ইতালির সর্বাধিনায়ক ছিলেন মুসোলিনী। একদিকে ইতালির ফ্যাসীবাদী শক্তি অন্যদিকে ন্যাৎসী জার্মানি। বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। ইতালি প্রথমে আলবেনিয়া ও পরে ইথিওপিয়ার বেশ কিছু অংশ দখল করে নেয়।
অবশেষে হিটলার পোলান্ডের কাছে ডানজিগ ও পোলিশ করিডর দাবি করলেন। যাতে এই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারেন। পোলান্ডের সরকার তার এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন। পোলান্ডের ধারণা ছিল হিটলার তার দেশ আক্রমণ করলে ইউরোপের অন্য সব শক্তি তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। তাদের সম্মিলিত শক্তির সামনে জার্মান বাহিনী পরাজিত হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় কারণ জার্মানির সামরিক শক্তি সম্বন্ধে ইউরোপের অন্য সব দেশের সঠিক ধারণার অভাব। আর একটি বড় কারণ ইংল্যন্ডে ও ফ্রান্স প্রথম পর্যায়ে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হিটলার ও মুসোলিনীর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়নি। তাছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিনের ধারণা ছিল হিটলারের ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাছাড়া সেই সময় ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে জার্মানির চেয়ে বড় শত্রু ছিল কমিউনিস্ট রাশিয়া। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে জার্মানরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাই যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত শর্ত ভঙ্গ করে জার্মানরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছিল তখন ইংল্যান্ড ফ্রান্স কেউ তাদের বাধা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। উপরন্তু হিটলারকে নানান সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এই সুবিধাবাদী নীতির সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলেন হিটলার। বিশ্বজয়ের স্বপ্নে মত্ত হয়ে ১লা সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মান বাহিনী পোলান্ড আক্রমণ করল। এবং এই দিনটি থেকেই শুরু হল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
মাত্র পনেরো দিনে জার্মান বাহিনী পোলান্ডের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পোলান্ড অধিকার করল। তারপর শুরু হল জার্মান বাহিনীর অগ্রগমন। পোলান্ডের পর হিটলার দখল করলেন নরওয়ে ও ডেনমার্ক। নরওয়েতে বিরাট সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য অবস্থান করছিল। তাদের অধিকাংশই নিহত হল। এই ঘটনায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন পদত্যাগ করলেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন চার্চিল।
এইবার হিটলার দৃষ্টি ফেরালে ফ্রান্সের দিকে। ফ্রান্স ইউরোপের সর্বপ্রধান শক্তি। ফ্রান্স নিজেদের সুরক্ষার জন্য জার্মান সীমান্তের দুর্ভেদ্য বৃহ্য সৃষ্টি করেছিল। যাকে বলা হত ম্যাজিনো বেলজিলাম আক্রমণ করে সেই দেশের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সের সীমান্ত প্রদেশে গিয়ে উপস্থিত হল। সেদায় তুমুল যুদ্ধের পর ফরাসী বাহিনী পরাজিত হল।
ফরাসীদের এই বিপর্যয়ে সুবিধা নেওয়ার জন্য ইতালি নিজেকে জার্মানদের মিত্রপক্ষ হিসাবে ঘোষণা করে যুদ্ধে যোগ দিল। সমস্ত ইউরোপ আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আগুন।
ইতালির রাষ্ট্রপ্রধান মুসোলিনী উত্তর আফ্রিকা অধিকার করবার জন্য বিরাট সৈন্যদল পাঠালেন। অন্যদিকে হিটলার ফ্রান্স অধিকার করবার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। হিটলার অনুগত ফ্যাসিস্ট শক্তি নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে মার্শাল পেত্যাকে নিযুক্ত করল। মার্শাল বিনাযুদ্ধেই হিটলারের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।
ফ্রান্স জয়ের পর জার্মানি যুগোস্লাভিয়া আর গ্রীস দেশ অধিকার করল। ইতিমধ্যে রুমানিয়া বুলগেরিয়া ও হাঙ্গেরী জার্মানির পক্ষে যোগ দিল। এর ফলে সমগ্র দক্ষিণ ইউরোপ জার্মানির নিয়ন্ত্রণে এসে গেল।
একদিকে যখন জার্মান বাহিনী বীরদর্পে একের পর এক দেশ অধিকার করে এগিয়ে চলেছে, দেশের অভ্যন্তরে হিটলার শুরু করেছেন নারকীয় ইহুদী নিধন যজ্ঞ। পৃথিবীর ইতিহাসে এই নৃশংসতার কোন তুলনা নেই। হিটলার চেয়েছিলেন জার্মানি থেকে ইহুদীদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে। হাজার হাজার ইহুদীকে বন্দী করা হল। তাদের বলা হত তোমাদের জার্মানি বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাদের গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হত জনবসতিহীন সীমান্ত অঞ্চলে। এখানে তাদের জন্য অস্থায়ী বন্দীনিবাস তৈরি করা হয়েছিল। তাকে বলা হত ঘেট্টো। এখানে কোন খাবার ছিল না, পানি ছিল না, তার উপরে ছিল হিটলারের বাহিনীর নির্মম অত্যাচার। অল্পদিনের মধ্যেই বেশিরভাগ মানুষই মারা পড়ত। যারা বেঁচে থাকত তাদের গুলি করে হত্যা করা হত। ন্যাৎসী বাহিনীর হাতে নারী শিশু বৃদ্ধ কারো নিস্তার ছিল না।
হাজার হাজার ইহুদীকে হত্যা করতে যে বিরাট পরিমাণ গুলি খরচ হত তাতে জার্মান কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হয়ে পড়ল। হিটলারের আদেশে তৈরি হল গ্যাস চেম্বার। একটা বড় ঘর। চারদিক বন্ধ। একসাথে দুশো জনকে সেই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে কার্বনমনোক্সাইড গ্যাস ছাড়া হত। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই বিষাক্ত গ্যাসে মারা পড়ত সবাই। তাদের মৃতদেহগুলো সীমান্ত অঞ্চলে বিরাট বিরাট গর্তে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হত। তিন বছরে হিটলার প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করেছিলেন। ইহুদীদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ আর ঘৃণাই তাকে এই হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করেছিল।
ফ্রান্সের পতনের পর ১৯৪১ সালের ২২শে জুন সমস্ত চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করলেন। হিটলার ভেবেছিলেন রাশিয়া অধিকার করতে পারলে সমগ্র ইউরোপ তার পদানত হবে। নেপোলিয়নের মত রাশিয়া আক্রমণ হিটলারে জীবনের সবচেয়ে বড় ভ্রান্তি। রুশ বাহিনী এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। জার্মানরা প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে চলে মস্কোর দিকে। রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অধিকার করলেও শীত আসতেই বিপর্যন্ত হয়ে পড়ল জার্মানরা। তারা পিছু হটতে আরম্ভ করল। এই সুযোগে রুশ গেরিলা বাহিনী আঘাত হানতে থাকে। শীত শেষ হতেই জার্মানরা নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলে। রাশিয়ার দক্ষিণে ককেশাস তৈলক্ষেত্র সহ বহু অঞ্চল দখল করে নেয়। তারা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর প্রান্তে এসে পৌঁছায় কিন্তু রুশ বাহিনী মরণপণ সংগ্রাম করে জার্মানদের পরাজিত করে।
