প্রতিটি বিষয়েই তিনি চেয়েছিলেন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে এবং অনেকাংশে তিনি সফলও হয়েছিলেন। এ যেমন একদিকে তাঁর জীবনের গৌরব, অন্যদিকে ব্যর্থতা। তিনি মানবীয় সীমায়িত শক্তি নিয়ে চেয়েছিলেন ঈশ্বরের মত সীমাহীন হতে। তাই সাফল্যের চূড়ায় উঠেও কখনো তৃপ্তি অনুভব করেননি। মনে হয়েছে তার জীবন এক অসমাপ্ত যাত্রাপথ। যে পথের শেষ তার কাছে অগম্যই রয়ে গেল।
ইতালির রেনেসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ দ্য ভিঞ্চি বিধাতার পরিহাসে এক কুমারী নারীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। (১৪৫২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবার নাম ছিল পিয়েরো এ্যান্টানিও দ্য ভিঞ্চি। পিয়েরো ছিলেন উকিল।
শৈশব থেকেই তাঁর প্রতিভা বিকশিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর জীবীকার লিখেছেন, অঙ্কে তাঁর এত মেধা ছিল যে শিক্ষকরা তাঁকে পড়াত, তারা মাঝে মাঝেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত। লিওনার্দোর অনুসন্ধিৎসা ছিল প্রবল। তাঁর জিজ্ঞাসায় বিরুক্ত হয়ে উঠত শিক্ষকরা। অঙ্ক ছাড়াও সঙ্গীতের প্রতি ছিল তার গভীর আকর্ষণ। বাঁশি বাজাতেন তিনি। পরবর্তীকালে যখন তিনি বাঁশি বাজাতেন, এক স্বর্গীয় সুষমায় ভরে উঠত সমস্ত পরিমণ্ডল। তাঁর কণ্ঠস্বরও ছিল সুমিষ্ট। তার গান শুনে সকলেই মুগ্ধ হত।
সে যুগে চিত্রশিল্পকে কোন সম্মানীয় হিসাবে গণ্য করা হত না। তাছাড়া এতে ছেলের কোন প্রতিভা আছে কিনা সে বিষয়েও পিয়েরো নিশ্চিত ছিলেন না। তাই লিওনার্দো যখন ছবি আঁকা শেখবার অনুরোধ জানাল, সরাসরি তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেন।
লিওনার্দো উপলব্ধি করতে পারলেন, বাবার অনুমতি ছাড়া আঁকা ছবি সম্ভব নয় তাই একটি বুদ্ধি করলেন। একটা বড় কাঠের পাটাতনের উপর গুহায় ছবি আঁকলেন। গুহার মধ্যে আধো আলো আধো ছায়ার এক অপার্থিব পরিবেশ। তার সামনে এক ভয়ঙ্কর ড্রাগনের ছবি, তার মাথায় শিং। চোখ দুটো আগুনের মত জ্বলছে। ভয়ঙ্কর হিংস্র দাঁতগুলো যেন ছুরির ফলা, নাক দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগুনের লেলিহান শিখা।
ছবি আঁকা শেষ হতেই ঘরের মধ্যে ছবিটাকে রেখে সব জানলা বন্ধ করে দিলেন। পিয়েরো কিছুই জানেন না। ঘরে ঢোকামাত্রই সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে বেরিয়ে এলেন। পিয়েরো শান্ত হতেই লিওনার্দো গম্ভীর গলায় বললেন, আমি মনে হয় আমার যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পেরেছি।
এইবার আর ছেলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করলেন না পিয়েরো। তিনি ছবি আঁকবার অনুমতি দিলেন। সেই সময় ফ্লোরেন্সের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী ছিলেন ভেরক্কিয়ো। চিত্রশিক্ষার জন্যে তার স্কুলে গেলেন লিওনার্দো। তখন তাঁর বয়স আঠারো।
