শুরু হল লিওনার্দোর জীবনের আরেক অধ্যায়। দীর্ঘ আঠেরো বছর লিওনার্দো ছিলেন মিলানে উদার হৃদয় লুডোভিকোর সাহচর্যে এখানেই তাঁর প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল।
বহুদিন ধরেই লিওনার্দো কল্পনা করতেন এক আদর্শ শহরের। যে শহর হবে সর্বাঙ্গ সুন্দর, যেখানে মানুষের প্রয়োজনীয় সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকবে। তিনি দুদিকে বিভক্ত। একদিকে মানুষ, যানবাহন যাবে, অন্যদিকে আসবে। শহর হবে ছোট। তাতে ৫০০০ এর বেশি বাড়ি থাকবে না। ছোট ছোট শহর রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ। শহর বড় হলে লোকসংখ্যা বাড়বে। তখন দেখা দেবে নানান সমস্যা। তাছাড়া শহরের সামর্থ্যের তুলনায় মানুষের সংখ্যা বেশি হলে তা হবে খোঁয়াড়ের মত। অস্বাস্থ্যকর অসুবিধাজনক। শহরের কোন নর্দমাই বাইরে হবে না। প্রতিটি নর্দমা হবে মাটির নিচে। সেখান দিয়ে শহরের সব আবর্জনা শহরের বাইরে নদীতে গিয়ে পড়বে।
লিওনার্দোর এই আদর্শ শহরের পরিকল্পনা সর্বযুগে সর্বকালেই প্রযোজ্য। কিন্তু ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লুডোভিকো লিওনার্দোর এই পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি।
এরপর লিওনার্দো তৈরি করলেন নগরের ক্যাথিড্রালের এক সম্পূর্ণ নক্সা। এই সব কাজের অবসরে তিনি চর্চা করতেন জ্যামিতি, জ্যোতির্বিদ্যা, অঙ্ক এবং এই সব ক্ষেত্রে বহু মৌলিক চিন্তার প্রকাশ ঘটেছিল।
এই সব বৈজ্ঞানিক কাজকর্মের মধ্যেই তিনি পরিকল্পনা করছিলেন লুডোভিকের স্বর্গগত পিতার এক মূর্তি স্থাপন করবার। সমস্ত পরিকল্পনা সমাপ্ত করবার পর তিনি শুরু করলেন সেই অভূতপূর্ব বিশাল মূর্তি। উচ্চতায় ২৬ ফুট। একটি ঘোড়ার উপর বসে আছেন স্বর্গত রাজা। মূর্তিটি তৈরি করতে সময় লেগেছিল আট বছর। এই সময় তিনি ম্যাডোনা নামে একটি ছবিও আঁকেন।
এইবার তাকে নতুন একটা কাজের ভার দিলেন লুডোভিকো। যীশুর জীবনের কোন বিষয় নিয়ে ছবির আঁকতে হবে।
শুরু হল লিওনার্দোর ভাবনা। কি ছবি আঁকবেন? দীর্ঘ ভাবনার পর স্থির করলেন যীশুর শেষ ভোজের ছবি আঁকবেন–The last supper
চিত্রশিল্পের জগতে লাস্ট সাপার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ছবি। “যীশু তার বারোজন শিষ্যকে নিয়ে শেষ ভোজে বসেছেন। তার দু পাশে ছয়জন ছয়জন করে শিষ্য। সামনে প্রশস্ত টেবিল। পেছনে জানলা দিয়ে মৃদু আলো এসে পড়েছে। যীশু বলেছেন তোমাদের মধ্যে কেউ একজন বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে ধরিয়ে দেবে। শিষ্যরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তারা সকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে তাদের মধ্যে কে বিশ্বাসঘাতকতা করবে।”
ছবিটি সান্তামারিয়া কনভেন্টের এক দেওয়ালে আঁকা হয়েছিল। দি লাস্ট সাপার লিওনার্দোর এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। সমালোচকদের মতে এখানে লিওনার্দোর মানসিকতা, তার ভাবনা কল্পনার সাথে মিলিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি। লাস্ট সাপার। শুধু যে একখানি সর্বশ্রেষ্ঠ চিত্র তাই নয়, মানুষের শিল্প প্রতিভা যে কোন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছতে পারে এ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
