সারা সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রে স্টেট ফার্ম আর জোত খামার, কৃষি ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেন।
সোভিয়েট রাশিয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায় জোত খামারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সারাদেশে শিল্পবিপ্লব পরিচালিত হতে থাকে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে। সাক্ষরতা অভিযান নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে গ্রামীণ জীবনকে কয়েক দশকের মধ্যেই আধুনিক জীবনের স্বাদ এনে দেয়। স্টালিনের সাফল্যের সাথে সাথে তার হঠকারী দ্রুত সপ্তবার্ষিক পরিকল্পনার রূপায়ণ অনেক সময়ই অগ্রগতির গতির চাকায় বুমেরাং হিসাবে সোভিয়েট অর্থনীতিকে পশ্চাৎম্মুখী করেছে বার বার। তবে সামগ্রিকভাবে দেশ এগিয়ে গিয়েছে। পার্টির অগণতান্ত্রিক সৈরাচারী শাসন নিশ্চয় সাম্যবাদের সফল রূপায়ণে অনেক সময় বাধা। কিন্তু তা সত্ত্বেও বহু ভাষাভাষী, বহু ধর্মমতে বিশ্বাসী নিত্য নৈমিত্তিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ভৌগোলিক ভাবে ক্লিষ্ট সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রে স্টালিনের নেতৃত্বে যে বিরাট সমাজিক, অর্থনৈতিক পরিবর্তন সূচিত হয় তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। আর এই প্রশংসার প্রধান দাবীদার নিশ্চয় বহু নিন্দিত, বহু বন্দিত জোসেফ স্টালিন। স্টালিনের দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যালিনিভা স্টালিনের থেকে বয়সে অনেক ছোট হলেও জ্ঞানবুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনায় কম ছিলেন না, কিন্তু একদা ভর্শেলভের বাড়িতে তিনিও একসময় প্রকাশ্যভাবে রুশপার্টির কঠোরতা, নিষ্ঠুরতা ও হৃদয়হীনতার তীব্র সমালোচনা করেন স্টালিনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে। তবে শোনা যায় যে এরপর তারও মৃত্যু ঘণ্টা বিলম্বিত হয়নি। এছাড়া লেনিনের জীবকালেই স্টালিনের একগুয়েমি, একরোখা স্বভাবের জন্য স্টালিন সম্বন্ধে লেনিন সকলকে সচেতন করতেন বলে শোনা যায়। এধারে মহাযুদ্ধের রণদামামা যখন মধ্য ইউরোপে হিটলারের গর্বোদ্ধত সামরিক কর্তৃত্ব বেজে উঠে তখন স্টালিন অভ্যন্তরীণ বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অধিক মনোযোগী হন। স্টালিন নির্দেশিত পার্টি আস্তে আস্তে হিটলারের যুদ্ধের হুমকিতে চমকিত হয়ে উঠে। ফলে অভ্যন্তরীণ শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে ত্রিশের দশকের শেষের দিকে স্টালিন জাতীয় নিরাপত্তায় অধিক মনোনিবেশ করেন এবং যুদ্ধ উন্মাদ হিটলারকে সুচতুর স্টালিন ধনতান্ত্রিক সাম্রাজ্যবাদী ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেন। ফলে শীঘ্রই স্টালিন গোপনে হিটলারে সাথে অনাক্রমণ চুক্তি সম্পন্ন করে। হিটলারের আক্রমণের সুযোগ স্টালিন সোভিয়েট রাশিয়ার প্রভাব প্রতিপত্তি উত্তরে ফিনল্যান্ড ও পূর্বে পোল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্ব মুহূর্তে ত্রিশের দশকে স্টালিনের নির্দেশে সুদৃঢ় সোভিয়েট কমিউনিস্ট পার্টিতে ও রেড আর্মিতে কারণে অকারণে প্রতিবিপ্লবী প্রবণতার বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে স্টালিন নির্দেশে হজার হাজার নিষ্ঠাবান সৈনিক ও পার্টি কর্মী রাষ্ট্রের হাতে নিহত হয়। ফলে রুশ দেশের সম্বন্ধে পাশ্চাত্য জগতে