১৬০৩ সালে ২৪শে মার্চ এসেক্স-এর মৃত্যুর ঠিক দু’বছর পরেই ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথ-এর জীবনদীপ চিরতরে নির্বাপিত হয়ে গেল। ফ্যারাওদের পিরামিড-এর চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল তাঁর স্মৃতিসৌধ আর সেই স্মৃতিসৌধ ছিল তাঁর স্বদেশ, যাকে তিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে জগৎসভায় সর্বশ্রেষ্ঠর আসনে বসিয়েছিলেন।
কারোর কোন উপদেশ কেমন করে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে তার কৌশল আয়ত্ব করে এবং অচিরেই তড়িঘড়ি কোন কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে না ফেলে, আগামী কল সম্ভবতঃ ভাল কিছু ঘটতে পারে সেই আশায় সেই কাজকে ফেলে রাখা–এই নীতিতে বিশ্বস করে এবং ঝুঁকি নিয়ে তিনি স্পেন ও পর্তুগাল-এর সমুদ্রোপকূলে খবরদারি করার প্রবণতাকে চিরদিনের মত কমিয়ে দিয়েছিলেন; ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধে লুথারের সমর্থকদের লেলিয়ে দিয়ে নিজের দেশে স্থাপন করেছিলেন চার্চ অফ ইংলণ্ড, এযাবৎ পৃথিবী যা দেখেনি এবং অদূর ভবিষ্যতে দেখবে বলে মনে হয় না সেই সব কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, সৈনিক, আবিষ্কারক, বিজ্ঞানী প্রভৃতি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক সম্প্রদায়ের কাছে তিনি ছিলেন আলোকদায়িনী সূর্যের মত সক্ষাৎ অনুপ্রেরণার প্রতিমূর্তি।
এলিজাবেথ সারাজীবন কুমারীই রয়ে গেছিলেন। শোনা যায় তার নাকি কিছু একটা শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছিল। তবে তা ঘটনা বা রটনা যাই হোক না কেন, ঐতিহাসিকদের কথাটা বিশ্বাস করাই যুক্তিযুক্ত এবং তা শ্রেয়ও বিয়ে তিনি করেন নি ঠিকই, কিন্তু ভাল তিনি বেসেছিলেন এবং তা গভীরভাবে ও আন্তরিকভাবে। আর সেই ভালবাসার, প্রেমের পাত্রটি ছিল তার অতি আদরের স্বদেশ-ইংল্যাণ্ড।
৪৯. জোসেফ স্টালিন (১৮৮২-১৯৫৩)
রুশ বিপ্লবের পুরোধা পুরুষ ভি. আই লেনিনের পর রুশ বিপ্লবের ইতিহাসে বিশেষ করে প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর সোভিয়েট রাশিয়ায় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ যিনি তিনি জোসেফ স্টালিন। লেনিনের প্রধান শিষ্যদের মধ্যে যিনি সর্বাপেক্ষা অধিক খ্যাত তাদের মধ্যেও জোসেফ স্টালিন প্রধান পুরুষ। লেলিনের মন্ত্র শিষ্য বিশ্ববিপ্লবের প্রধান প্রবক্তা ট্রটস্কি আভিজাত্যে, শিক্ষায়, জ্ঞান গরিমায় এবং বাগীতায় হয়ত স্টালিন থেকেও অধিক খ্যাত ছিলেন, পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও রুশ বিপ্লবের পর সোভিয়েট শাসনকে সমগ্র রাশিয়ায় এবং জারের সাম্রাজ্যের নানা প্রান্তে সুদৃঢ় করণে যিনি লেনিনের প্রধান সহযোগী হিসাবে সফল ভূমিকা পালন করেছেন তিনি জোসেফ স্টালিন।
মার্কসবাদের ও সাম্যবাদের সফল প্রসার ত্বরান্বিত করতে যে দুটি ব্যক্তিত্ব সর্বাপেক্ষা অধিক ক্রিয়াশীল তা লেনিন ও স্টালিন। লেনিনের সহযোগী ট্রটস্কি সাহেব রুশ বিপ্লবে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু লেনিনের স্বল্পকালীন জীবনের সায়াহ্ন বেলায় দেখা যায় যে সারা সোভিয়েট রাশিয়ায় রুশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ কর্মী ও কৃষক মজদূর সাধারণ মানুষের কাছে স্টালিন, লেনিনের জীবদ্বশায় যথেষ্ট ক্ষমতা অর্জন করেন, বিশেষ করে বিশ্ববিপ্লবের প্রধান পুরোহিত ট্রটস্কি, মার্কসবাদের আন্তর্জাতিকতা নিয়ে যতই বেশি মাথা ঘামিয়েছেন স্টালিন ততই বাস্তববাদী রুশ পার্টির কাছে, কাছের মনুষ হয়েছেন।
লেনিনের মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্ব থেকেই স্টালিন তার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দী কমিউনিস্ট নেতা, ট্রটস্কি, জেনেভিউ, কামেনেঠ, বুখারিন এদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী নেতা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
অনেকের মতে লেনিন মৃত্যুর পূর্বেই বুঝতে পেরেছিলেন যে সোভিয়েট শাসন ব্যবস্থায় তার মৃত্যুর পরই এক বিভীষণ মহানায়কের উত্থান ঘটবে যিনি কমিউনিষ্ট বিপ্লবের গণতান্ত্রিক চরিত্রে একধরনের একনায়কত্বের আবহ সৃষ্টি করবেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে ও জীবনদর্শনে আপোষহীন সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। ফলে পার্টিতে তথা সোভিয়েট দেশে আস্তে আস্তে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে ক্রেমলিনে এবং সেখানকার অধিশ্বর মহাশক্তিধর মহাবিপ্লবী স্টালিনের হাতে। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্তের সমূলে নির্মূলকরণের স্টালিনীয় অভিযানে হাজার হাজার বিশ্বস্ত, সৰ্ব্বত্যাগী আদর্শবাদী কমিউনিস্ট পার্টি সদস্যের নিধন ঘটে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পূর্বে রুশ সামরিক বাহিনীতেও যে পার্জ বা ঝারাই বাছাই অভিযান চলে তাতে রুশ সামরিক বাহিনীর প্রধান প্রায় সকল সামরিক নেতাই পদচ্যুত বা নিহত হয়। ফলে স্টালিনের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখলে সেনাবাহিতেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নি। কারণ যদিও রুশ বিপ্লবের প্রধান হোতা লেনিন ও ট্রটস্কি রেড আর্মিকে বিপ্লবী চেতনায় ও উন্মাদনায় মাতিয়ে রেখেছিলেন কিন্তু তা সত্ত্বেও স্টালিন তার ক্ষুরধার বুদ্ধি দ্বারা, কঠোর নিষ্ঠাপরায়ণ পার্টি নেতা হিসাবে নিজেকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। লেনিন, স্টালিনের কঠোর স্বভাব, নিষ্ঠুরতা ও একগুয়েমি বিষয়ে অবহিত হলেও তার সাংগঠনিক ক্ষমতাও নিরন্তর কর্ম প্রবাহে লিপ্ত থাকার প্রচেষ্টা স্টালিনকে কমিউনিষ্ট বিপ্লবীদের কাছের মানুষ করে তুলে।
ফলে ক্যামনেভ, বুখারিন, ট্রটস্কি প্রভৃতি নিতাগণ স্টালিন থেকে তাত্ত্বিক আলোচনায়, আগীতায়, রাজনৈতিক সততায় যতই শ্রেয় হন না নে, স্টালিন বাস্তববাদী, জাতীয়তাবাদী পথ অবলম্বন করে মার্কসিয় কমিউনিষ্ট তত্বকে এক নতুন পথে প্রবাহিত করেন। বিশ্ববিপ্লব আগে, না রুশ দেশে রাজনৈতিক বিপ্লব তথা ক্ষমতা সংহত করা আগে, এই প্রশ্নে স্টালিন সাধারণ কৃষক, শ্রমিকদের কাছে বাস্তববাদী রাজনৈতিক চিন্তার প্রমাণ রাখেন। ফলে বড় বড় মার্কসবাদী নেতাকে তিনি পেছনে ফেলে কমিউনিষ্ট পার্টির নেতৃত্বে সর্বময় কৰ্ত্তা হয়ে উঠেন। স্টালিন মূলত রুশ জনগণের কাছের মানুষ। শিক্ষায় দীক্ষায়, আভিজাত্যে, তিনি অতি সাধারণ একজন চর্মকারের সন্তান। মা চেয়েছিলেন ছেলে একজন ভাল ধর্মযাজক হবেন। কিন্তু কৈশোরের কিশোলয় পার না হতেই, স্টালিন দীক্ষা নিলেন বিপ্লবী দলে।
