স্টালিন কথার অর্থ লৌহমানব। অর্থাৎ লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েট লৌহমানব। অর্থাৎ লেনিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েট দেশে যে লৌহ যবনিকার বাতাবরণ রুশ জীবনকে আচ্ছন্ন করে তা লেনিনের নামকরণের সার্থকতায় আভাষিক। স্টালিন জন্মেছেন ককেসাশ পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম রাজ্য জর্জিয়ায়। জর্জিয়ায় ক্ষুদ্র গোরী শহরে এক সাধারণ সার্ফ অর্থাৎ দাসচাষী পরিবারের চর্মকারের পুত্র। জর্জিয়ান মায়ের নাম একাতেরিয়া। জন্মলগ্ন থেকে জোসেকের শরীর মজবুত ছিল। বাল্যে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়েও জোসেফ জীবনী শক্তিতে স্বাস্থ্যজ্জ্বোল ছিল। জোসেফের পিতা বিসসারিক্ত রাগী, মাতাল প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। ফলে দশ বৎসর বয়সে পিতৃহারা জোসেফ স্টালিন মায়ের ও অনাদারে বেড়ে ওঠেন। বহু সফল মহানায়কের ন্যায় জোসেফ স্টালিন তাঁর মায়ের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন আবাল্য। ব্যক্তিগতভাবে বাল্যকাল থেকে কঠোর মাতৃশাসনে ও অনুশাসনে পাদ্রী না হয়ে বিপ্লবী হলেন। জোসেফের ছেলেকে জার্জিয়ার রাজধানী টিলিসের সেরা বিদ্যালয়ে পড়তে পাঠান। চরিত্র গঠন থেকে পঠন পাঠন সকল বিষয়েই বাল্যে মার প্রভাবে জোসেফ একটু ভিন্ন ধাতুতে গড়ে উঠতে থাকে। ফলে মার স্নেহচ্ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে যখন জোসেফ বিপ্লবী দলে সর্বক্ষণের কর্মী হলে তখন তিনি পুরোহিতের নিষ্ঠায় তার বিপ্লবী কর্ম পরিচালনা করতে থাকেন।
জোসেফ স্টানিল পরবর্তীকালে যে লেনিনের দ্বারাও কখন কখনও কিছুটা কম কঠোর হতে আদিষ্ট হন তা সম্ভবতঃ তাঁর মায়ের কঠোর শাসনে গড়ে উঠা নৈষ্ঠিক ও নিষ্ঠুর চারিত্রিক গুণের জন্যই। স্টালিন দৃঢ়চেতা, স্টালিন একগুয়ে, স্টালিন বাস্তববাদী, স্টালিন জাতীয়তাবাদী এই সকল নানা অভিধায় তিনি ভূষিত। তবে স্টালিন লেনিনের মৃত্যুর পর পরই, অত্যন্ত দ্রুততায় সরা সোভিয়েট রাশিয়ায় সে ব্যাপক শিল্পায়ন, বৈদ্যুতিকরণ ও স্বাক্ষরতা অভিযান চালান তা নিঃসন্দেহে লেনিনের উত্তরসূরী হিসাবে, উত্তরাধিকারী হিসাবে তাকে স্মরণীয় করে তাঁর জীবনকালেই। স্টালিন চরম নিষ্ঠুরতায় প্রতিবিপ্লবী চক্রকে নির্মূল করেন। কিন্তু এই প্রতি বিপ্লবী চক্র নিধনের সাথে সাথে আস্তে আস্তে রুশ কমিউনিস্ট পার্টিতে। গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক চেতনার বদলে পার্টি কর্তৃত্ব, পার্টির সর্বময় ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামরিক বিভাগ সকল বিষয়েই পার্টি তার সর্বাত্মক ও সর্বময় প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। পার্টির ভিতরে গণতান্ত্রিক চেতনার বদলে বুরোক্র্যাটিক চেতন অধিক ক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। সর্বহারা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্টালিন ১৯২৯ সালে পঞ্চদশ বর্ষে উপনীত হলে দেখা যায় তিনি রাজনৈতিক ভাবে সোভিয়েট রাশিয়ায় গণতন্ত্রের বদলে পাটিতন্ত্র গড়ে তুলেছেন। ট্রটস্কি, প্লাখনভ, ক্যামেনেভ, জেনোভেব সকলেই অন্তর্হিত, নিহত। এই সকল তাত্ত্বিক মহাপন্ডিত বিশ্ববিপ্লবীগণ লেনিনের মৃত্যুর স্বল্পকালের মধ্যে আস্তে আস্তে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন। কমিউনিষ্ট পার্টি স্টালিনের মোহময় বাস্তবানুগ নীতিগুলো অধিক সমাদরে গ্রহণ করল। বিশ্ববিপ্লবের বদলে রুশ বিপ্লবের সফল রূপান্তর রুশ কমিউনিস্ট পার্টির কাছে অধিক বুদ্ধিগ্রাহ্য মনে হল। ফলে সাম্যবাদী বিপ্লবের আন্তর্জাতিক চেতনায় ছেদ পড়ল। রুশ জাতীয়তাবাদী সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদের পথে সোভিয়েট রাশিয়ার পদযাত্রা বিশ্বকমিউনিস্ট আন্দোলনে এক বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করল। কিন্তু স্টালিনের নেতৃতে বিশ্বাসী রুশজনগণ শক্তিশালী লালদূর্গ হিসাবে সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রকে বিশ্ববিপ্লবের পরিপূরক হিসাবে গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর হল। রুশসাম্রাজ্যের দূরতম প্রান্তেও সোভিয়েট শাসন প্রতিষ্ঠিত হল। অনেক ক্ষেত্রে বলপ্রয়োগ করেই তা সমাধা করা হল। বিশেষকরে এশিয়াটিক রাজ্যগুলোতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বিশেষ কঠোরতা প্রয়োজন হল। রাশিয়ায় ধর্মান্ধ অর্থভোক্সচার্চ এবং এশিয়ায় মুসলমান উলেমাগণ মরনপণ লড়াই করে পরাস্ত লেন স্টালিনিয় নিষ্ঠুরতার কাছে। এছাড়া সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী চেতনাও জারের সাম্রাজ্যের দূরপ্রান্ত তাজাকিস্থান, কাজাকিস্তান, কির্গিজিয়া, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া প্রভৃতি অঞ্চলেও কমবেশি কিছু গড়ে উঠেছিল। স্টালিন নিজেও মস্কো থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে জর্জিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কৈশোরেই জর্জিয়ায় টিফলিসে স্কুলের পাঠ অসমাপ্ত রেখে যাজকের পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ ছেড়ে বিপ্লবী দলে যোগদান করেন। ফলে বর্তমান শতাব্দীর ত্রিশের দশকে স্টালিন সর্বময় কর্তৃত্ব লাভ করে সোভিয়েট রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে সফল করতে ব্রতী হন একনিষ্ঠভাবে যাজকের নিষ্ঠায়, সামরিক নির্মমতায়। ১৯২৮ সালেই সারা সোভিয়েট রাশিয়ায় সপ্তবার্ষিক পরিকল্পনা মাফিক পুনর্গঠন কর্ম, উন্নয়ন কর্ম, পরিচালিত হতে থাকে। স্টালিনের নির্দেশে কমিউনিস্ট পার্টি সৈনিকের শৃঙ্খলায় ও পুরোহিতের নিষ্ঠায় সুদূর
বিস্তৃত বহুধা বিভক্ত বহু ভাষাভাষী সোভিয়েট রাশিয়ায় দেশ গঠন ও সমাজ গঠনের কাজ চলতে থাকে। স্টালিন যে দৃঢ়তায় ও দ্রুততায় সপ্তবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোর সফল রূপায়ণ ঘটিয়ে সোভিয়েট দেশে যুগযুগান্তরের পশ্চাৎপদতা থেকে আধুনিকতার আলোকবর্তিকা জ্বালেন তা কেবল হিটলারের নাৎসি পার্টির স্যোস্যাল ডেমক্রাসির সাথে তুলনীয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে হিটলার পরাজিত জার্মানিকে ইউরোপের এক মহাশক্তিধর শিল্পোন্নত দেশে রূপান্তরিত করেন। ঠিক একইভাবে সামরিক শৃঙ্খলায় আবদ্ধ কুশ কমিউনিস্ট পার্টি হাজার হাজার মাইল ব্যাপী বিস্তৃত জারের সাম্রাজ্যের দূরতম অঞ্চলও সাম্যবাদের সফল রূপায়ণ অনুভব করান। ফলে মধ্য রাশিয়ায় উষরপ্রান্তর কেঁপে লেনিনগার্ড থেকে ভাডিভষ্টক পর্যন্ত বিশ্বের দীর্ঘতম রেল পথেও বৈদ্যুতিকরণ করা হয়। এছাড়া বাঁধ, খাল খনন, পতিত অহল্যা জমি উদ্ধার করে লক্ষ লক্ষ একর জমি কৃষিযোগ্য করে তোলে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত করা সম্ভব হয়। তবে এই সফল গ্রাম উন্নয়ন ও কৃষি বিপ্লব করতে গিয়ে মাঝেমাঝে হঠকারী স্টালিনীয় পার্টি সিদ্ধান্ত রুশ জনগণ তথা সারা সোভিয়েট দেশে সাধারণ মানুষের অশেষ দুর্দশার কারণ হয়। অভিজ্ঞতার অভাবে পার্টির আবেগমথিত সিদ্ধান্ত কার্যকরী করতে গিয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির বদলে ব্যহত হয়েছে বার বার। আর হাজার হাজার কৃষক শ্রমিক দুর্ভিক্ষের করালগ্রাসে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
