আমরে কার্যত সোভিয়েট রাশিয়ার সাইবেরিয়া রশিয়ার উন্নয়ের স্টালিন সেই একই ঘৃনিত ব্যবস্থা চালু করেন। এছাড়া সমগ্র সোভিয়েট রাশিয়ায় কোথাও কোন রাষ্ট্রীয় কল, কারখানা ও যৌথ খামারে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থে সংঘটিত বা সংঘবদ্ধ হতে দেয়নি স্টালিন। ফলে স্টালিন জামানায় যে উন্নয়নের গতি তা যতখানি স্বতস্ফূর্ত তার থেকে অনেক বেশি জোর জবরদস্তি মূলক। কিন্তু একটা বিষয় রাজনীতি বিজ্ঞানের ও ইতিহাসের গবেষকদের কাছে খুবই আশ্চর্যের যে যেখানে হিটলারের মৃত্যুর পর জার্মানীতে হিটলার চিহ্নিত হয়েছেন জার্মান জাতীয় কলঙ্ক হিসাবে; বিকৃত মানসিকতাযুক্ত এক নির্মম মহানায়ক হিসাবে। কিন্তু সোভিয়েট রাশিয়ায় স্টালিনের মৃত্যুর পর এমন কি আজও রুশজনগণ স্টালিনের অত্যাচার ও অনাচারের প্রতিবাদে ততখানি মুখর হয়নি। স্টালিন বন্দনা হয়ত বন্ধ হয়েছে কিন্তু ক্ৰচেঙ ছাড়া আর কোন রুশ রাষ্ট্রপতি বা রাজনৈতিক ব্যক্তিতু এ বিষয়ে খুব পরিষ্কার মতমত প্রকাশ করেন নি। ক্রুশ্চেভ নিজে স্টালিনের আমলে একটু একটু করে রুশ কমিউনিস্ট পার্টিতে নিজের আসন দৃঢ় করেন। বহু দায়িত্বপূর্ণ পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু স্টালিনের মৃত্যুর কয়েক বছর পরেই তিনি স্টালিনের ভজনার বদলে স্টালিনীয় সমালোচনায় আত্মনিয়োগ করেন। যদিও জীবনের সায়াহ্ন বেলায় ক্রুশ্চেভকে রুশ জনগণ এজন্য ক্ষমা করেনি। পতনের পর ব্রেজনেভের আগমন আবার সোভিয়েট প্রজাতন্ত্রে স্টালিনীয় লৌহযবনিকার প্রবর্তন ঘটায়। স্টালিন প্রবর্তিত সমাজব্যবস্থা নিঃসন্দেহে রুশ জনগণকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমী গণতন্ত্রী দেশগুলোর তুলনায় অনেক অনেকগুণে কম ভোগ্যপণ্য, ব্যক্তি স্বাধীনতা ইত্যাদি দান করেছে। তা সত্ত্বেও আজও গর্বাচভ, ইয়েলৎসিন, প্রভৃতি নেতাদের পক্ষেও সোভিয়েট শাসনে স্টালিনীয় নির্যাতনের তখা বেশি ব্যক্ত কর সম্ভব হয় নি। কারণ সোভিয়েট মানুষ স্টালিনের গুণগুলোর কথা আলোচনা করতে যতটা আগ্রহী তার সমালোচনায় তত আগ্রহী নহে। হিটলারের থেকেও দীর্ঘকাল ধরে চরম নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার প্রতিভূ হয়েও স্টালিন কিন্তু আজও সাধারণ সোভিয়েট নাগরিকের কাছের মানুষ। তারা স্টালিনের আমলের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, সাইবেরিয়ার দাসশ্রম ব্যবস্থা, শিক্ষা সংস্কৃতিতে বদ্ধজলাভূমি সৃষ্টি ও লৌহযবনিকার প্রবর্তনের কথা স্বীকার করে কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত দুর্বতায় স্টালিন আজও এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। অস্বীকার করা যায় না যে স্টালিনের দৃঢ় নেতৃত্ব সোভিয়েট রাশিয়াকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর থেকেই সোভিয়েট পররাষ্ট্রনীতি সুচতুর স্টালিনের নির্দেশেই এশিয়ায়, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার পরাধীন বা সদ্যস্বাধীন দেশগুলোতে সফলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। স্নায়ুযুদ্ধে সোভিয়েট রাশিয়া যে অনেক সময়ই মার্কিনযুক্ত রাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছে তা অস্বীকার করা যায় না। ফলে সোভিয়েট জনগণ ঘর্মের স্বাধীনতায় বঞ্চিত হয়েছে। ব্যক্তি স্বাধীনতার স্বাদ পাইনি। কিন্তু