প্রথমে তিনি এঁকেছিলেন যীশুর বারোজন শিষ্যর মুখ। এই শিষ্যদের মুখে ফুটে উঠেছিল বিচিত্র অনুভূতি। কারো মুখে বিস্ময়, কারো মুখ ভয়, কারো বেদনা সন্দেহ। এক আশ্চর্য সুষমায় প্রতিটি মুখ জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। পরিশেষে তিনি আঁকলেন যীশুর মুখ। শোনা যায় কেমন হবে যীশুর মুখ, দীর্ঘ এক বছর তা স্থির করতে পারেননি। অবশেষে আঁকলেন যীশুর মুখ। এ মুখে ভয় নেই, ঘৃণা নেই, উদ্বেগ নেই। তিনি তো জানতেন তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হবে। তাঁর কাজ সমাপ্ত হয়েছে। ঈশ্বরের ইচ্ছায় এইবার তাকে মর্ত্যজগৎ ত্যাগ করতে হবে। ঈশ্বরের ইচ্ছাকে তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন। অনুভূতিহীন এক স্বর্গীয় ভাব ফুটে উঠেছে তাঁর মুখে।
লাস্ট সাপার ছাড়াও আরো দুটি তৈলচিত্র এঁকেছিলেন লিওনার্দো। ভার্জিন অব দি রকস ও মেসিলিয়া।
১৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফারাসী সম্রাট মিলান আক্রমণ করলেন। তিনি মিলান ত্যাগ করে পালিয়ে এলেন ভেনিসে। ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে মিস্টান সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয়ে ফারসী অধিকারে চলে গেল।
লিওনার্দো আশা করেছিলেন যুদ্ধ মিটে গেলেন আবার মিলানে ফিরে যাবেন। কিন্তু যখন সেই আশা পূর্ণ হল না, তিনি ভেনিস ত্যাগ করে রওনা হলেন মাতৃভূমি ফ্লোরেন্সের দিকে।
এই সময় সীজার বর্জিয়ার অনুরোধে মধ্য ইতালির বিস্তৃত অঞ্চল পরিদর্শন করে ছটি ম্যাপ তৈরি করেন। সেই ম্যাপগুলো আজও উইন্ডসর লাইব্রেরিতে রক্ষিত আছে। সেগুলো দেখলে অনুমান করা যায় কি নির্ভুল ছিল তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং মানচিত্র অঙ্কন করবার সহজাত দক্ষতা।
ইতিপূর্বে তিনি একটি ছবি এঁকেছিলেন-ভার্জিন অব দি রকস। ঝুলে পড়া এক পর্বত। তার মধ্যে ফুটে উঠেছে চিরন্তন মানব আত্মার এক রূপ।
এই সময় লিওনার্দো আঁকলেন তাঁর জগৎ বিখ্যাত মোনালিসা। এই ছবিটি আঁকতে তার তিন বছর সময় লেগেছিল।
কে এই মোনালিসা এ বিষয়ে ভিন্নমত আছে। কয়েকজনের অভিমত মোনালিসার প্রকৃত নাম ছিল লিজা। তিনি ছিলেন ফ্লোরেন্সের এক অভিজাত ব্যক্তির স্ত্রী। ভিন্ন মত অনুসারে মোনালিসা ছিলেন জিয়োকোন্ত নামে এক ধনী বৃদ্ধের তৃতীয় পত্নী। নাম মাদোনা এলিজাবেথ। দিনের পর দিন অসংখ্য ভঙ্গিতে মুখের দিকে ছবি এঁকেছেন। কিন্তু কোন ছবিই তার মনকে ভরিয়ে তুলতে পারেনি। একদিন লিওনার্দোর চোখে পড়ল এলিজাবেথের ঠোঁটের কোণায় ফুটে উঠেছে বিচিত্র এক হাসি। চমকে উঠলেন লিওনার্দো। এই হাসির জন্যেই যেন তিনি তিন বছর অপেক্ষা করেছিলেন। মুহূর্তে তুলির টানে ফুটিয়ে তুললেন সেই সহস্যমণ্ডিত কালজয়ী হাসি।
