প্রবন্ধগুলোর মৌলিকতা লক্ষ্য করে শিক্ষকদের সকলেই মুগ্ধ হয়েছিলেন। ১৮৮১ সালে পঁচিশ বছর বয়সে কলেজের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ডক্টর অব মেডিসিন উপাধি পেলেন। তাঁর উত্তরপত্র দেখে শিক্ষকরা তাঁকে কলেজের শ্রেষ্ঠ ছাত্র হিসাবে ঘোষণা করেন।
ছাত্র অবস্থাতেই সিগমুন্ড তার বোনের ননদ মার্থা বার্নেসের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। পাশ করবার পর তিনি বুঝতে পারলেন অর্থ উপার্জন করতে না পারলে মার্থাকে বিবাহ করা সম্ভবপর নয়। তাই ব্রুকের গবেষণাগার ত্যাগ করে ভিয়েনা জেনারেল হাসপাতালে ইনটার্ন হিসাবে যোগ দিলেন। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তার পদে উন্নীত হলেন।
ভিয়েনা হাসপাতালে ছিলেন বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থিওডর মেরারেত। তাঁর অধীনে ফ্রয়েড মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের উপর গবেষণা আরম্ভ করলেন।
তিনি ভিয়েনার হাসপাতালে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে চাকরি নিলেন। কয়েক মাস চাকরি করবার পর তিনি একটা স্কলারশিপ পেয়ে প্যারিসে রওনা হলেন।
কিছুদিন শাকোর অধীনে কাজ করার পর ভিয়েনাতে ফিরে এলেন। মার্থাকে ছেড়ে থাকতে তাঁর সমস্ত মন চঞ্চল হয়ে উঠেছিল। ভিয়েনাতে আসবার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই মার্থাকে বিবাহ করলেন ফ্রয়েড।
অল্পদিনের মধ্যেই চিকিৎসক হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। তার কাছে রোগীর ভিড় লেগেই থাকত। প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে আরম্ভ করলেন ফ্রয়েড
এইবার ভিয়েনার চিকিৎসক সমাজের পক্ষ থেকে প্রবল বাধার সৃষ্টি হল। প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েও সামান্যতম বিচলিত হলেন না ফ্রয়েড। তিনি সমস্ত সংস্থা থেকে পদত্যাগ করে পুরোপুরিভাবে নিজের চিকিৎসা ব্যবসায়ে মনোনিবেশ করলেন। এরই সাথে সাথে তাঁর গবেষণার কাজ চালিয়ে যান।
দীর্ঘ দশ বছর ধরে চলল তার অক্লান্ত গবেষণা। এই সময় ব্রুকের নামে একজন চিকিৎসক এগিয়ে এলেন ফ্রয়েডের সাহায্যে। ইতিপূর্বে ব্রুকের বেশ কিছু রুগীকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। দুজনের সম্মিলিত গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৮৯৫ সালে প্রকাশিত হল “Studies in Hysteria” নামে একখানি বই। এই বইখানি মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। এতেই তিনি প্রথম প্রকাশ করলেন অবচেতন মনই স্নায়ু সংক্রান্ত সমস্ত রোগের মূল কারণ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তিনি এক নতুন ধারণার উদ্ভাবন করলেন, যার নাম দেওয়া হল মনঃসমীক্ষণ (Psychoanalysis)।
ফ্রয়েড বললেন, মানুষের মনের মধ্যে রয়েছে চেতন আর অবচেতন মন। মানুষের শৈশব থেকেই তার মধ্যেকার অহংবোধ বা ইগো কোন কারণে অবদমনের ফলে বহু যৌনকামনা চেতন মন ছেড়ে অবচেতন মনের স্তরে ডুব দেয়। তার থেকেই দেখা দেয়। মনোবিকার। ফ্রয়েডের মতবাদের মূলকথা ইডিপাস কমপ্লেকস্। তিনি বলেছেন শিশুর মধ্যে থাকে যৌনবোধ। এই যৌনবোধই অসুকের মূল কারণ বরে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি আরো বললেন, মানুষ ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে, যদিও ঘুম ভাঙলেই ভুলে যায় সেই স্বপ্নের কথা। কিন্তু স্বপ্ন তার মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতীক। প্রতিটি মানুষের মনের মধ্যেই থাকে বিভিন্ন ইচ্ছা, থাকে কামনা-বাসনা। নানান কারণে সেই কামনা-বাসনা পূর্ণ হয় না। আর এই অপূর্ণ আশা-আকাক্ষার প্রভাব পড়ে মানুষের স্নায়ুর উপর যার ফলশ্রুতিতে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে।