সামান্যবাদের সাম্য ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় স্টালিনীয় কমিউনিস্ট পার্টি নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে সফলভাবে। স্টালিনের আমলে যুদ্ধেবিধ্বস্ত সোভিয়েট রাশিয়ায় যে দেশ গঠন ও নির্মাণকর্ম সপ্তবার্ষিকী পরিকল্পনায় জরুরী ও যুদ্ধকালীন তৎপরতায় চলেছে তা পরবর্তী প্রজন্ম অনেকাংশেই প্রশংসাসূচক সহানুভূতিতে মেনে নিয়েছে। সোভিয়েট সাতসালা পরিকল্পনা ও সপ্তবার্ষিকী উন্নয়ন পর্বগুলো নিঃসন্দেহে স্টালিনের নেতৃত্বের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করে। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যবস্থায় ও শিক্ষা প্রসারে সোভিয়েট সরকার। স্টালিনের আমলে জোর-জবরদস্তি মূলক ভাবে কৃষি বিপ্লব ঘটাতে গিয়ে যে লক্ষ লক্ষ কৃষক পরিবার ধ্বংস হয়ে যায় তা সকলেই স্বীকার করেন। এছাড়া কৃষি উৎপাদনে অভিজ্ঞতার অভাবজনিত বহু বিপর্যয় সোভিয়েট রাশিয়াকে খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদিতে পীড়িত করে। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, হত্যা, আত্মহত্যার কারণ স্টালিনের নিষ্পেষন। স্টালিন জামানায় যত ভুল হয়েছে তারজন্য সাবেক সোভিয়েট সমাজ কমিউনিস্ট পার্টিকে যতটা সমালোচনা করেছে স্টালিনকে ততখানি নহে। সিক্রেট পুলিশের কর্তা বেড়িয়া সাহেব নিহত হয়েছে, ধিকৃত হয়েছেন তাঁর সিক্রেট পুলিশের সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য। কিন্তু যে বেড়িয়া স্টালিনের ছায়াসঙ্গী ছিল স্টালিনের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি রেহাই পাননি জনরোষ থেকে। তাঁর মৃত্যু যেন সারা সোভিয়েট রাশিয়ায় এমনকি কমিউনিস্ট পার্টিতেও যেন এক স্বস্তি ও শান্তির বায়ু প্রবাহিত করে। কিন্তু যে স্টালিনের নির্দেশে বেড়িয়ার ক্রিসেন্ট পুলিশ পরিচালিত হতে সইে স্টালিন সম্বন্ধে মানুষ কিন্তু ততখানি বিতরাগ নহেন।
৫. জাবির ইবনে হাইয়ান (৭২২-৮০৩ খ্রি:)
জাবির ইবনে হাইয়ন এর পূর্ণ নাম হল আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে হাইয়ান। তিনি আবু মুসা জাবির ইবনে হাইয়ান নামেও পরিচিত। কেউ কেউ তাঁকে ‘আল হাররানী” এবং “আস সুফী’ নামেও অভিহিত করেন। ইউরোপীয় পণ্ডিতগণ তাঁর নামকে বিকৃত করে জিবার (Geber) লিপিবদ্ধ করেছে। তিনি কবে জন্মগ্রহণ করেন তা সঠিক ভাবে নির্ণয় করা যায় না। যতদূর জানা যায়, তিনি ৭২২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হচ্ছে হাইয়ান। আরবের দক্ষিণ অংশে জাবিরের পূর্ব পুরুষগণ বাস করতেন। তারা ছিলেন আজাদ বংশীয়। স্থানীয় রাজনীতিতে আজাদ বংশীয়রা বিশেষ ভাবে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে জাবিরের পিতা হাইয়ান পূর্ব বাসস্থান ত্যাগ করে কুফায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন। চিকিৎসক ও ঔষধ বিক্রেতা। জানা যায়, উমাইয়া বংশের খলিফাগণের নিষ্ঠুর ও অমানবিক কার্যকলাপের দরুন হাইয়ান উমাইয়া বংশের প্রতি বিদ্বেষ মনোভাব পোষণ করতেন। সেহেতু তিনি পারস্যের কয়েকটি প্রভাবশালী বংশের সঙ্গে পরামর্শ ও ষড়যন্ত্র করাবার জন্যে আব্বাসীয়দের দূত হিসেবে কুফা ত্যাগ করে তুস নগরে গমন করেন। এ তুস নগরেই জাবিরের জন্ম হয়। হাইয়ানের ষড়যন্ত্রের কথা অতি শীঘ্রই তৎকালীন খলিফার দৃষ্টিগোচর হয়।