লিওনার্দো শুধু ভেরক্কিয়োর কাছে ছবির আঙ্কিক শিক্ষা করেননি, তিনি দু চোখ মেলে দেখতে শিখেছিলেন প্রকৃতির অপরূপ রূপলাবণ্য, তার নিসর্গ শোভা, দেখেছেন নদীস্রোতের মধ্যে জীবনের প্রবাহ। তার সুখ, দুঃখ, ব্যথা-বেদনা শ্রদ্ধার গভীরে দেখেছেন নারীকে। ভেরক্কিয়োর কাছেই লিওনার্দো শিখেছিলেন কেমন করে মানব জীবনের গভীরে ডুব দিয়ে তার অপার রহস্যময়তাকে ফুটিয়ে তুলতে হয় রঙের তুলিতে। এই কারণেই লিওনার্দো ভেরক্কিয়োকেই তাঁর গুরু হিসাবে স্বীকার করেছেন।
দু’বছর শিক্ষানবিশী শেষ করে লিওনার্দো স্থির করলেই নিজেই স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা করবেন। ফ্লোরেন্সে শিল্পীদের একটি সঙ্ ছিল। তিনি তাতে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করলেন।
ছবির পাশাপাশি চলছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার অধ্যয়ন। প্রকৃতপক্ষে তার মধ্যে ঘটেছিল বিজ্ঞানী আর শিল্পীর এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ। তাঁর চিন্তা কল্পনা অভিজ্ঞতার বিস্তৃত বিবরণ লিখে রাখতেন খাতার পাতায়। দেখতে দেখতে দশ বছর ফ্লোরেন্সে কাটিয়ে দিলেন লিওনার্দো। এই সময় তিনি এঁকেছেন বেশ কিছু ছবি–এ্যানোনসেশন, মেরি ও যীশুর দুখানি ছবি, এক রমণীয় প্রতিকৃতি।
ফ্লোরেন্সে থাকাকালীন সময়ে লিওনার্দো যে সমস্ত ছবি এঁকেছেন, তার অধিকাংশই ছিল প্রচলিত শিল্পীরীতির থেকে স্বতন্ত্র। তার এক শিল্পীর স্টুডিওর চার-দেওয়ালের মধ্যে বসেই সব ছবি আকতেন। লিওনার্দোই প্রথম শিল্পী যিনি প্রকৃতির ছবি আঁকবার জন্যে প্রকৃতির কাছে যেতেন। যা প্রত্যক্ষ করতেন তাকেই মানে রঙে রাঙিয়ে রূপ দিতেন। ছবির মধ্যে তিনিই প্রথম শেডের ব্যবহার আরম্ভ করেন।
লিওনার্দো স্থির করলেন, তিনি মিলানে যাবেন। মিলানের অধিপতি ছিলেন লুডোভিকো। ১৪৮২ সালে লিওনার্দো মিলানো এলেন। সেই সময় ফ্লোরেন্সের ডিউকের প্রাসাদে এক সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে লিওনার্দো তাঁর বাঁশি বাজালেন। তাঁর অসাধারণ সঙ্গীত প্রতিভায় মুগ্ধ হলেন ডিউক। তাকে নিজের প্রাসাদে আমন্ত্রণ করলেন। কয়েকদিনের পরিচয়েই ডিউক উপলব্ধি করতে পারলেন কি অসাধারণ প্রতিভাধর পুরুষ এই লিওনার্দো! তিনিই তাকে মিলানের অধিপতি লুডোভিকোর কাছে পত্র লিখতে অনুরোধ করলেন। লিওনার্দো লিখলেন তার সেই বিখ্যাত পত্র। এতে তিনি লিখলেন সামরিক প্রয়োজন ৯টি মৌলিক সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কারের কথা।
মিলানোর অধিপতি আমন্ত্রণ করে নিয়ে এলেন লিওনার্দোকে। প্রথম সাক্ষাতেই মুগ্ধ হলেন লুডোভিকো। লিওনার্দোকে নিজের রাজদরবারের অন্যতম প্রধান সভাসদ করে নিলেন। রাজপ্রাসাদেই তার থাকার আয়োজন করা হল।
