একদিকে যখন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ চলেছে, জেনারেল রোমেল হিটলারের নির্দেশে আফ্রিকায় আরেকটি ফ্রন্ট খুললেন। একসাথে এতগুলো ফ্রন্ট না খেলিবার জন্য অনেকে হিটলাকে পরামর্শ দিলেও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন হিটলার তখন এমনই বিবোর, কারোরই কোন উপদেশ গ্রহণ করলেন না।
ইউরোপ জুড়ে যখন যুদ্ধ, চলছে, এশিয়ার জাপান জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিল। তারা ৭ই ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে আমেরিকার পার্ল হারবার বন্দরের উপর বোমা বর্ষণ করে বিধ্বস্ত করে ফেলল। এই ঘটনায় আমেরিকাও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল।
প্রথম দিকে জার্মান বাহিনী সর্বত্র জয়লাভ করলেও মিত্রশক্তি যখন সম্মিলিতবাবে যুদ্ধ আরম্ভ করল, হিটলারের বাহিনী পিছু হটতে আরম্ভ করল। আফ্রিকায় ইংরেজ সেনাপতি মণ্ট গোমারি রোমেলকে পরাজিত করলেন। এক বছরের মধ্যেই আফ্রিকা থেকে জার্মান বাহিনীকে বিতাড়িত করা হল। ইতালিতে মুসোলিনীকে বন্দী করা হল। ফ্যাসিবিরোধী জনগণ তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় হত্যা করল।
জার্মান বাহিনীর সবচেয়ে বড় পরাজয় হল রাশিয়ার স্টালিনগ্রাদে। দীর্ঘ ছয় মাস যুদ্ধের পর লাল ফৌজের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্যহল জার্মান বাহিনী।
সর্বত্রই যখন পরাজয়, নিজের অহমিকার এতখানি উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন হিটলার, মিত্রশক্তিকে সামান্যতম গুরুত্ত্ব দিতেন না। নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে তার অনেক সেনাপতিই তাকে হত্যা করবার ষড়যন্ত্র করে। দুর্ভাগ্যবশত তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।
হিটলার ক্রমশই সঙ্গীসাথীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকেন। সকলের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। বেশিরভাগ সময়ই বাঙ্কারে থাকতেন। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। এই সময় তার একমাত্র সঙ্গী ছিল প্রেমিকা ইভা ব্রাউন। ইভা হিটলারকে গভীরভাবে ভালবাসতেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও হিটলারকে পরিত্যাগ করেননি।
হিটলার ছিলেন এক বিকৃত মানসিকতার শিকার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন সমস্ত পৃথিবী হবে তার ন্যাৎসী বাহিনীর পদানত। নিজের স্বপ্নকে পূর্ণ করবার জন্য তিনি জার্মান বাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন। নিজে অল্প শিক্ষত হয়েও অনুভব করেছিলেন যুদ্ধে বিজ্ঞানের উপযোগিতা। তাই শুধু সুদক্ষ সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেননি। তার নির্দেশে বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছিল সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র।
অসাধারণ সংগঠন শক্তি, বুদ্ধি, প্রবল ব্যক্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও হিটলারের ধ্বংসের কারণ তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার অহমিকা, রক্তপিপাসু দানবের মত মানবজাতিকে ধ্বংস করবার ইচ্ছা।
১৯৪৪ সালে লাল ফৌজ স্বদেশভূমি থেকে জার্মান বাহিনীকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে একের পর এক অধিকৃত পোলান্ড, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরী, চেকোশ্লোভাকিয়া মুক্ত করতে করতে জার্মান ভূখণ্ডে এসে প্রবেশ করে। অন্যদিকে ইংরেজ আর আমেরিকান সৈন্যরাও জার্মানীর অভিমুখে এগিয়ে চলে।
যতই চারদিক থেকে পরাজয়ের সংবাদ আসতে থাকে, হিটলার উন্মত্তের মত হয়ে ওঠেন। ১৯৪৫ সালের ২৯শে এপ্রিল হিটলারের শেষ ভরসা তার স্টেইনের সৈন্যবাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে যায়। তার অধিকাংশ সঙ্গীই তাকে পরিত্যাগ করে মিত্রপক্ষের কাছে আত্মসমপর্ণের প্রস্তাব পাঠায়।
হিটলার বুঝতে পারেন তার সব স্বপ্ন চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে গিয়েছে। বার্লিনের প্রান্তে রুশ বাহিনীর কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছে। হিটলার তার বারো বছরের সঙ্গিনী ইভাকে বার্লিন ছেড়ে পালিয়ে যাবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইভা তাকে পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। দুজনে সেই দিনই বিয়ে করেন।
বিয়ের পর হিটলার উপস্থিত সঙ্গীদের সাথে একসঙ্গে শ্যাম্পেন পান করলেন। তারপর দুটি চিঠি লিখলেন। একটি চিঠিতে সব কিছুর জন্য ইহুদীদের অভিযুক্ত করলেন। অন্য চিঠিতে নিজের সব সম্পত্তি পার্টিকে দান করে গেলেন।
৩০শে এপ্রিল ১৯৪৫। চারদিকে থেকে বার্লিন অবরোধ করে ফেলে লাল ফৌজ। হিটলার বুঝতে পারেন আর অপেক্ষা করা উচিত নয়। যে কোন মুহূর্তে লাল ফৌজ এসে তাকে বন্ধী করতে পারে। তিনি তার ড্রাইভার ও আরো একজনকে বললেন, মৃত্যুর পর যেন তাদের এমনভাবে পোড়ানো হয়, দেহের কোন অংশ যেন অবশিষ্ট না থাকে।
বিকেল সাড়ে তিনটের সময় তিনি নিজের ঘর থেকে বার হয়ে তার পার্শ্বচরদের সাথে করমর্দন করে নিজের ঘরে ঢুকলেন। তারপরই গুলির শব্দ শোনা গেল। হিটলার নিজের মুখের মধ্যে গুলি করে আত্মহত্যা করলেন। আর ইভা আগেই বিষ খেয়েছেন।
দুজন সৈন্য তাদের কম্বল দিয়ে মুড়ে বাগানে নিয়ে এল। চারদিকে থেকে কামানোর গোলা এসে পড়ছে। সেই অবস্থাতেই মৃতদেহের উপর পেট্রল ঢেকে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল।
যিনি সমস্ত মানবজাতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, নিজের অপরিণামদর্শিতায় শেষ পর্যন্ত নিজেই ধ্বংস হয়ে গেলেন।
৫৪. লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি (১৪৫২-১৫১৯)
মানব সভ্যতার ইতিহাসে যদি পূর্ণ হিসাবে কারো নাম বিবেচনা করতে হয়, তার একটি নাম উচ্চারণ করতে হয়, তিনি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। এমন বহু বিচিত্র প্রতিভার সম্মেলন সম্ভবত অন্য কোন মানুষের মধ্যেই দেখা যায়নি। তিনি চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, অঙ্কশাস্ত্রবিদ, গায়ক, প্রকৃতি বিজ্ঞানী, শরীরতত্ত্ববিদ, সামরিক বিশেষজ্ঞ, আবিষ্কারক, স্টেজ ডিজাইনার দার্শনিক।