হিটলারকে রোখবার ক্ষমতার সম্বন্ধে সংশয় দেখা যায়। হিটলার নিজেও রুশ পার্টি ও সামরিক বাহিনী সম্বন্ধে হীন মনোভাব পোষণ করেন। কারণ ত্রিশের দশকের শেষ দিকে প্রায়শই কারণে অকারণে সোভিয়েট দেশে হাজার হাজার মানুষকে নিয়তি তাড়িত সাইবেরিয়ার কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে দাস শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে পাঠান হত। গণতান্ত্রিক বিচার ব্যবস্থার প্রবর্তন তখন সোভিয়েট রাশিয়ার দূরঅস্ত। ফলে সাধারণ মানুষ ছাড়াও সামরিক নেতৃত্ব, সংস্কৃতিক জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এমনকি পার্টির বিশ্বস্ত খ্যাতনামা ব্যক্তিত্বও নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে ত্রিশের দশকে কিছু অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও দেশ সামগ্রিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে হিটলার যখন রাশিয়াকে আক্রমণ করে তখন রেড আর্মি কেবল পিছু হটতে থাকে। না। স্টালিন ও হিটলার উভয়েই জাতি গঠনে জাতীয় চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরাজিত জার্মানির অভিমানী জার্মান মানুষকে ভালভাবে অনুভব করে, হিটলার আস্তে আস্তে জার্মানিতে সর্বময় ক্ষমতা দখল করেন। আর সোভিয়েট রাশিয়ায় স্টালিন সোভিয়েট কমিউনিস্ট পার্টিকে বিশ্বের বৃহত্তম ভৌগোলিক পরিধিযুক্ত একটি রাষ্ট্রে সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুসংহত করেন। তবে জার্মানির পরাজয়ের পর জার্মানিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে দেখা যায় জার্মান মনন ও মানস হিটলারের ইহুদি হত্যা, গণহত্যা, গণতন্ত্র হত্যাকে ক্ষমা করেনি।
কিন্তু স্টালিন সোভিয়েট রাশিয়া নিষ্ঠুরতায়, নরহত্যায় ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কণ্ঠ রোধে কোন অংশে হিটলারের থেকে কক্ষ দক্ষ ছিলেন না। সোভিয়েট শাসনে যে পরিমাণ নিষ্ঠাবান কমিউনিস্ট স্টালিনের আমলেও নিহত হন জারের আমলে তার ঠিক দশমাংশও নিহত হয়েছেন কিনা সন্দেহ।
লক্ষ লক্ষ মানুষের উপর স্টালিন জামানায় যে জের জবরদস্তি ও বিবর্তনমূলক আটক আইনে গ্রেপ্তার তা নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। সোভিয়েট দেশে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠা সফল হয়নি। কিন্তু ডিক্টেটরশিপ অব দ্য প্রলেটারিয়েৎ কথার অন্তরালে যে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা স্টালিন ভোগ করেছেন তা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। তার নির্যাতনের হাত থেকে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রথমশ্রেণীর আদর্শবাদী নেতৃবর্গ থেকে সামরিক বাহিনীর সৎসাহসী সেনানীকূল কেউই বাদ যাননি। সাইবেরিয়ার কনসেনট্রেশন ক্যাপম্পগুলো লক্ষ লক্ষ দাস বন্দী শ্রমিকের কাতরানির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে থেকেছে। স্টালিনের আমলে সোভিয়েট উৎপাদন ব্যবস্থায় দাস শ্রম ব্যবস্থা প্রায় প্রাচীন গ্রীসের দাসশ্রম ব্যবস্থার সমমর্যাদায় ভূষিত হয়। আব্রাহাম লিঙ্কন, স্টানলিলিভিংষ্টোন থেকে আরম্ভ করে হাজার হাজার পাশ্চাত্যের বুদ্ধিজীবি ও খ্রিস্টিয় মিশনারীগণ উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকেই যে দাস-শ্রম ব্যবস্থা ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়ায় ও আমেরিকায় নিষিদ্ধ করেন। স্টালিনের
